ধূমকেতুতে অ্যালকোহল আর চিনির সন্ধান!

আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডের আর কোথাও কি প্রাণ রয়েছে? এমন প্রশ্ন বহুদিনের। এই প্রশ্নের উত্তর না মিললোও জ্যোতির্বিজ্ঞানীর চিন্তার খোরাক মেটানোর জন্য নতুন তথ্য পাওয়া গেলো। পানি আর অক্সিজেন ছাড়া প্রাণ সৃষ্টির জন্য আর যা যা লাগে, সেই কার্বনের জটিল জৈব যৌগের অণুও পাওয়া গেল মহাকাশে! মিলল ইথাইল অ্যালকোহল আর চিনি। যুগান্তকারী এই আবিষ্কারের খবরটি বেরিয়েছে বিজ্ঞান-জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’এ। এই গবেষণাটি হয়েছে স্পেনের সিয়েরা নেভাদায় ইনস্টিটিউট দ্য রেডিও-অ্যাস্ট্রোনমি মিলিমেট্রিকে’।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, এর পর মহাকাশে প্রোটিন, লিপিড বা, ফ্যাটের সন্ধান মেলাটা খুব একটা কষ্টসাধ্য না-ও হতে পারে। কারণ, একটার পর একটা ইট বসিয়ে যেমন বাড়ি বানানো হয়, তেমনই ইথাইল অ্যালকোহল আর চিনি হল জীবনের মূল উপাদান প্রোটিন, লিপিড বা ফ্যাটে পৌঁছনোর ‘ইট’!

ওই প্রাণ সৃষ্টির ‘ইট’ বা, ‘বিল্ডিং ব্লক’ থেকে কয়েকশো কোটি বছর আগে এই পৃথিবীতেও প্রাণের জন্ম হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা সেই প্রাণ সৃষ্টির দু’টি উপাদান খুঁজে পেয়েছেন পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে চক্কর মারা ধূমকেতু ‘লাভজয়’ এ। নামটাও বেশ চমকদার। ভালবাসা আর আনন্দের সহাবস্থান তো তখনই সম্ভব, যদি সেখানে থাকে প্রাণ! আর, জটিল জৈব যৌগের অণু ছাড়া প্রাণের সৃষ্টি যে কখনওই সম্ভব নয়।

ইথাইল অ্যালকোহল থাকলে কোন সম্ভাবনা জোরদার হয়? ইথেন গ্যাস জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করলে দু’টি জিনিস জন্মায়। ইথাইল অ্যালকোহল আর হাইড্রোজেন গ্যাস। এই ইথাইল অ্যালকোহল বা তার ‘পূর্বপুরুষ’ মিথাইল অ্যালকোহল আসলে একটি জটিল জৈব যৌগ অণুর একেবারে গোড়ার ইউনিট। যার শৃঙ্খল বাড়তে বাড়তে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে প্রোটিন বা লিপিড হয়।

অন্যদিকে চিনির হদিশ মেলায় কেন উৎসাহিত বিজ্ঞানীরা? এই প্রশ্নের উত্তরটা হলো, চিনিও প্রাণ সৃষ্টির মূল উপাদানের ইউনিট। যেমন, শুধু ইট দিয়েই তো আর বাড়ি হয় না। লাগে সিমেন্ট, চুন, বালি, সুরকিও। প্রাণ সৃষ্টির জন্য চিনিও তেমনই একটি উপাদান। চিনি অবশ্য অ্যালকোহল নয়। সেটা অ্যালডিহাইড। চিনি অনেক রকমের হয়। আমরা যে চিনি খাই, সেটা আসলে ‘গ্লাইকোঅ্যালডিহাইড’। যা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ফ্যাট জন্মায়।

গত বছর নভেম্বরে মানবসভ্যতার প্রথম পদার্পণ ঘটেছিল যে ধূমকেতুতে, সেই ‘৬৭পি/শ্যুরিমোভ-গেরাশিমেঙ্কো’ ধূমকেতুতেও মিলেছিল কার্বনের জৈব যৌগের অণু। কিন্তু সেই অণুর চেয়ে অনেক বেশি জটিল ধূমকেতু ‘লাভজয়’-এ হদিশ মেলা জৈব যৌগের অণু। রসায়নশাস্ত্র মানলে, ধূমকেতু ‘লাভজয়’-এ হদিশ মেলা জটিল জৈব যৌগের অণু গঠনকাঠামো ও চরিত্রের দিক দিয়ে অনেক বেশি প্রোটিন ও লিপিডের কাছাকাছি।

ধূমকেতুতে ওই জৈব যৌগের অণুর হদিশ মেলায় লাভটা কী হল আমাদের? মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলেন, আচার-আচরণে ‘পাগলাটে’ হলেও, ধূমকেতু ব্রহ্মাণ্ডের একেবারে শুরুর সময়ের কথা বলে। মানে, আজ থেকে চারশো কোটি বছর আগে ‘বিগ ব্যাং’ থেকে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হওয়ার সময় যে যে মৌল বা যৌগের জন্ম হয়েছিল, তার বেশির ভাগটারই এখনও থেকে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা ধূমকেতুতেই। ‘লাভজয়’ ধূমকেতুতে ইথাইল অ্যালকোহল আর চিনির হদিশ মেলায়, প্রমাণ হল, প্রাণ সৃষ্টির মূল উপাদানের ইউনিটের জন্ম হয়েছিল হয়তো ব্রহ্মান্ড-সৃষ্টির পরপরই!

‘প্রাণ’ তা হলে নতুন কিছু নয়! তা হয়তো অনেক আগে থেকেই ছিল ব্রহ্মাণ্ডে। ‘প্রাণ’ হয়তো এখনও রয়েছে, ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে!