দেশের আকাশে নাবিলের ‘ড্রোন’

সিলেট থেকে মো. আমিনুল ইসলাম :

2ইচ্ছে ছিলো আকাশ ছোঁয়া। মুক্ত আকাশটাতে ভেসে বেড়ানো। স্বপ্নগুলো সাজিয়ে দেওয়ার। বিশাল ওই আকাশজুড়ে। সেও কি সম্ভব?  অন্য কোন ইচ্ছে নেই কেন? পড়াশোনা শেষে একটা ভালো চাকুরি কপালে জুটলেও তো চলে। তবে আকাশ নিয়ে এতো ইচ্ছে থাকার মানে কি? আকাশ তো আকাশের মতোই। এমন করে হয়তো অনেকেই বলেছে। পিছুটান ছিলো অনেক। টপকাতে হয়েছে। স্বপ্নগুলোকে আকাশে উড়তে দেখার যে ভালোলাগা সেটা এক তরুণ কেবল নিজেই উপলব্ধি করেছিলো।
আর সে স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিয়ে সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে সে। দেখিয়ে দিয়েছে লক্ষ অটুট থাকলে সবই সম্ভব। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পক্ষে ‘ড্রোন’ তৈরির ব্যাপারটা তুচ্ছ কাহিনী নয়। দেশের আকাশে দেশের তৈরি ‘ড্রোন’। ইচ্ছেশক্তি দিয়ে স্বপ্ন জয়ের এ কাহিনীটা নাবিলের।
আবিস্কারের নেশা যখন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় তখন সে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
বর্তমানে তিনি একের পর এক ‘ড্রোন’ তৈরি ও তা আকাশে উড়িয়ে সকলের নজর কারতে সক্ষম হয়েছেন।  তিনি আজ ক্যাম্পাসের হাজারো তরুণের চোখে এক সফল ব্যক্তিত্ব।
সম্প্রতি তাঁর সাফল্যগাঁথা দিনগুলির কথা পাঠকের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসে তারুণ্যলোক প্রতিবেদক গিয়েছিলেন শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে। কথা হয় আবিস্কারের নেশায় ছুটে চলা সেই নাবিলের সঙ্গে। জানা গেলো তার পুরো নাম সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিল। তিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে সম্প্রতি মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালেয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার দক্ষতার কারণে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আরো ভালো স্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

3
গল্পে গল্পে জানা হলো অনেক কিছুই। জানা গেলো নাবিলের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। হবিগঞ্জে নানার বাড়িতে শৈশব-কৈশোর কেটেছে তার। তিনি নিজেকে সিলেটের ছেলে বলেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। নাবিলের বাবার নাম  সৈয়দ মনিরুল হক। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার। মা আয়েশা বেগম গৃহিনী। ছোট ভাই সৈয়দ আশরাফুল হক নাহিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের ছাত্র। আর ছোট বোন সৈয়দা ফারজানা হক নাশিদ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

নাবিল বলেন, ছোটবেলা অনেক দুষ্টুমি করে কেটেছে, আমার খেলনাগুলো বেশিদিন টিকতো না, সব ভেঙে ফেলতাম, খেলনার ভেতরে কি আছে সেটা দেখার ইচ্ছে করতো, সার্কিট ফিটিংসগুলো খুলে ফেলতাম, হেলিকপ্টার দেখে তাকিয়ে থাকতাম, আকাশ দিয়ে উড়ে চলার সময় হেলিকপ্টারকে আমার কাছে খুব ছোট মনে হতো, একবার আমার মামাকে বলেছিলাম আকাশ দিয়ে উড়ে বেড়ানো ছোট হেলিকপ্টার কিনে দিতে, আকাশ আর উড়ে বেড়ানো যন্ত্রের স্বপ্ন আমার চোখে সেই ছোটবেলা থেকেই’।
এ স্বপ্ন নিয়েই একটু একটু করে এগিয়ে চলছিলেন নাবিল। পড়াশোনার পাশাপাশি আবিস্কারের নেশায় তিনি ডুবে থাকতেন। এমনি করেই পা রেখেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। আর তখন থেকেই যেনো স্বপ্নগুলো বাস্তবতার দিকে ছুটতে থাকে। তিনি একদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিলেন অচেনা এক আজব যন্ত্র। যা সত্যি সত্যি ক্যাম্পাসের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। মাটিতে থেকে তিনি প্রযুক্তি ব্যাবহার করে যন্ত্রটাকে নিয়ন্ত্রনও করেছিলেন। যন্ত্রটি বিশ্বে চালক বিহীন বিমান বা ‘ড্রোন’ বলে পরিচিত।
1
নাবিল বলেন, একবার ছোটবেলা বাড়ির ছাদ থেকে কাগজ দিয়ে বানানো ছোট একটি প্যারাস্যুট নিয়ে লাফ দিতে চেয়েছিলাম, আম্মু যদি না দেখতেন তাহলে ঘটনাটা যে কি হতো কে জানে?, আমি অবশ্য সেদিন অনেক মার খেয়েছিলাম’। সেদিন প্যারাস্যুট অভিযান সফল না হলেও বর্তমানে নাবিলের একের পর এক আধুনিক যন্ত্র তৈরির অভিযান সফলতার মুখ দেখছে।

এখন যেকোনো স্থানে ‘ড্রোন’ পাঠিয়ে তা ইচ্ছেমতো ওঠা-নামা ও প্রয়োজনিয় কার্যক্রম চালানো তার জন্য কোনো ব্যাপারই না।

তবে নাবিলের স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। সে আরো এগুতে চায়। বাংলাদেশের হয়ে সে বিশ্বকে দেখাতে চায়। হ্যাঁ আমরাও পারি।
নাবিলের দিন কাটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রোন প্রজেক্ট নিয়ে। এখানেই সে গল্প সাজায়। সুন্দর আগামী আর সফলতার।
এখানে তিনি ড্রোন প্রজেক্টের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।
শাবিপ্রবিতে দেশের প্রথম একটি পোর্টেবল ‘ড্রোন কন্ট্রোল স্টেশন’ গড়ে তুলে চলছে ‘ড্রোন’ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কাজ। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল।
এছাড়াও নাবিল মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি যন্ত্র তৈরির কাজের সাথেও যুক্ত আছেন।
4
নাবিল বলেন, বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। একদিন স্যার বলেছিলেন, ‘ড্রোন’ ওড়ানোর কথা।
স্যার বিষয়টি নিয়ে কতোটা সিরিয়াস ছিলেন জানি না, কিন্তু  আমার মাথায় ‘ড্রোন’ শব্দটা ভাইরাসের মতোই আক্রমণ করতে থাকলো, তবে কাজ করবো কি করে? বাজেট তো একদমই ছিলো না, স্যার নিজের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আপাতত কাজ চালানোর জন্য বলেছিলেন’।
দেরি না করে তিন চার মাস সময়ের মধ্যে শাবির আকাশে ‘ড্রোন’ ওড়ানোর প্রত্যাশায় পুরো উদ্যোমে কাজ শুরু করেছিলেন নাবিল। আর দিন রাত পরিশ্রমে মাত্র ২৫ দিনের মাথায় আসে একটি সফলতার খবর। এটি ছিলো এয়ারক্রাফট টাইপ রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস ওড়ানের একটি যন্ত্র। সেখান থেকেই বড় ধরনের সফলতার শুরু।

নাবিলের  জীবনের অতীতগুলো তিনি ব্যক্ত করেছেন। তিনি যখন প্রাথমিকের ছাত্র ছিলেন তখন স্কুলে যেতে তার ইচ্ছে করতো না। তিনি হবিগঞ্জ জেলার রোজেস কিন্ডারগার্টেন বিদ্যাপিঠে পড়তেন। সেখানে অল্প কিছুদিন লেখাপড়া করেন তিনি। তার বাবা একজন ব্যাংকার ছিলেন। যখন তিনি নবিগঞ্জে বদলি হন তখন নাবিলকে নবিগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সেখানে ছিলেন ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত। পরে আবার তার বাবা বদলি হওয়ায় হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন নাবিল। সেখান থেকে ২০০৫ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি।
পরে হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হন নাবিল। মেধাকে কাজে লাগিয়ে ২০০৭সালে কলেজটি থেকে তিনি এইচএসসি উত্তীর্ন হন।
পরবর্তীতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।
তখন মাঝেমধ্যেই প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে অর্থ সংকটে পরতেন নাবিল। কিন্তু সে অনুযায়ী টাকা তার কাছে ছিলো না। তখন লোকের বাসার কম্পিউটার সার্ভিসিংয়ের কাজ করা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বিজ্ঞানমেলার জন্য অনেককে রোবট তৈরি করে দিতেন তিনি। এখান থেকে যে কিছু টাকা পাওয়া যেতো তা দিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় করতেন নাবিল।
রোবট বা প্রজেক্ট তৈরির সময় একটা শর্ত ছিলো যে তৈরি করা যন্ত্রটি যে নাবিল তৈরি করেছেন সেটা যেনো কেউ না জানে। তাই একবার তার তৈরী রোবট প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান অর্জন করলেও তাকে পরে আর রোবটটি ছুঁয়ে দেখতেও দেওয়া হয়নি।
এভাবে চলতে থাকে অনেকদিন। এরপর নাবিল স্থানীয় একটি ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানে কাজ করা শুরু করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি চলে তার কর্মযজ্ঞ। নাবিলের মতে তার স্বপ্নগুলো বাস্তবতায় পরিনত হওয়ার পেছনে ইলেক্ট্রনিক্স এর দোকানটি প্রেরণা যুগিয়েছে। দোকানটির নাম ছিলো ‘ঐশী ইলেক্ট্রনিক্স’। সেখান থেকে তিনি মাইক্রো কন্ট্রোলার শিখেছিলেন।

নাবিল যখন হাইস্কুলে লেখাপড়া করেন তখন একটি প্রজেক্ট উপস্থাপন করে বিজ্ঞানমেলায় অংশ নিয়ে সারা দেশে প্রথম হন নাবিল। সেসময় একটি ডিভাইস বানিয়ে সেটা দিয়ে কথা বলিয়েছিলেন তিনি।

তার তৈরি করা ড্রোনগুলোর মধ্যে ‘ওয়েদার ইনফরমার ড্রোন’ অক্টোকপ্টার ড্রোন’ ‘ডেলিভারি ড্রোন’  ‘হেক্টা কপ্টার ড্রোন’ ‘ভার্ভিয়েল্যান্স ড্রোন’ অন্যতম। এগুলো সহ তিনি ৭ধরণের ড্রোন তৈরি করেছেন। অন্যদিকে তার তৈরি যন্ত্রগুলোর মধ্যে ‘ট্রেকিং ডিভাইস’ ‘লেজার কন্ট্রোলার’ ‘প্রতিবন্ধীদের চলাচলের ঘড়ি’ অন্যতম। তবে  ‘ড্রোন’ উড়িয়ে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসেন। সবদিকেই যেনো কেবল নাবিলের সাফল্যের গল্প।
নাবিলের তৈরি আরো একটি যন্ত্র হলো ‘ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন’ (ইভিএম) । এই  ইভিএম মেশিন থেকে সঙ্গে সঙ্গে ভোট সার্ভারে চলে যাওয়া যায়। এতে করে ভোট চলাকালে যন্ত্রটি কেউ বিকল করে ফেললেও এর ফলাফল নষ্ট করতে পারবে না। এ যন্ত্রটি তিনি তৈরি করেছিলেন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর।

নাবিল জানালেন, মিলিটারি টেকনোলজি নিয়ে তার আগ্রহ বেশি। দেশের সশস্ত্রবাহিনীর জন্য প্রতিবছর প্রচুর যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে ক্রয় করতে হয়। তার ইচ্ছে সেই যন্ত্রপাতিগুলো একটু সুযোগ পেলেই তিনি দেশে তৈরি করবেন। বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন তিনি। তিনি বলেন ‘মিলিটারিদের কাজে যেসব টেকনোলজির প্রয়োজন পরে  আমাদের বাহিনীগুলোকেও সেরকম টেকনোলজি সরবরাহের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলতে  স্বপ্ন দেখি আমি। যদি আমাকে সামরিক অস্ত্রের উন্নয়নে কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে সেটা আমি করতে রাজী আছি।’ ইতিমধ্যে নাবিল বাংলাদেশ সেনা বাহীনির কাছে ড্রোন টি উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েক ধরনের ড্রোন তৈরি ও তা আকাশে উড়িয়ে পরিক্ষা করেছেন।  মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে সাবমেরিন তৈরি করেও তিনি আলোচনায় এসেছেন।

নাবিলের স্বপ্ন অন্যদের থেকে একটু আলাদা। তিনি বাংলাদেশকে ঘিরেই সাজিয়েছেন জীবনের গল্প। অন্যদের মত ভালো সুযোগ পেয়ে বিদেশে গিয়ে প্রযুক্তিবিদ হয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেন না নাবিল। তিনি দেশটাকে হৃদয়ে ঠাই দিয়ে কাজ করে যেতে চান।
দেশে উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে বড় ধরণের স্বপ্ন বুনেন নাবিল।

তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে দেশে বাইরে থেকে এখন যে প্রযুক্তি আমদানি করে বিপুল টাকা ব্যয় করা হয় তা আর করতে হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি নাবিলকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিয়ে যায়। সেখানে সেনাবাহিনী কোন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করতে পারবেন সে ব্যাপারে কাজ করেন নাবিল। ড্রোন ছাড়াও নাবিল তৈরি করেছেন ‘ক্লাস্টার কম্পিউটার’।
নাবিলের মতে অর্থ সংকট মানুষকে আটকে দেয় না। ইচ্ছে আর চেষ্টা থাকলে সবাই এগিয়ে যেতে পারে। সেজন্য লক্ষটা ঠিক রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।