মশিউর রেজা রাব্বীর বিস্ময়কর রোবট আবিষ্কার

*  সিলেট থেকে মো. আমিনুল ইসলাম

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর মধ্যরাতে যখন ঢাকার একটি পরিত্যক্ত পাইপের মধ্যে আটকে পড়া শিশু জিহাদকে নিয়ে দেশবাসী উৎকণ্ঠিত তখন মশিউর রেজা চৌধুরী রাব্বী দমকল বাহিনীর দেওয়া একটি ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। সেই নম্বরে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। পরে আটকে পড়া শিশু জিহাদকে কেচার বা খাঁচা দিয়ে উদ্ধার করা হয়। সে ঘটনার পর থেকে রাব্বী চেষ্টা করছিলেন আরো উন্নত প্রযুক্তিতে অর্থাৎ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এরকম দুর্ঘটনা ঘটলে কিভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চালনো যায়। যেই চিন্তা, সেই কাজ। প্রায় ৬ মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা চালান সুনামগঞ্জ শহরের কাজিরপয়েন্ট এলাকার বাসিন্দা মশিউর রেজা চৌধুরী রাব্বী। সেই চেষ্টায় তিনি সফল হয়েছেন। পাইপের মধ্যে কোন শিশু বা কেউ আটকা পড়লে রোবটের মাধ্যমে উদ্ধারের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন তিনি।
তাৎক্ষণিকভাবে পাইপের ব্যাস ও আটকে পড়া মানুষের ওজন অনুযায়ী উদ্ধারের জন্য তিনি রোবট তৈরি করতে পারবেন বলে জানান।
রোবট দিয়ে পাইপের মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার কার্যক্রম দেখতে সম্প্রতি এ প্রতিবেদক হাজির হন সুনামগঞ্জ শহরের কাজির পয়েন্টস্থ মশিউর রেজা চৌধুরী রাব্বী’র বাসায়। তখন তিনি পরীক্ষামূলকভাবে উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয়টি দেখান।
পরীক্ষার জন্য তিনি প্রথমে শীতলপাটি দিয়ে একটি ডামি পাইপ তৈরি করেন। পাইপের ভেতরে ২৫০গ্রাম ওজনের একটি পুতুল ফেলেন। পরে ছাতার স্প্রিং, সুপারি গাছের খোল, পাতলা পাত দিয়ে তৈরি করা রোবট নামান পাইপের ভেতরে। আর এই নামানোর প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছিলেন উপরে লাগানো একটি কাঠের টুকরা ও রোবটে লাগানো দু’টি দড়ির মাধ্যমে। নিচে নামানোর পর একটি ইলেকট্রিক্যাল তারের মাথায় লাগানো একটি সুইচ দিয়ে পুরো রোবটটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। পরে পাইপের যে স্থানটিতে পুতুল ফেলা হয় সে স্থানটিতে রোবটটিকে দাঁড় করানো হয়। সুইচ টিপে প্রসারিত করা হয় রোবটের দুই হাত। পরে আরেকবার সুইচ টিপলে রোবটটি তার হাত দিয়ে চেপে ধরে পুতুলটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
রাব্বী জানান, রোবটটিতে তিনি ৩ ভোল্টের মোটর ব্যবহার করেছেন। মোটরের শক্তিতেই ২৫০গ্রাম ওজনের পুতুলটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে রোবট।
তিনি আরো জানান, গভীর পাইপের ভিতরে অভিযান চালানো হলে রোবটে ২টি টর্চ লাইট, ১টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। লাইটের আলোয় ক্যামেরার মাধ্যমে স্থান শনাক্ত করে উদ্ধার অভিযান চালানো যাবে। আটকে পড়া মানুষ যদি পাইপের মধ্যে সোজা হয়ে থাকে তাহলে সোজা এবং উপুর হয়ে থাকে তাহলে রোবটটিও উপুর হয়ে অভিযান চালাতে পারবে। আর পাইপের ব্যাস ও গভীরতা অনুযায়ী রোবট নির্মাণ করা হবে। পাইপের মধ্যে যদি পানি জমে থাকে তারপরও উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব বলে তিনি জানান।
রাব্বী বলেন, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি হাতে পেলে আমি আরো ভালোভাবে রোবটিকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই কাজটি করতে পারছিনা। এখন পূর্ণাঙ্গভাবে পরীক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আর্থিক সাহায্য দরকার।
শহরের এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র মশিউর রেজা চৌধুরী রাব্বী’র বাবা মুক্তিযোদ্ধা অহিদুর রেজা চৌধুরী জানান, ছোটবেলা থেকেই খেলনা গাড়ির মোটর, মোবাইলের পুরাতন ব্যাটারি দিয়ে নানা যন্ত্র তৈরি করতেন রাব্বী। কিছুদিন আগে রাব্বী বৈদ্যুতিক ঘাস কাটার মেশিন তৈরি করেছে। পুরাতন মোবাইলের ব্যাটারি দিয়ে আইপিএস-ও তৈরি করেছেন। সেই আইপিএস দিয়ে দীর্ঘ সময় তাদের ঘরে আলো জ্বলছে। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে রাব্বী’র অনেক আগ্রহ। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তাকে আমরা সাহায্য করতে পারছি না। সরকার থেকে সহযোগিতার হাত বাড়ালে সে খুব উপকৃত হবে।