বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে ‘গোমতীর উপাখ্যান’

চয়নিকা সাথী
12169181_1074189255945792_2096435564_o
মফস্বল থেকে কোনো নাট্যদল নাটক নিয়ে ঢাকায় এলে ঢাকার মঞ্চদর্শকরা একটু অনাগ্রহ দেখান নাটকটির ব্যাপারে। এত দিন এর কারণ হিসেবে বিবেচ্য হত, মফস্বলের নাটকের মান ঢাকার নাটকের চেয়ে অন্যরকম। তাছাড়া তাদের মঞ্চ উপস্থাপনের ভঙ্গি ও অভিনয়শৈলীর প্রাজ্ঞতার ব্যাপারটি বিবেচনা করেন দর্শক। তবে আস্তেধীরে এই ধারণার পরিবর্তন হচ্ছে। এর মধ্যে ড. মুকিদ চৌধুরীর মফস্বলের বিভিন্ন মঞ্চনাটকের দল ঢাকার মঞ্চে কয়েকটি নাটক উপস্থান করেছে, যেমন ‘অশোকানন্দ’, ‘অচিন দ্বীপের উপাখ্যান’, রবীন্দ্রনাথের ‘হৌমন্তী’ ইত্যাদি। তিনি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর যে, মফস্বলেও উন্নতমানের নাটক তৈরি হতে পারে। দর্শকও খুব আশাবাদী হয়ে তার নাটকগুলো উপভোগ করেছেন। এবারও তিনি নিয়ে আসছেন ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী’-র (ঢাকার) ‘জাতীয় নাট্যশালা’য় (মূলহলে), আজ ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টায় ‘গোমতীর উপাখ্যান’। নাটকটির পরিবেশনায় থাকছে ‘ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটার’ (কুমিল্লা)। এই পরিবেশনাটি ‘মুভমেন্ট থিয়েটার’ শিল্পধারার প্রত্যাশা পূরণের দাবি রাখে।
কাহিনী ও ‘মুভমেন্ট থিয়েটার’ শিল্পনির্দেশনায় বাংলাদেশেরই সন্তান নাট্যভাস্কর ড. মুকিদ চৌধুরী। নাট্যদলটির পরিচালনায় আছেন ‘ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটার’-এর সাবেক দলনেতা মোজাম্মেল হোসাইন সোহেল। নাটকের কাহিনী তৈরি করা হয়েছে দুটি শ্রেণিকে কেন্দ্র করে, একদিকে রাজপরিবার আর অন্যদিকে প্রজাপরিবার। ‘গোমতীর উপাখ্যান’ ত্রিপুরা (কুমিল্লা) ইতিহাসের এক অলিখিত অধ্যায়। ইতিহাস-আশ্রিত হলেও মুনীর চৌধুরীর সফল নাট্যাখ্যান ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’-এর মতো এ নাটকও ঐতিহাসিক নাটক নয়। বরং উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কিং লীয়ার’-কে ত্রিপুরার মহারাজ ধর্মমাণিক্য চন্দ্রের আসনে বসিয়ে দিলে কেমন হত, কিংবা গ্রামীণ সহজ-সরল প্রেমিক জুটি যারা কিনা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিভাজিত তারা যদি ‘শেষের কবিতা’র অন্তর্দ্বন্দ্বে পড়ে তবে তার পরিণতি কী হবে? এই দ্বিমুখী গল্পকে যদি একসঙ্গে, একমঞ্চে, একটি নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপনা করা হয় তাহলে কেমন দেখাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সহজেই পাওয়া যায় ড. মুকিদ চৌধুরীর ‘গোমতীর উপাখ্যান’-এ।  এই সফল নাটকে রয়েছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, চরিত্রের অন্তর্নিহিত টানাপোড়েন ও বিকাশ, ঘটনার আকস্মিক মোড় পরিবর্তনে বিস্ময়ের উদ্ভাসন, উদাত্ত সংলাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনের শূন্যতা, নিষ্ফল প্রতীক্ষা, অত্যন্ত তীব্র আবেগের সঙ্গে শব্দ নিয়ে খেলা, অত্যন্ত সচেতনভাবে সীমাহীন অপেক্ষা। নাটকটি যখন শুরু হয় তখন শিল্পীরা যেন কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে। নাটকটি যখন শেষ হয় তখনও তারা প্রতীক্ষারত। এই অনিশ্চয়তা, স্থান ও কালের ব্যবধানে, মানুষের অস্তিত্বকে অর্থহীন করে তুলতে চায়, যেন অন্তহীন প্রতীক্ষা। কিন্তু শিল্পীরা নানা ‘মুভমেন্ট থিয়েটার’-এর শিল্পপ্রদর্শনী ও অভিনয়ের মধ্য-দিয়ে, শব্দের সকৌতুক দীপ্র ব্যবহারের মাধ্যমে, সর্বোপরি পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সেতু-বন্ধনে এই অনিশ্চয়তাকে বিলুপ্ত করতে বদ্ধপরিকর। নাট্যভাস্কর ড. মুকিদ চৌধুরী বলেছেন, ‘নাটক মানেই জীবন গাঁথা, একজন মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ; তবে অবশ্যি এর মধ্যে সৌন্দর্যের বিকাশ থাকা চাই, শৈল্পিক হওয়া অবশ্যি আবশ্যক। নন্দনতত্ত্বের বসতি অবশ্যি থাকা চাই।’ বস্তুত ‘গোমতীর উপাখ্যান’-এ সমাজ ও জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া বিবিধ নৈতিক প্রশ্ন ও সংঘাতের এক সং ক্ষুব্ধ উৎসস্থল সৃষ্টি হয়েছে; এতে যেমন আছে নিকৃষ্ট প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র তেমনি পরিবার কেন্দ্রিক ষড়যন্ত্রও বটে। ষড়যন্ত্রের বিষাক্ত পরিবেশ পরিণামে যেমনি রাজকন্যারা নিমজ্জিত, তেমনি সাধারণ মানুষের একরকম অস্তিত্ব সংকটও প্রকাশিত।

12164844_1074189232612461_1322085267_o‘গোমতীর উপাখ্যান’-এ আকর্ষণ ও বিকর্ষণের বলয়ে অণু-পরমাণু যেমনি একে-অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ আর মিলনের খেলায় মেতে ওঠে, তেমনি শিল্পীরাও যেন একে-অপরের প্রতি আকর্ষিত ও বিকর্ষিত হয়ে একমুহূর্তের জন্য হলেও সংঘর্ষ আর মিলনের খেলায় মেতে ওঠে। এ-যেন একমুহূর্তে সুললিত তরঙ্গ তৈরি করে পরমূহূর্তে ভেঙে পড়া অসংখ্য কণা। পঞ্চাঙ্কের সম্মিলিত চিত্রটি ও ‘বাঙালি মুভমেন্ট থিয়েটার’-এর শিল্পধারায় অভিনয়ের মূছনাই সৃষ্টিই হয় পরিপূর্ণভাবে। এ-যেন এক প্রহেলিকা, যার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোর মধ্যে এক সম্ভাব্য সংযোগ ভেঙে ওঠে পরক্ষণেই যেন তা হারিয়ে যায়। এই নাটকের ভাষা ও ব্যাকরণের জন্ম হয়েছে ড. মুকিদ চৌধুরীর নন্দন-সৌন্দর্য-সত্য প্রকাশিত ‘বাঙালি মুভমেন্ট থিয়েটার’-শিল্পধারা ও সৃজনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে, এ-যেন অপরূপ অপূর্ব নন্দনের উদ্ভব। তাই এই নাটকটি জ্যামিতিক ও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মানুষের সৃজনশক্তির এক অন্তহীন খেলায় মেতে ওঠে, যার মধ্যে আছে ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, বহুমুখী ছোঁয়া।
নাটকের গল্প অবশ্যি উত্তেজনাপূর্ণ। পোশাক ও অঙ্গসজ্জা একেবারেই এই সময়ের, সময়োপযোগী। সব মিলিয়ে নাটকটি দর্শকের আশা জাগাবে এই প্রত্যাশা। ‘গোমতীর উপাখ্যান’-এর শিল্পীরা হচ্ছেন সম্পা রানি সিংহ, দিপা রানি দাস, মানসুরা সাথী, ফারহানা আহমদ, রাকিবা জ্যোতি, সোহেল রানা জয়, শাহতাৎ সরকার, মোর্শেদুল হাসান ভূইয়া, মো আসাদুজ্জামান, মো ওমার ফারুক, মো খায়রুল বাশার বাঁধন, মো. আল আমিন, নূর হোসাইন রাজিব, রাশেদ-উল ইসলাম, মাহমুদ-উল ইসলাম, মো তৌহিদ-উল ইসলাম, সোহাগ শান্তনু, ওয়ালি উল্লাহ হৃদয়, রুহুল আমিন, দেলোয়ার হোসেইন, মো আরিফ, আল-আমিন কাজি রিয়ান, রিপন চৌধুরী আপন, আরিফুল ইসলাম মিলন প্রমুখ।