চলুন যাই বাঘ-বনে

সৌরভ বসু

 

  • বাঘমামার দেশে
একদিনে অনেক বাঘ৷ একসঙ্গে অনেক বাঘ৷ বাঘের দেখা মিলবেই৷ কাছ থেকে অথবা একটু দূরে৷ জঙ্গলে গেলে বাঘ দেখাটা যাঁদের প্রধান বিবেচ্য, তাঁদের অবশ্য গন্তব্য তাড়োবার জঙ্গল৷ মধ্যপ্রদেশ-অন্ধ্রপ্রদেশ লাগোয়া মহারাষ্ট্রের তাড়োবা-আন্ধেরি টাইগার রিজার্ভ৷ সময়টা ২০১৫-র এপ্রিলের শেষ৷ এটা তাড়োবার জঙ্গলে আমার তৃতীয়বার পা রাখা৷ উদ্দেশ্য বাঘ দেখা৷ সঙ্গে পাঁচজনের একটা দল৷ সেই মতো চন্দ্রপুরে বনদফতরের অফিসে আগে থেকেই যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া ছিল৷ জঙ্গলে প্রবেশের মুখেই স্বাগত জানাল ভারতীয় গউর (বাইসন প্রজাতি)৷ ধীরে ধীরে গাড়ি প্রবেশ করল জঙ্গলের অন্দরমহলে৷ তাড়োবার ১১৬ বর্গ কিলোমিটার আর আন্ধেরির ৬০৮ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি নিয়ে এই জঙ্গল৷ সেগুন, মহুয়া, পলাশ, শিরিষ, অর্জুন, কুসুম, বহেড়া গাছের পর্ণমোচি জঙ্গল৷ শীতে পরিযায়ী পাখির মেলা বসে হ্রদের জলে৷ সেখানে কচছপ আর কুমিরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্হান৷ জঙ্গলে বাঘ ছাড়াও দেখা মিলবে লেপার্ড, হায়না, নীলগাই, ডিগডিগ, শম্বর, চিতল হরিণ, বন্য শুকর সহ আরও নানা প্রাণীর৷
  •  বৈচিত্রে বৈভবে
জীব বৈচিত্রে ভরপুর তাড়োবার প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই বাঘ৷ ২০১২-তেও একসঙ্গে ছ’টি বাঘের সাক্ষাত্‍ পেয়েছিলাম৷ সেটি ছিল চারটি সন্তান-সহ এক বাঘ আর বাঘিনীর ভরা সংসার৷ ২০১৩-র শেষেও দেখা মিলল ওদের, তবে দুটি দলে৷ ছ’সদস্যের দল থেকে তিনটি ভাই আলাদা হয়ে গিয়ে এক নতুন দল গড়ে বিচরণ করছে মোহারলির রেঞ্জে৷ তাদেরই আর এক ভাই রয়ে গিয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে৷ ২০১৫-তে অবশ্য বাবা-মা-র ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়৷ আর অন্য ভাইটিও যোগ দেয় তার তিনভাইয়ের সঙ্গে৷ জঙ্গলের পথে হনুমান আর বানরের আধিক্য বেশ ভালই চোখে পড়ল৷ বলা হয় যে বাঘ-বনে বানর-হনুমানের আধিক্য যত বেশি, সেই জঙ্গল ততবেশি জীব বৈচিত্রে ভরপুর৷ তাড়োবার ভরপুর জীব বৈচিত্র কয়েক দিন ধরে অনুভব করলাম বেশ ভালভাবেই৷ পাখিদের মধ্যে নজর কাড়ল আইসি, বাঁশপাতি, নাইটজার ইন্ডিয়ান রোলার, সাপেণ্ট ক্রেস্টেড, ঈগল, এশিয়ান ওপেন বিলডস্টর্ক৷ ময়ূরের আধিক্যও বেশ ভাল রকম৷ প্রতিদিন জঙ্গলে ভোর  হত ময়ূরের ডাকে, আবার সান্ধ্য সূচনাও হত  কেকাধবনিতে৷ দুপুরের সাফারিতে হামেশাই চোখে পড়ে বন্য শুকরের জলকেলি৷ বনপথের বাঁকে ইতিউতি দেখা মেলে গউরের৷ প্রায় প্রতিদিনই হ্রদের জলে পাথরের উপর রোদ পোহাতে দেখেছি কুমিরকে৷ নীল গাই, চিতল হরিণও দেখা দিয়েছে পালা করে৷ তবে ডিগডিগের দেখা পাওয়াটা একটা রেকর্ড হিসেবেই বন দফতরের খাতায় নথিভুক্ত হল৷ এছাড়াও লেপার্ড বনবিড়ালের চকিত ঝলকে শিহরিত দলের সবাই৷
তাড়োবার জঙ্গলপ্রেমী একটি গাছ পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ করে৷ এটা কড়েরা গাছ৷ যার স্হানীয় পরিচিতি ভূত গাছ হিসেবে৷ সাদা ডালপালা (গাছের ছালের রঙ সাদা) বিশিষ্ট গাছটিকে চাঁদনী রাতে দেখলে চমকে উঠতে হয়৷ সর্বশেষ ব্যাঘ্র সুমার অনুযায়ী তাড়োবা-আন্ধেরি টাইগার রিজার্ভে বাঘের সংখ্যা ৮২টি৷ তবে এই মুহূর্তে এই সংখ্যা ৮০+১০৷
  •  জঙ্গল সাফারি
তাড়োবার জঙ্গল খোলা থাকে নভেম্বর থেকে জুনের ১৫ তারিখ অবধি৷ সকালে ও দুপুরে দিনে দু’বার সাফারি হয়৷ জঙ্গল বন্ধ থাকে প্রতি মঙ্গলবার৷ প্রতিবার সাফারিতে যাওয়ার সময় দলের প্রত্যেক সদস্যের ফটো আইডির ফটোকপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক৷ সাফারির খরচ জিপ পিছু প্রবেশ মূল্য সহ ৩২০০ টাকা৷
  •  যাতায়াত
হাওড়া থেকে মুম্বইগামী ট্রেনে নাগপুর বা ওয়ার্ধা৷ সেখান থেকে চন্দ্রপুর৷ নাগপুর থেকে চন্দ্রপুরের দূরত্ব ১০৫ কিলোমিটার৷ আর ওয়ার্ধা থেকে ১১৯ কিলোমিটার৷ চন্দ্রপুরেই সাধারণত থাকার ব্যবস্হা৷ চন্দ্রপুর থেকে তাড়োবা ৪৫ কিলোমিটার৷ তাড়োবার পথে বাস চললেও নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্হা করাই ভাল৷ কেন না সন্ধ্যার মধ্যেই জঙ্গলের দ্বিতীয় গেট মোহারলি পার হতে হবে৷ তাড়োবার কাছের বিমানবন্দর নাগপুর৷
  •  থাকা-খাওয়া
চন্দ্রপুরে একাধিক ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হোটেল আছে৷ এছাড়াও আছে জঙ্গলের কাছাকাছি থাকার মতো মহারাষ্ট্র পর্যটন দফতরের হলিডে হোম৷ জঙ্গলের মধ্যে থাকার জন্য আছে বনবাংলো৷ বুকিং-এর জন্য যোগাযোগ করতে হবে ডেপুটি কনজারভেটর অফ ফরেস্ট, তাড়োবা আন্ধেরি টাইগার রিজার্ভ, চন্দ্রপুর, মহারাষ্ট্র ৪২২৪০১ এই ঠিকানায়৷ বনবাংলোর কেয়ারটেকারই রান্না করেন৷ ভাত, ডাল, ডিম পুরি-সবজি৷ আগাম জানালে মিলবে মুরগির মাংসও৷ খরচ পড়বে দিন ও মাথা পিছু ৪৫০ টাকা৷ এর মধ্যে অবশ্য সকালের জলখাবার, বিকেলের চা, দুপুর ও রাতের খাবার সবকিছুই আছে৷ হলিডে হোমেও একই রকমের খাবার মেলে৷
  • যাওয়ার সময়
তাড়োবার বনাঞ্চল খোলা থাকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ১৫ জুন অবধি৷ তবে বন্য জন্তু দেখার আদর্শ সময় এপ্রিল-মে৷ যদিও এই সময় পরিযায়ী পাখির দেখা মিলবে না৷ তবে গরমকালে সল্ট পিট আর ওয়াটার হোলের আশেপাশে বন্য জীবজন্ত্তদের দেখা মেলে বেশ কাছ থেকেই৷
  • বাজেট
তাড়োবা জঙ্গল ভ্রমণে রেল ও বিমান ভাড়া ছাড়া দিন প্রতি মাথাপিছু খরচ ২০০০/২২০০ টাকা৷ ন্যূনতম চারজনের একটা দল হওয়া চাই৷ এছাড়াও সাফারির খরচ আলাদা৷ শনি, রবি ও ছুটির দিনে সাফারির খরচ অন্যান দিনের তুলনায় বেশি৷

 

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*