শিল্পে যার সম্মোহন, অভিনয় যার অস্তিত্বজুড়ে : মুবিদুর রহমান সুজাত

 

শুভাশীষ শুভ :

12118599_10201143138738204_4876953582802444001_nযক্ষপুরীতে মাটির নিচ থেকে তাল তাল সোনা তুলতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। নিয়তি যাদের শৃঙ্খলে বন্দী, তাদেরই একজন বিশু পাগল। বিশু গান শোনায় নন্দিনীকে, ‘ওগো দুঃখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো…’। এদিকে নন্দিনী চায় মুক্তি। নন্দিনীর মুক্তির স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে বিশুর হৃদয়ে। বিশু’ই হয়ে উঠে যক্ষপুরীর বিদ্রোহী কিংবা স্পার্টাকাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি রক্তকরবীর ‘বিশু’, কখনো সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’, কখনো কার্লো গোলদোনির কমেডি- দ্য মারসেন্ট অব টু মাস্টার্স এর ‘নওকর’ কিংবা কখনো ফ্রাঞ্চ কাফকার মেটামরফোসিস অবলম্বনে অমৃতের সন্ধানে’র সামাজিক রজ্জুতে বন্দী ‘মহীন’। এমন অসংখ্য চরিত্রে নিজেকে জড়িয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে যাচ্ছেন অভিনয় শিল্পী মুবিদুর রহমান সুজাত।

প্রায় পঁচিশটি নাটকে দুইশত পঞ্চাশটির অধিক প্রদর্শনীতে মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন বিভিন্নভাবে। উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী’র ‘বিশু পাগল’, মুক্তির উপায়- ‘ফটিক চাঁদ’, মলিয়রের লা ম্যারিজ ফোর্স’র ‘স্গানারেল’, জর্জ ড্যান্ডিন- ‘লুবিন’, সফোক্লিস‘র ‘ইডিপাস’, স্যামুয়েল ব্রেখক্ট এর অলদেট ফল’র ‘মি. রনি’, কার্লো গোলদোনির সারভেন্ট অব টু মাস্টার্স এর, ‘ট্রুফালদিনো বাত্তোচিও’ ইত্যাদি।
অভিনয়ের পাশাপাশি সুজাত কাজ করছেন নির্দেশক হিসেবেও। এর মধ্যে সুকুমার রায় এর হ-য-ব-র-ল (২০০৮), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজা ও রাজদ্রোহী (২০০৬), ইচ্ছেপূরণ (২০১১), তোতাকাহিনী (২০১৩), ডাকঘর (২০১৩), বাণিজ্যেতে যাবো আমি (২০১৪) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

শিল্পী মুবিদুর রহমান সুজাত এর জন্ম ১৩ জুন, ১৯৮৪ সালে। বাড়ি চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড় এলাকায়। বাবা মো.  মুজিবুর রহমান এবং মা শওকত আরা বেগম। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সুজাত বড় হয়েছেন প্রকৃতি এবং পাহাড়ের সাথে হেসে-খেলে। খুব ছোট বেলাতেই তিনি পা রাখেন শিল্পের আঙিনায়। কিড্স কালচার ইনস্টিটিউট থেকে সম্পন্ন করেন ৪ বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ। ২০০১ সালে যুক্ত হন ফেইম স্কুল অব ডান্স, ড্রাম এন্ড মিউজিক এর সাথে। এখানেই থিয়েটার তথা অভিনয়ের তালিম নেন নাট্যগুরু অসীম দাশের কাছে। তার হাত ধরেই চিনেছেন থিয়েটারের নানা অলিগলি; শিখেছেন অভিনয়। অদ্যবধি যুক্ত আছেন ফেইম এর সাথেই। থিয়েটার চর্চার পাশাপাশি চলতে থাকে পড়াশোনা। হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করে পড়েছেন- সিএসিসি।
ফেইম এর পাশাপাশি তিনি অংশগ্রহণ করেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্মশালায়। সান্নিধ্য লাভ করেন, এনএসডি অধ্যাপক ড. জামিল আহমেদ, ড. বিপ্লব বালা, অরুন মুখোপাধ্যায়, খ্যাতিমান মূকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুমদারসহ আরো অনেকের।

এরই ধারাবাহিকতায় তিনি অংশগ্রহণ করেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবে। এর মধ্যে জাতীয় শিশু কিশোর থিয়েটার উৎসব, ভারত রং মহোৎসব, বহরমপুর নাট্য সমারোহ, ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্স থিয়েটার ফেস্টিবল, ইন্টারন্যাশনাল চিল্ড্রেনস পিস মুরাল এক্সিবিশন (জাপান) উল্লেখযোগ্য।

12088045_10201143138978210_6891542146461981115_nঅভিনয় করেন কাজী মাহতাব উদ্দীন পরিচালিত স্বল্প-দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সময়’। শুধুমাত্র অভিনয় নয়। সুজাত’র পদাচারণ শিল্পের বিভিন্ন শাখায়। কৃতিত্ব দেখিয়েছেন আবৃত্তি, চিত্রকলা, সংগীত কিংবা মুকাভিনয়ে। তার আঁকা ছবি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জন করেছে প্রথম স্থান- জায়গা করে নিয়েছে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হিসেবেও। ২০১০ সালে তিনি অর্জন করেন কিউট চ্যানেল আই ছন্দে আনন্দে আবৃত্তি  প্রতিযোগিতায় ২য় রানারআপ এর পুরস্কার। তার কণ্ঠেই পড়ালেখা শিখছেন প্রতিবন্ধী শিশুরা। ইপসা’র তত্ত্বাবধানে প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্মিত প্রাথমিক স্তরের অডিও বইতে কন্ঠ দেন তিনি।

সুজাত মনে করেন, ‘অভিনয় শিল্পের সমষ্টিগত রূপ। একজন অভিনেতাকে বিচরণ করতে হয় শিল্পের সমস্ত শাখায়। আর সব কিছুর সময়ন্বয়েই একজন ভালো অভিনেতা হয়ে ওঠা সম্ভব’। ব্যবসায় শিক্ষায় পেশাগত ডিগ্রী অর্জন করেও পুরদস্তুর এই শিল্পী কাজ করেছেন, ফুলকির সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসেবে। পাশাপাশি ফেইম এর আবৃত্তি ও অভিনয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন।

প্রিয় ব্যক্তিত্ব সবসময় পাশে থাকা বাবা, মা, গুরু অসীম দাশ, বড় মামা ড. রশীদ আহমেদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু নন্দী; যার কাছে আবৃত্তির বোধটুকু শেখা, এবং ফেইম‘র সহকর্মী বন্ধুরা। এই প্রিয় মানুষগুলো এবং দর্শক তার প্রেরণার মূল উৎস। যাদের জন্য প্রতিবার মঞ্চে উঠার আগে নতুন শিহরণ অনুভূব করেন।

তিনি পছন্দ করেন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধাবোধ। ভীষণ অপছন্দ শঠতা, অহমিকা। মেধাবী এই তরুণ শিল্পী বিশ্বাস করেন, তারুণ্যের সজীব মেধাই পারে সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণাঙ্গতা আনার। তার ভাবনায় উঠে আসে দেশ। অন্তত দেশে আর কোন অসততা থাকবে না। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধাবোধ থাকবে। প্রাজ্ঞজনদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হবে সব সময়। প্রচার বিমুখ এই তরুণ নাট্যকর্মী স্বপ্ন দেখেন, তার কর্মস্থল ফেইম একদিন পূর্ণাঙ্গ ইনষ্টিটিশন-এ রূপ নেবে। থিয়েটারকে পেশা  হিসেবে নিয়েই মানসম্মতভাবে বেঁচে থাকবেন, থিয়েটারকে মন থেকে ভালোবাসা অগণিত কর্মীরা।