শৌখিন নেশা মাছ শিকার!

শৈশবে গ্রামের পুকুরে, খাল-বিল ও নদীতে বড়শি দিয়ে শখের বশে মাছ শিকার করতেন অনেকে। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে হয়তো ভেস্তে গেছে সে শখ। তবে আপনি চাইলে ঢাকায় বসেও মাছ শিকার করতে পারেন। ধানমণ্ডি ও চিড়িয়াখানা লেকসহ বেশ কয়েকটি স্থানে শৌখিন মাছ শিকারিদের জন্য রয়েছে সুযোগ। শত ব্যস্ততার মাঝে সুযোগ করে মাছ শিকারে কাটাতে পারেন খানিক অবসর সময়। ঢাকার অভ্যন্তরে কোথায়, কখন, কিভাবে মাছ শিকার করবেন দেখুন বাংলা ট্রিবিউন লাআফিস্টাইলের আয়োজনে।

শৌখিন মাছ শিকারের ইতিহাস:

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে নবাববাড়ির পুকুর, কমলাপুর স্টেশনের পাশে আফিম সরকারের দীঘি, হাইকোর্টের সামনে, রমনা লেকে, পুরনো বিমানবন্দরের পাশে লাল দীঘিতে মাছ ধরা হতো। এছাড়া আশেপাশে আরও কিছু পুকুর ছিল। সে সময় শৌখিন মাছ শিকারিদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।

শুরুতে কোনও সংগঠন না থাকায় তারা বিচ্ছিন্নভাবে মাছ ধরতেন। ১৯৬৮ সালে প্রথম একটি অ্যাঙ্গলিং ক্লাব (মৎস শিকারি সমিতি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ধানমণ্ডিকেন্দ্রিক এই ক্লাবটির নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান অ্যামেচার অ্যাঙ্গলারস অ্যাসোসিয়েশন। স্বাধীনতার পর যার নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ শৌখিন মৎস শিকার সমিতি।’ সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এখনও।

এদিকে স্বাধীনতার পর কিছু নতুন পুকুর খনন করা হলেও জুরাইন, কমলাপুর স্টেশন, বিমানবন্দর এলকার লাল দীঘিসহ বেশ কিছু পুকুর বন্ধ হয়ে যায়। আবার নতুন করে কিছু জায়গা মাছ শিকারিদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিড়িয়াখানা  ও সংসদ ভবন লেক। এছাড়া ঢাকায় আরও বেশ কিছু পুকুরে মাছ ধরার জন্য টিকিট দেয়া হয়। বর্তমানে ঢাকায় শৌখিন মাছ শিকারির সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি।
যেখানে মিলবে মাছ শিকারের সুযোগ:

ঢাকায় বসে মাছ শিকার করতে ইচ্ছুক শৌখিন শিকারিদের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি স্থান। এসব স্থানে সাধারণত সারা বছরই মাছ ধরা যায়।

ধানমণ্ডি লেক:

ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে ১৯৫৬ সালে । বর্তমান ধানমণ্ডি লেক কারভান নদী নামে পরিচিত ছিল। ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠলে নদীর বিলুপ্তি ঘটে। লেক খননের অনেক বছর পর ১৯৬২ সাল থেকে এই লেকে শৌখিন মাছ শিকারিরা আনুষ্ঠানিকভাবে মাছ শিকার শুরু করেন। তখন লেকে টিকিটের মূল্য ছিল আট আনা! শুরুতে মৎস বিভাগ থেকে শৌখিন মৎস শিকারিরা সমিতির মাধ্যমে এক বছরের চুক্তিতে মাছ ধরতেন। ১৯৯৮ সালের পরে লেকের দায়িত্ব চলে যায় সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে। এরপর দীর্ঘদিন ধানমণ্ডি লেকে মাছ শিকার বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ধানমণ্ডি লেকে মাছ ধরা শুরু হয় আবারও। পুরো লেকের পরিবর্তে ৭ নম্বর মসজিদের পাশ থেকে কলাবাগান ক্লাব পর্যন্ত মাছ ধরার নতুন সীমানা নির্ধারণ করা হয়।

ধানমণ্ডি লেকে শুক্র, শনি ও মঙ্গলবারে টিকেটের মাধ্যমে মাছ শিকার করা যায়। এছাড়া সরকারি ছুটির দিনের মাছ শিকারের জন্য টিকিট বিক্রয় করা হয়। লেকে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ কেজি ওজনের মাছ পাওয়া যায়। ধানমণ্ডি লেকে দীর্ঘদিন ধরে শখের বশে মাছ শিকার করেন শাহনেওয়াজ ভুঁইয়া। তিনি বলেন, ‘শখটি এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। সময় পেলেই চলে আসি এখানে মাছ শিকার করতে।’

লেকে প্রতি বছর ২৬ মার্চ মাছ ধরা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ধানমণ্ডি লেকে মাছ ধরতে হলে প্রতিদিন গুণতে হবে দুই হাজার টাকা। তবে শীতকালে টিকিট মূল্য থাকে এক হাজার টাকা।

চিড়িয়াখানা লেক:

চিড়িয়াখানা লেকে মাছ শিকারিদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। ভেতরে দুটি লেক রয়েছে। একটি উত্তরে ও অন্যটি দক্ষিণ পাশে। বর্তমানে দক্ষিণ দিকের লেকটি মাছ ধরার জন্য বন্ধ থাকলেও উত্তরের লেকে মাছ ধরার সুযোগ রয়েছে।

সপ্তাহে শুধুমাত্র রবিবার ছাড়া প্রতিদিনই শৌখিন মাছ শিকারিদের জন্য টিকিট বিক্রি করা হয়। লেকে একদিন মাছ ধরতে হলে একজন শিকারিকে গুণতে হবে দুই হাজার টাকা। চিড়িয়াখানা গেইট থেকেই টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।

চিড়িয়াখানার মৎস কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু সাঈদ কামাল জানান, সারা বছরই চিড়িয়াখানা লেকে মাছ ধরার জন্য টিকিট দেয়া হয়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ কেজি ওজনের মাছ পাওয়া যায় এখানে। এছাড়া লেকে সর্বোচ্চ পনেরো থেকে বিশ কেজি ওজনের মাছ রয়েছে বলে জানান তিনি।

জহুরুল হক হল পুকুর:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের পুকুরে মাছ শিকারের ইতিহাস প্রায় একযুগের। সপ্তাহে একদিন শুধুমাত্র শুক্রবার মাছ ধরার জন্য টিকিট দেয়া হয়। হল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিজ নিয়ে কর্মচারীরা এই পুকুরের টিকিট বিক্রি করেন। একদিনের টিকিট মূল্য দুই হাজার টাকা।

জহুরুল হক হলের প্রভোস্ট প্রফেসর আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসেন জানান, ‘পুকুরের দেখাশুনা ও টিকিটের বিষয়টি তদারকি করেন হলের কর্মচারীরা। টিকিট বিক্রি করে যা টাকা আসে তার অর্ধেক জমা হয় হলের তহবিলে আর বাকি অর্ধেক নেন কর্মচারীরা।’

সংসদ ভবন লেক:

ঢাকার ভেতরে শৌখিন মৎস শিকারিদের মাছ ধরার পছন্দের স্থানের তালিকায় নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে সংসদ ভবন লেক। এখানে সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার মাছ ধরার জন্য টিকিট দেয়া হয়। সংসদ ভবন লেকে একদিন মাছ ধরতে টিকিটের জন্য গুণতে হয় তিন হাজার টাকা।

এছাড়া ঢাকার ভেতরে নবাববাড়ির পুকুর, উত্তরা জসিমউদ্দিন রোডের মাথায় একটি পুকুর, মিরপুর ১২ নাম্বারের পাশে কালশী সাগুফতা, বারিধারাসহ আরও বেশকিছু পুকুরে মাছ ধরার জন্য টিকিট দেওয়া হয়।
মাছ ধরার উপকরণ:

বড়শিতে মাছ ধরার পূর্বশর্ত হচ্ছে মাছের খাবার। এগুলো সাধারণত শিকারিরা নিজেরাই তৈরি করেন। ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে এ খাবার কিনতেও পাওয়া যায়। এর মধ্যে কলাবাগান মোড়ে হাসান অ্যাঙ্গার্লস, নয়া পল্টনে কিং ফিসার ফিসিং ট্যাক্‌ল স্টোর, চিড়িয়াখানা গেইটের সামনে আবুলের দোকান অন্যতম। দোকানগুলোতে মাছের খাবার হিসেবে মিষ্টি চার, নারকেল চার, পনির পচা, চিড়া, বাকর, লাসা পোকা বা পিঁপড়ার ডিম, খৈল, আচার, ইস্টার মসলা, স্প্রে, মহুয়া, টাকলা, ছাতুর লাড্ডু কিনতে পাওয়া যায়।

হাসান অ্যাঙ্গার্লসের মালিক মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘মাছ ধরার জন্য কতটুকু বা কী খাবার লাগবে তা নির্ভর করে শিকারির উপর। একেকজন শিকারি একেক ধরনের উপকরণ ব্যবহার করেন। এছাড়া যেখানে মাছ ধরতে যাবেন সেই পুকুর বা লেকে কি ধরনের মাছ রয়েছে তার উপর নির্ভর করে খাবারের ধরণ।

সরঞ্জামের প্রাপ্তিস্থান ও দরদাম:

মাছ শিকারের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফিশিং রড, ফিশিং রিল বা হুইল, ফিশিং লাইন বা সুতা, ফিশিং নেট, বসার জন্য চেয়ার ইত্যাদি। আর এ সবই ঢাকার কয়েকটি দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। নয়া পল্টনে কিং ফিসার ফিসিং ট্যাক্‌ল স্টোর, কলাবাগান মোড়ে হাসান অ্যাঙলার্স, মহাখালী কাঁচাবাজার মার্কেটের দোতালায় ও গুলশানে রয়েছে একটি দোকান। এছাড়া পুরান ঢাকার চকবাজারেও পাবেন বেশকিছু দোকান।

কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে এসব সরঞ্জামের দাম ব্র্যান্ড ও গুণগত মানের উপর নির্ভর করলেও দোকানভেদে দামের খুব বেশি একটা তফাৎ হয় না।

ফিশিং রড় বা ফাইবারের দাম পড়বে ৬০০ থেকে ৩০০০ টাকা, ফিশিং রিল বা হুইল ৬০০ থেকে ৫৫০০ টাকা, ফিশিং লাইন বা সুতা (প্রতি রিল) ২০০ থেকে ১৫০০ টাকা, ফিশিং নেট ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা, ফিশিং হুক বা বড়শি (প্রতি প্যাকেট) ৩৫ থেকে ১২০ টাকা, টুল বক্স ৩০০ থেকে ২০০০ টাকা। এছাড়া ফিশিং রড় সুরক্ষিত রাখার জন্য দুই ধরনের ব্যাগ পাওয়া যায়। এগুলোর দাম ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*