ওষুধের অপব্যবহার ডেকে আনতে পারে হৃদরোগ

আপনি কি শরীর ভালো রাখতে দীর্ঘ দিন ধরে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গোত্রের ওষুধ খান? মনে রাখবেন, হাই ডোজে দীর্ঘ দিন এ ওষুধ খেলে কিন্তু হিতে বিপরীতই হতে পারে।

হার্টের অসুখ থেকে শুরু করে হাঁপানি, ডায়াবেটিস, ডিসলিপিডিমিয়া- এমন হাজারো রোগে বহু চিকিত্‍সকের প্রেসক্রিপশনে সাপ্লিমেন্টরি মেডিসিন হিসেবে উল্লেখ থাকে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, বিটা-ক্যারোটিন ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট৷ লক্ষ্য, শরীরে ঘুরে বেড়ানো ক্ষতিকারক ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যালস’কে দমন করা৷ কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে উল্টো কথা। ২০১৫-তে প্রকাশিত ‘হার্পার ইলাস্ট্রেটেড টেক্সট অফ বায়োকেমিস্ট্রি’র সাম্প্রতিকতম সংস্করণে বলা হয়েছে, বেশি মাত্রায় দীর্ঘ দিন অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট খাওয়ার অর্থ বাড়তি বিপদ ডেকে আনা। কারণ, তখন এই ওষুধ প্রো-অক্সিডেন্টের ভূমিকা পালন করে ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যালস’-এর রমরমায় পরোক্ষে সাহায্যই করে।

শুধু অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টই নয়, ক্রনিক বহু অসুখে ব্যবহৃত অনেক ওষুধই দীর্ঘ ব্যবহারে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে৷ সেই তালিকায় চিকিত্‍সকরা সবার উপরে রাখছেন এনএসএআইডি (নন-স্টেরয়ডিয়াল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ) বা চলতি কথায়, পেনকিলারদের৷ অস্টিয়ো-আর্থ্রাইটিস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থেকে শুরু করে যে সব অসুখে ব্যথা-যন্ত্রণা নিত্যসঙ্গী, সেই সব রোগের চিকিত্‍সায় দেদার পেন-কিলারের ব্যবহার লম্বা সময়ে রোগীর হৃদযন্ত্রের প্রভূত ক্ষতি করে৷ পরিসংখ্যান বলছে, বিভিন্ন এনএসএআইডি-র হাই ডোজে লংটার্মড ব্যবহার ৩২-৫০% ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক ডেকে আনে।

ডায়াবিটিসের চিকিত্‍সায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধও হার্টের সমস্যা ডেকে আনতে পারে৷ গ্লিটাজোন (পায়োগ্লিটাজোন, রোসিগ্লিটাজোন), গ্লিপটিন (স্যাক্সোগ্লিপটিন, লিনোগ্লিপটিন), সালফোনিলইউরিায় (গ্লিবেনক্ল্যামাইড) ইত্যাদি ওষুধের ক্ষেত্রেও কার্ডিয়াক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে৷ সোডিয়াম রিটেনশন বেড়ে গিয়ে উচ্চ রক্তচাপ মাথাচাড়া দেওয়া থেকে শুরু করে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (হৃদপেশি মোটা হয়ে যাওয়া), এমনকি হার্ট ফেলিয়োরের মতো নজির রয়েছে এই সব ওষুধগুলির ক্ষেত্রে৷ বেশ কয়েকটি হার্ট অ্যাটাকের অঘটন ঘটে যাওয়ার পর রোসিগ্লিটাজোন ওষুধটি নিষিদ্ধ পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে সারা পৃথিবীতে।

গ্যাস-অম্বলের ওষুধ হিসেবে জনপ্রিয় প্যান্টোপ্রাজোল দীর্ঘ দিন ধরে নিত্য খেয়ে গেলেও অন্যদের চেয়ে হার্ট ফেলিয়োরের আশঙ্কা বাড়ে বলে জানাচ্ছেন ফার্মাকোলজির বিশেষজ্ঞরা৷ তাঁরা জানাচ্ছেন, ক্রনিক যন্ত্রণা কিংবা শ্বাসকষ্টের চিকিত্‍সায় দীর্ঘ দিন স্টেরয়েড ব্যবহারেও একই ক্ষতি হতে পারে৷ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে ক্যান্সারের চিকিত্‍সায় ব্যবহৃত নানা কেমোথেরাপির ওষুধেও।

শুধু ওষুধেই যে ক্ষতি, এমন নয়৷ জীবনচর্যার পদে পদেও লুকিয়ে রয়েছে এমন নানা শঙ্কা৷ সেই তালিকার প্রথমেই রয়েছে সিডেন্টারি লাইফস্টাইল৷ অর্থাত, কায়িক পরিশ্রম না-করে শুয়ে-বসে দিন কাটিয়ে দেওয়ার অভ্যাস৷ এই অভ্যাসের জেরে মেদ আর ওজন বাড়ে যার জেরে ডায়াবেটিস আর ডিসলিপিডিমিয়ার সমস্যা আচমকা হানা দিতে পারে শরীরে৷ নিট ফল- হার্টের ব্যামো৷ রেড মিট খাওয়ার অভ্যাস এবং শাকসব্জি ও ফলমূল না-খাওয়ার অভ্যাস নিশ্চিত ভাবেই করোনারি হার্ট ডিজিজ ডেকে আনে অসময়ে।

তবে যৌনতার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক রয়েছে হার্টের৷ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সুস্থ যৌনজীবন হৃদযন্ত্রের পক্ষে ভালো৷ স্বতস্ফূর্ত ও নিয়মিত যৌনসংসর্গ পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সকলের হার্টকে সুস্থ রাখে। সেক্সোলজিস্টদের বক্তব্য, লিঙ্গশৈথিল্য বা ইরেকটাইল ডিসফাংশন হার্ট অ্যাটাকের জন্য ‘অ্যাডভান্সড অ্যালার্ম’ হিসেবে কাজ করে৷ কেন না, পুরুষাঙ্গের ক্যাভারনোজার মধ্যে থাকা
ধমনী-শিরা-উপশিরা-জালিকাগুলিই শরীরের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রক্তবাহিকা৷ ফলে রক্তবাহিকায় যদি ব্লকেজ বাসা বাঁধে, তা হলে তা হৃদধমনীকে ব্লক করে হার্ট অ্যাটাক করানোর ঢের আগেই ব্লক করে দেবে পুরুষাঙ্গের রক্তবাহিকা (যার জেরে লিঙ্গশৈথিল্য)৷ বিশেষজ্ঞদের দাবি, গবেষণায় দেখা গিয়েছে, লিঙ্গশৈথিল্যের শিকার পুরুষদের মধ্যে ৬০-৭০% ক্ষেত্রে ছ’-সাত বছর পরে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

যদিও তাঁরা সতর্ক করছেন, লিঙ্গশৈথিল্য কারও হয়নি মানেই যে তাঁর হৃদযন্ত্র সুস্থ, এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই৷ একই কথা তাঁরা বলছেন মহিলাদের ক্ষেত্রেও৷ যৌনাকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও যদি কোনও মহিলার মনে হয়, লুব্রিকেশনের সমস্যায় সঙ্গম বিরক্তিকর লাগছে, তখন তাঁর সাবধান হওয়া উচিত৷ কেন না, অধিকাংশ এমন ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্ট্রেস বা অন্য কোনও কারণের জেরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রভাবিত হয়েছে তাঁর হৃদযন্ত্রও৷ তাই নিয়মিত ও সুস্থ যৌনজীবনের অনাবিল আনন্দে যাঁরা ভাসেন, তাঁদের হৃদযন্ত্র আর পাঁচ জনের চেয়ে যে বেশি সুস্থ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তবে পরকীয়াতে ‘না’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা৷ কেন না, মনের অবচেতনে খেলা করা টেনশন থেকে যে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয় শরীরে, তা আখেরে যৌনতার আনন্দকে টপকে হৃদযন্ত্রের ক্ষতিই করে। সূত্র : এই সময়