আদুরি

আরিফ সাওন

ঢাকা থেকে ফিরে এসে এ রকম একট দুঃসংবাদ শুনতে হবে তা আমার জানা ছিল না। পাঁচ দিনের জন্য অফিসিয়াল কাজে ঢাকা গিয়েছিলাম। ফিরে এসে তাঁকে যে আর দেখতে পাব না; সে যে আর আমার কাছে এসে বসবে না; আমাকে জড়িয়েও ধরবে না; আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েও থাকবে না, এসব কখনোই ভাবতে পারি নি। আমি যখন দূর থেকে আসতাম সে দৌড়ে আমার কাছে আসত। আমার দিকে অপলক তাকিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করতো এরপর জড়িয়ে ধরত। মুখ নেড়ে নেড়ে কত কথা বলত। প্রতিদিন সকালে আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন বাগেরহাট যেতাম। সমস্ত কাজ সেরে বাড়ি আসতে রাত দশটা বেজে যেত। বাড়ি ঢুকে দেখতাম সে আমার পথ চেয়ে দরজার সামনে বসে আছে। আমাকে দেখা মাত্র আমার কাছে দৌঁড়ে আসত। আমি জামা কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুতে যেতাম। সেও আমার সাথে সাথে যেতো। এরপর দু জনে একসাথে খেতাম। আমার মাখা ভাত না খেলে তার পেটই ভরতো না।
হ্যাঁ,আদুরি ! আদুরির সাথে আমার যে বেশি দিনের পরিচয় তা নয়। মাস খানেক হবে হয়তো। আমার প্রতিবেশি রাজু আদুরিকে বকুলতলা বাজারে পেয়ে বাড়ি এনে আশ্রয় দেয়। রাজুর কাছেই সে বড় হয়েছে। আদুরি মাঝে মাঝে আমাদের ঘরে আসতো কিন্তু আমি কখনো সেই ভাবে তার দিকে তাকাতাম না। মাসখানেক আগে রাজু যখন শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যায়। তখন আদুরি খুব একা হয়ে পড়ে। সারাদিন না খেয়ে এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াত। রাজুকে না দেখে কান্নাকাটি করতো।
সে দিন ছিল সোমবার। বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হল আমার। এসে দেখি সে আমাদের ঘরে বসে আছে। মা-বাবা সবাই ঘুম। ঘরের দরজা খোলা। আদুরি দরজার সামনেই বসে আছে। ঘরে ঢুকতে হলে তাকে সরিয়ে অথবা তাকে ডিঙ্গিয়ে তারপর ঢুকতে হবে। আমি তাকে ডিঙিয়ে তারপর ঢুকলাম। সে নড়লও না প্রতিবাদও করল না। জামা কাপড় ছেড়ে খেতে গেলাম। অন্যদিন মা ঘুম থেকে উঠে এসে আমাকে খেতে দিত। কিন্তু আজ তার ঘুম ভাঙল না। কোন সাড়া-শব্দ নেই। চারিদিক নিরব-নিথর। রান্না ঘরে মিটমিট করে ল্যাম্প জ্বলছে । পূর্ব আকাশে চাঁদ উকি মারছে। বেলে- বেলে জ্যোৎনা। নববধুর মত ঘোমটায় মুখ লুকানো প্রকৃতি। হঠাৎ ঘরের উত্তর পাশে ভাগের বড় পুকুরে মাছের দৌড়-ঝাঁপের শব্দ শোনা গেল। রান্না ঘরের পাশে নারিকেল গাছে ইঁদুরের আগমনও শুরু হয়েছে। হয়তো বা আজ মেলা বসবে। মেলায় নারিকেল নষ্ট করার প্রতিযোগিতাও হবে। আমি রান্না ঘরে খুঁটি হেলান দিয়ে খাটের উপর বসে ভাবছি, ক-তো … কথা। চোখে ঘুমের ভাবও এসেছিল। পাটাতন থেকে একটি তেলাপোকা ধরে ধপ করে খাটের উপর পড়ল কালো বিড়ালটা। আমার গাঁ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি ক্ষুধার্ত পেটে অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আদুরি। তার মায়াবি চোখ জোড়া পানিতে ছলছল করছে। মুখ বেয়ে একফোঁটা পানি মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। খাওয়ার জন্য জিহ্বাটা যেন কেমন করছে। হয়তো সারাদিন কিছুই পেটে পড়ে নি। তাঁর প্রতি আমার খুব মায়া হল।
থালে ভাত নিয়ে খেতে বসলাম। কিছুক্ষণ খাওয়ার পর হঠাৎ মুখের কাছে  উঠে হাত থেমে গেল। নিজেকে বিবেকহীন বলে মনে হল। কোন ক্ষুধার্তকে সামনে রেখে এভাবে পেট পুরে খাওয়া কোন বিবেকবান মানুষের চরিত্রে মানায় না। তাই তার জন্য হাড়ি থেকে ভাত তুললাম। তার সামনে দেব দেব এমন সময় মা ডেকে বলল, ‘তুই একা একা কি খেতে পারবি, না আমি আসবো?’
‘না মা তোমাকে আসতে হবে না । আমার খাওয়া প্রায় শেষ’।
ভয় পেয়ে গেলাম। মা এসে যদি আদুরিকে দেখতে পায় তবে বকাবকি করবে। শুধু আমাকে আর আদুরিকে নয়; রাজুকেও। আদুরি আমাদের ঘরে আসুক এটা মা-বাবা কেউ চায় না। এর পূর্বে আদুরি ও রাজু অনেক গাল মন্দ শুনেছে। কিন্তু আমাদের ঘরে আসা বন্ধ করে নি। আদুরিকে আর আমার পাশে বসিয়ে খাওয়াতে পারলাম না। পিছনের বারান্দায় ওকে খেতে দিলাম। মা রান্না ঘরে আসলে যাতে তাকে দেখতে না পায়। আদুরি খেয়ে চলে গেল। এদিন থেকে রোজ রাতেই আমরা দুজনে একসাথে খেতাম। তা জানতো না কেউ । আস্তে আস্তে তার সাথে কিভাবে যে আমার একটা ভাব হয়ে গেল তা বলা যাবে না। আমার মনের একটা বিশেষ স্থান দখল করে নিল সে। এ বিষয়টা মা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল।
২০০৮ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে ফোন এল ঢাকা যাওয়ার জন্য। আমি যে ঢাকা যাব একথা আমার বাবা-মা আর গৃহ শিক্ষক ছাড়া অন্য কেউ জানতো না। সাকুরা পরিবহনে টিকিট কাটলাম। রাত নয়টায় গাড়ি। আটটায় রওনা দিলাম। তখন বেলে-বেলে জ্যোৎনায় বাড়ির সামনের মেটে রাস্তায় আদুরিকে দেখতে পেলাম। কাছে আসতেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি যে কোথাও যাচ্ছি এ কথা সে জেনে গেছে। আমার পথ আটকানোর জন্য ওখানেই তার দাঁড়িয়ে থাকা। রাতে সে আমাকে বাইরে যেতে দেবে না। সত্যি সত্যি আমার পথ আটকিয়ে ধরল। আমি যতবার তাকে সরিয়ে দিতে লাগলাম ততবার সে আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল। অবশেষে আমি তার মুখে একটা আঘাত করে আমার পথ থেকে সরিয়ে দিলাম। কাঁদতে কাঁদতে সে বাড়ি ফিরে গেল।
যে দিন সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে ফিরলাম, সে দিন আর কেউ আমার দিকে ছুটে এল না।আমাকে জড়িয়েও ধরল না।আমি কাউকে কিছু জিঞ্জাসা ও করলাম না। ভাবলাম  হয়তো আশেপাশে কোথাও আছে বা আমার উপর অভিমানও করতে পারে। আমি যে আজ আসবো সে কথা হয়তো কেউ তাকে বলে নি। বললে সে কোথাও যেত না। ক্ষুধায় আমার পেট চুর চুর করছিল। জামা-কাপড় ছেড়ে খেতে বসলাম। চোখ দুটো কখনো জানালা,কখনো দরজার বাহিরে কোন কিছু খুঁজছিল।
মা এটা লক্ষ করে বললেন, ‘রাজুর মত পাষাণ মানুষ আমি দেখিনি। ও আদুরিকে রাস্তায় নিয়ে বাসের তলে চাপা দিয়ে মেরে এসেছে’।
‘বল কি মা’!
‘হ্যা, জানিস তো! আদুরি সারারাত ডাকাডাকি করে। একটা পাতা পড়লেও সে ডাকতে ডাকতে সেখানে দৌড়ে যায়। তার ডাকাডাকিতে বাড়ির মানুষ কেউ ঘুমাতে পারে না।লোকজন বকাবকি করেছে। তাই রাজু আদুরিকে বকুলতলা বাজারে নিয়ে গিয়ে লোকজনের মধ্যে বলেছিল, ‘এটা, মরে গেলে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো’।
একথা শুনে খাটো সুমন আদুরিকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে বলে, ‘এমন কুকুর থাকার চেয়ে না থাকা ভাল। আমার কুকুর হলে তো আমি বাসের তলে চাপা দিয়ে মারতাম’।
‘ঠিক আছে তুই আমার কুকুরটা মেরে দে’।
‘মারতে পারলে কি খাওয়াবি’?
এক প্যাকেট চানাচুর খাওয়াবো,।
‘কয় টাকা দামের’?
‘দুই টাকার’।
‘না, পাঁচ টাকার প্যাকেট খাওয়াতে হবে’।
‘ঠিক আছে, তাই-ই খাওয়াবো’।
সুমন পাঁচ টাকার এক প্যাকেট চানাচুরের লোভে দুই টাকার বিস্কুট কিনে আদুরিকে আদর করে রাস্তার পাশে ডেকে নেয়। পিরোজপুর-বাগেরহাট মহাসড়ক। মিনিটে মিনিটে গাড়ি চলতে থাকে। সুমন আদুরিকে নিয়ে খেলা করতে করতে একটি বিস্কুট রাস্তার মাঝে ছুড়ে দিল। পশ্চিম দিক থেকে সাই সাই বেগে এটি বাস আসছিল। আদুরি তা খেয়াল না করে বিস্কুটের লোভে রাস্তার মাঝে ঝাঁপ দিল। বাসটি তাকে পিষ্ট করে দিয়ে সমান বেগে পূর্ব দিকে চলে গেল। মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে মাটিতে চলে এলো। আর সুমন তার কৃতিত্বের বড়াই করতে লাগল। রাজুর অন্তরে এতটুকু দুঃখ লাগল না। বরং সুমনকে পাঁচ টাকা দিয়ে চানাচুর কিনে খাওয়ালো।
মায়ের মুখে এসব কথা শুনে আমার খাওয়া থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলাম। যদি কুকুর না হয়ে মানুষ হতো তাহলে এই রাজুই বাসের পিছু ছুটতো বিশহাজার কিংবা আরো বেশি টাকার জন্য। শ্বশুর বাড়ি থাকাকালীন সময়ে এই আদুরিই রাজুর বাড়ি ঘর পাহারা দিয়েছে। না খেয়ে শুয়ে রয়েছে তবু বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায় নি। তার প্রতিদান কি দিল রাজু! মানুষকে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু রাজু আর সুমনের মত মানুষ কি তা…? সামান্য কারণে বা এক প্যাকেট চানাচুরের লোভে একটা জীবন ধ্বংস করতে যাদের বিবেকে বাধে না তারা আসলে কি? ঠিক এমনই অহরহ ঘটছে এ বিশ্বে।