‘নিজ পরিবারেই রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তিকে ব্যঙ্গ করা হতো’

ছয় দশক, শুধু অভিনয়েই! কলকাতার অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানে- এক বিদ্যাপীঠ। উঁচুদরের বাচিকশিল্পী তিনি। কবিতা, লেখালেখি, ছবি আকাঁতেও পারঙ্গম। গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন এ বর্ষীয়ান। শিল্পের চারদিকে সুবিন্যাস্ত বিচরণ করা এ মানুষটি সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে সংবাদ-সংস্কৃতিকর্মীদের মুখোমুখি হয়ছিলেন। সে কথোপকথনের দু’ছত্র থাকছে পাঠকদের জন্য।

একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সারাক্ষণই কোনও না কোনও কাজে পাওয়া যায়। কখনও মনে হয়নি এবার ক্ষান্ত দিই?
সৌমিত্র: আগামী ১৯ জানুয়ারি আমি ৮২তে পা দিচ্ছি। আমি এখনও কাজ করে চলেছি। নাটক করছি, লিখছি, সময় করে কবিতা পাঠও করি। আর প্রতিবছর বেশ কয়েকটা ছবিতে আমাকে পাওয়া যায়। হয়তো সে জন্যই অন্যদের মাঝে এ ভাবনা থাকতে পারে। মনে করতে পারে, সমানতালে ঘোড়া ছুটছে। কিন্তু অসুখ-বিসুখ সুবিধা করতে দিচ্ছে না। এই  যে এখন ঢাকায় এসেছি, সঙ্গে কাউকে রাখতে হচ্ছে। তবে কাজ ছাড়া চলা তো মুশকিল।

ঢাকায় এসেছেন মঞ্চনাটক নিয়ে। পেশাদার থিয়েটার বলতে যেটা বোঝায়, কলকাতায় সেটা আছে। এখানেও নিরন্তর একটা প্রচেষ্টা চলছে। কলকাতায় সে পেশাদারত্বের সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতাটা শুনতে চাই।

সৌমিত্র: কলকাতার পেশাদার মঞ্চের অভিজ্ঞতা একশ’ বছরের পুরনো। সেটা চমৎকার বিকাশের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। তারপর এটার অবক্ষয়ও হয়েছে। সেটা শুরু হলো যখন পেশাদারত্ব ও বাণিজ্যিকতা গুলিয়ে ফেলা হয়। ধরুন, আপনি একজন খুব বড় অভিনেতা। কিন্তু এটা হয়েছেন বলেই যে সব ছেড়েছুড়ে কোনওমতো অভিনয় করলেই হবে, তা নয়। অনেক আগের একটি ঘটনা বলি, যখন আমাদের কলকাতায় পেশাদারত্বের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হতো। তখন কয়েক আনায় টিকিট কাটা হতো। এক মঞ্চ অভিনেতার গলার স্বর ক্ষীণ ছিল। অভিনয়ের আগমুহূর্তে নির্দেশক সে অভিনেতা বললেন, দেখো, একজন বৃদ্ধা নাটক দেখতে এসেছেন। তিনি গ্যালারিতে বসে আছেন। এখন তুমি যদি তোমার কণ্ঠ সে মাহিলাকে ভালোভাবে শোনাতে না পার, তাহলে তুমি এ চার ঘণ্টা তাকে বসিয়ে রেখে ঠকালে। তখন আসলে নাটক হতো বড় পরিসরে। এই যে নিজেদের প্রতি প্রতিজ্ঞা, এটাই ছিল মূল উপদান। যদি আমি আমার সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করি তাহলে সব সম্ভব। এটাই কিন্তু পেশাদারত্ব।
এপার-ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হওয়াটা জরুরি- এটা আপনিও বলেন। এখন হচ্ছেও তা। আদান-প্রদানের বড় একটি মাধ্যম টিভি। কিন্তু কলকাতায় কেন বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল দেখানো হচ্ছে না? আর এ বিষয়ে ওপার বাংলার সাংস্কৃতিককর্মীরা কতটা আগ্রহী?
সৌমিত্র: এটা হওয়াটা খুব জরুরি। আপনাদের এখানে যতটা জরুরি, তার চেয়ে আমাদের ওখানে আরও জরুরি। কারণ বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রকৃতই বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলাদেশিরা। টেলিভিশনে আদান-প্রদানও জরুরি। তবে এটা ঠিক, কলকাতার টিভিতে যা হয়, তা নাটক নয়। এর চেয়ে ‘খারাপ’ ছবিও অনেক ভালো।

বাংলাদেশের ছবি কি দেখা হয়?
সৌমিত্র: সাম্প্রতিক কোনও ছবিই দেখিনি। চার-পাঁচ বছর আগে দেখিছি। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে কয়েকটি ছবি এসেছিল। কিন্তু আমার দেখার সুযোগ হয়নি।

চারদিকে এত ভাষার ছবি। তাদের ভিড়ে আসলে বাংলা ছবির অবস্থান কোথায়?
সৌমিত্র: খুব সুবিধের নয়। কারণ সাম্প্রতিক কোনও বাংলা ছবিই প্রধান কোনও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায়নি। এটা অনেককাল থেকে হয়ে আসছে। এখন যেগুলো জোটে (পুরস্কার) তা আসলে কিছুই না। এগুলো পুরস্কার হিসেবে ধরা যায় না।

আপনার প্রথম ছবি ‘অপুর সংসার’ (১৯৫৯)। সেখানে অপর্ণা মারা যাওয়ার আগে আপনার কণ্ঠ একরকম ছিল। মারা যাওয়ার পর অন্যরকম। সেই দৃপ্ত কণ্ঠ ছিল না। এই ভিন্নতার কথা তো আছেই; আবার আপনি চলচ্চিত্র, মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন- প্রায় সবক্ষেত্রে অভিনয় করেন। পার্থক্যগুলো কীভাবে বজায় রাখেন?
সৌমিত্র: আসলে মাধ্যমগত পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই দেখি না। কেননা একজন চিত্রকর ২০ ফুট ছবি যেমন আঁকতে পারে, তেমনি ২ ফুট ছবিও তুলে আনতে পারে। তাই বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করাটা আলাদাভাবে দেখি না। আর ‘অপুর সংসার’র যে বিষয়টি বললেন, এটুকু বলতে পারি- আমার ও সত্যজিতের আগ্রহ ছিল সর্বোচ্চ দেওয়ার। এটা হয়তো তার ফল।

সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি ছবিতে আপনি কাজ করেছেন। কখনও বাড়তি আবদার করেছেন?
সৌমিত্র: সত্যজিৎ ও আমি প্রতিভার বিপুল পার্থক্য থাকা স্বত্বেও তার ১৪টি ছবিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। তবে আবদার যে করিনি, তা নয়। কিন্তু তিনি তা রাখেননি। তিনি একজন সুস্থ সাংস্কৃতিক মানুষ। তার ‘না’ করার ভাষাটাও অত্যন্ত সম্মানের। আমি হয়তো কোনও চরিত্রের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছি। কিন্তু এতে তিনি বাড়তি সুবিধা নিতে দেননি। আমাদের মধ্যে সহমত ছিল। বোঝাপড়া ছিল।

এই সমঝোতাটা কেমন?
সৌমিত্র: এমনও হতো, আমি তার অন্য ছবিতে থাকি বা না থাকি। তিনি আমাকে তার পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনাতেন। তিনি একদিন ডেকে বললেন, দেখো সৌমিত্র, তোমাকে আমি প্রচুর স্বাধীনতা দিয়েছি (এটা আংশিক সত্য। কারণ স্বাধীনতা দিলেও তার অনুমতি ছাড়া কিছু করা যেত না ছবিতে। আবার তিনি আমাকে অনেক নির্দেশও দিয়েছেন)। নতুন এ ছবিতে মানসিক প্রতিবন্ধীর চরিত্র আছে। এটার সম্পর্কে তুমিও জানো। এখানে আমার কিছু অঙ্গভঙ্গি নির্বাচন করব, যেগুলো আসলে চরিত্রটির সঙ্গে যায়। বললাম, আমি ভাববো। পরে আমি বললাম, এ ধরনের মানুষের হাতের প্রকাশভঙ্গি খুব জরুরি। যেমন- সে যখন ঘরে বসে গান শোনে তখন তারা অদ্ভুতভাবে হাত নাড়ায়। আবার খাবার টেবিলে যখন বিরক্ত হয়, তখন প্রতিবাদস্বরূপ হাত চাপরাতে থাকে। এরপর আমি বললাম,  ঘাড়ের একটা অঙ্গভঙ্গি করতে চাই।
তিনি বললেন, দেখাও। আমি রিহার্সালে সেটা দেখালাম। তিনি কিছু বললেন না। শ্যুটিংয়ের দিন বললাম, আমি কি ঘাড়ের মুভমেন্টটা করব? তিনি বললেন, ওকে। আমি কাজটি করলাম। তিনি নিজেই ক্যামেরা চালান। তাই ক্যামেরা থেকে মাথা সরিয়ে বললেন, ওকে, কাট। এরচেয়েও ক্ষীণভাবে বললেন, এক্সসিলেন্ট।

আপনাদের মধ্যে কখনও কোনও বিষয়ে দ্বন্দ্ব হয়নি?
সৌমিত্র: মতপার্থক্য খুব কম। একবার একটা চরিত্র ছিল গ্রামের বাহ্মনের। সেখানে তার গোঁফ আছে। আমি বললাম, গায়ের বাহ্মনরা কিন্তু এখন দাড়ি-গোঁফ রাখে না। একেবারে ক্লিন সেভ করে তারা। তিনি বললেন, না, এটাই থাকবে। কারণ ঐতিহ্যের একটা বিষয় আছে। শ্যুটিংয়ের দিন আমি আবারও বললাম, গোঁফটা কি থাকবেই? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, ওকে। আই মাস্ট অ্যাক্ট। ব্যস, এটুকুই।

সাধারণত যারা কবিতা লেখেন তাদের আবৃত্তিতে খুব কম পাওয়া যায়। দুটোর অবস্থান অনেকটা বিপরীতমুখী। আপনার কী মনে হয়?
সৌমিত্র: বিষয়টি বিপরীতমুখী নয়। অনেকেই হয়তো এ কাজটি করেন না। কলকাতায় কিন্তু এটা হচ্ছে। এমনকী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শেষের দিকে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। তার রের্কডিং খুবই খারাপ ছিল। তখন তার বয়সের কারণে গলার অবস্থাও ভালো ছিল না। আমাদের পরিবারেই তো রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তিকে ব্যঙ্গ করা হতো। কিন্তু তার কিছু আবৃত্তি ছিল অসাধারণ। আমি তো সরাসরি তার গলার কাজ দ্বারা প্রভাবিত।

কলকাতায় আপনার আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে বিখ্যাত মানুষের সব পোর্ট্রেট ছিল। এর মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, ভ্যান গঘ। কখনও কি নিজের আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন?
সৌমিত্র: হ্যাঁ, তা এঁকেছি। তবে প্রতিকৃতি তো খেয়াল-খুশিমতো করি। বই পড়ার সুবিধার জন্য বুকমার্ক হিসেবে শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ছোট লম্বা কাগজে এঁকেছিলাম। পরিকল্পনা করে কারও ছবি আমি আঁকিনি। আর এখনও সেভাবে করা হয়ে উঠেও না।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*