জ্বর-জ্বর ভাব, সর্দি-কাশি, মুড়ি মুড়কির মতো ওযুধ খাবেন না

‘শীতটা আর কবে ঠিক করে পড়বে বলো দিকিনি?’

খুকখুক কাশতে কাশতে সেদিন জিজ্ঞেস করছিলাম সুপর্ণাদিকে। বেচারির কানে তালা পড়েছে। লোকে ভাস্কর চক্কোত্তি নামটা শুনুক না-ই শুনুক, ইতিউতি শুধু ছদ্মঘ্যাম নিয়ে বেড়ায়—‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?’ আউড়ে। তা আমার প্রশ্ন শুনে আর বিরক্তি চেপে রাখতে পারেন না সুপর্ণাদি— “আমি কী করে জানব বাপু, শীতকাল কবে আসবে? জ্বালিয়ে খেলি তোরা সব হাফ-আঁতেলগুলো! তার চেয়ে একটু নিজের শরীরের দিকে তাকা না। ইমিউনো ডেফিশিয়েন্ট জাতি একটা! শীতের তালব্য শ পড়েছে কী পড়েনি ওমনি হেঁচে, কেশে, সর্দি লেগে, হাঁপ উঠে কী হাল! পুরো শীত পড়লে যে কী করবে…! ”

শ্লেষটা মাথা পেতে নিই। সত্যিই তো, শীত পড়েছে কী পড়েনি আমরা সব ধপাধপ সর্দিজ্বরে পড়তে শুরু করে দিয়েছি। সকালে পড়তে বসে খুকখুক, বিকেলে গা-ম্যাজম্যাজের ফলে ব্লাইন্ড ডেট মিস, রাত্রে ফোনে ম্যানেজ কী করব গলার মধ্যে ব্যাঙ ঢুকে বসে আছে! সারা বছর নট আউট থেকে অসাধারণ একটা ইনিংস টেনে গেলাম আর এই শেষবেলায় শীত এসে একের পর এক দুসরায় পুরো নালেঝোলে করে দিলে কী আর মন-মেজাজ ঠিক থাকে! অগত্যা শীত পড়লে ট্র্যাডিশন মেনেই এক ফাইল কাফ সিরাপ আর দু’পাতা ক্যালপল তুলে রাখে বাঙালি। সুপর্ণাদির বাবা আবার ডাক্তার। এ সব দেখে শুনে ‘শীতকালে রোগজ্বালা এবং করণীয়’ শিরোনামে একখানা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করলেন সেদিন। কাশতে কাশতে যতটুকু শুনতে পেলাম একটু তুলে দিই—

২.

শীতকালে এমনিতে রোগজ্বালা হয় কম। তবে ঋতু পরিবর্তনের সময় বৈজ্ঞানিক কারণেই রোগজীবাণুর প্রকোপটা একটু বাড়ে, ফলে ভুগতে হয় আমাদের। এটা অবশ্য শীতের শুরুতে যেমন হতে পারে তেমনই অন্য যেকোনও ঋতুর শুরুতেও হতে পারে। যাই হোক, এই সমস্ত শীত- এলো- তাই- এলাম রোগের মধ্যে সাধারণ সর্দিজ্বর অন্যতম প্রধান। মায়ের ‘রাত্রে একদম ফ্যান চালাবি না’ ইত্যাদি সাবধানবাণী শোনার পরেও এবং মেপে মেপে পালন করার পরেও অনেক গোপালের সর্দিজ্বর হতেই পারে। মূলত শ্বাসতন্ত্রের ওপর ভাগে সংক্রমণ। উপসর্গ হিসেবে উল্লেখ করা যায় সর্দি, কাশি, জ্বর জ্বর ভাব বা হাল্কা জ্বর, মাথা যন্ত্রণা ইত্যাদিকে। তবে গোপাল, রাখাল সবার জন্যই ভরসার কথা এই যে এসব সংক্রমণের মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগই ভাইরাসঘটিত। অর্থাৎ নিজের খেয়ালে হয়, আবার নিজের খেয়ালে সেরেও যায়। এবং মাথা ধরে থাকা, গলা বসে থাকা ইত্যাদির জন্য গোপালের মা বর্ণিত সনাতন পদ্ধতিগুলোই যথেষ্ট; অর্থাৎ জল গরম করে নাকমুখ দিয়ে তার ভাপ নেওয়া, ইষদুষ্ণ জলে অল্প নুন দিয়ে গারগেল (বা কুলি) করা ইত্যাদি। জ্বরভাব বা জ্বর, গা- হাত পা ব্যথার জন্য আজন্মচেনা প্যারাসিটামল তো আছেই। সাধারণত দিন তিনেকের মধ্যেই গোপাল পুরো ফিট হয়ে পড়াশুনো এবং রাখাল গরু চরাতে পারে, তবে তা যদি না হয় তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়াই ভালো। এবং সর্বোপরি একটি সূত্র– মুড়ি মুড়কির মত অ্যান্টিবায়োটিক এবং কাশির সিরাপ কভি নেহি। যেহেতু ভাইরাসঘটিত রোগ তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার থাকে না এবং যদি ধরে নিই পকেটে যথেষ্ট টাকা থাকার ফলে সারা গায়ে চুলকুনি হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কেনাটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, তাও বলার এই পাকামিটুকুর ফলে ভবিষ্যতে সেই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ নাও করতে পারে। আর বেশি তাত্ত্বিক আলোচনা না করে কাশির সিরাপ নিয়ে শুধু এটুকুই বলার, প্রায় সমস্ত কাশির সিরাপগুলিই অবৈজ্ঞানিক এবং শুকনো বা কফ-ওঠা কোনওরকম কাশির ক্ষেত্রেই এর কোনও ভূমিকা নেই।

শীতে হঠাৎ করেই বেড়ে যেতে পারে কিছু রোগের তীব্রতা। যেমন হাঁপানি। তাই হাঁপানির রোগীর এই সময় একটু সাবধানী হওয়া ভালো। ইনহেলার সহ নিয়মিত যে ওষুধপত্র চলে সেগুলোয় খেয়ালি যতিচিহ্ন যেন না পড়ে। কিন্ত কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে। যেমন, শীতে বেড়ে যায় হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা। অনেকের মতে– ঠান্ডায় রক্তবাহের সঙ্কুচিত হয়ে পড়া এর মূলে। একেবারেই ভুল ধারণা, কারণ পরিবেশের উষ্ণতা নেমে গেলেও শরীর তার নিজস্ব পদ্ধতিতে উষ্ণতা ঠিক রাখার ব্যাপারে ভীষন সচেতন। নিজের নিজের আবহাওয়ার ভেতর আমাদের শরীর ঠিক মানিয়ে নেয় পরিবেশের উষ্ণতার তারতম্য কে। অতএব, বয়স্করা ধোঁয়া-ওঠা চা আর নিশ্চিন্তির চাদর মুড়িতে নিজেদের লাব- ডুপ শুনতে শুনতে শীতটা কাটিয়ে দিতেই পারেন। তবে আবারও পুনশ্চঃ সুগার, প্রেশার বা হার্টের রোগীদের নিয়মমাফিক ওষুধে যেন কমা বা সেমিকোলন না পড়ে। কারণ, এসবের থেকে পূর্ণচ্ছেদের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয় কিন্তু।

আর শীত এলেই বাতের ব্যথা বেড়ে যাওয়া? উঁহু, বহু গবেষণা চালিয়েও এ দুইয়ের মধ্যে কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি আপাতত। যদিও বহু মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতায় বলেন যে হাঁটুর ভেতরের যন্ত্রণা দিয়েই তারা প্রথম ‘শীত আসছে’ টের পান। গবেষকরা অবশ্য এর জন্য সরাসরি পারদস্তম্ভের নেমে যাওয়াকে নয়, চিহ্নিত করছেন শীতে আমাদের মজ্জায় আলিস্যি ঢুকে পড়াকেই। যতটা পারা যায় গুটিয়ে থাকা, হাত- পা খেলানো বা দৌড়ঝাঁপ কম এর জন্যই ব্যথা-যন্ত্রণা আরেকটু চেপে বসে শরীরে। তাই আক্ষরিক অর্থেই যাঁরা শরীরে যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে চলেছেন তাদের বলার, শীত পড়লেই বারান্দায় মনোহর আইচের একখানা ছবি টাঙিয়ে ব্যায়ামটা চালিয়ে যান। শরীরে নয়, যন্ত্রণা বয়ে যাবে অন্য খাতে।

শীতকালের বৈশিষ্ট্য কী? উত্তর– শীত পড়া। নার্সারির প্রশ্নোত্তর (যদিও এযুগে রিয়েলিটি ক্যুইজ শো তেও হয়)। কিন্তু মাধ্যমিক লেভেলের আরেকটা উত্তর হ’ল– শুষ্কতা। শীত মানেই বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যাওয়া। আর এসব মিলিয়ে শীত মানেই ঘাম কম, আর তার ফলে শরীরে জলের অভাব সেভাবে অনুভূত হয় না। ফলে তেষ্টাও পায় কম এবং জল কম খাই আমরা। এবার ব্যাপার হ’ল, জল না মেশালে যেমন পৃথিবীর কিছুই চলে না তেমনই শরীরও চলে না। তাই শীতে খুব সচেতনভাবে যেটুকু করার তা হ’ল বেশি করে অবাক জলপান। অবশ্য দ্বারে জাগ্রত ব’লে শীতকে আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছি বটে, কিন্তু কাল নির্বিশেষে পরিমাণ মত জলপান রোগ নিয়ে অনেক জল্পনারই অবসান ঘটাতে পারে।

আর বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যাওয়ার উল্টো পিঠেই অপেক্ষারত শীতকালীন হাজার ক্রিম আর লোশনে বাজার ছেয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, সারা গায়ে খড়ি ফুটে যাওয়াটা অবশ্যই অনভিপ্রেত। একইরকম অনভিপ্রেত মিঠে রোদে ভিক্টোরিয়ার ঝিলের ধারে বসে ঠিক মুহূর্তটিতে আবিষ্কার করা যে ঠোঁট ফেটে চৌচির। অবশেষে যুবক বাঙালি মনের দুঃখে ময়দানে পায়চারি করতে গেলে বুঝতে পারে পায়ে লাগছে– গোড়ালিতেও ফাটল। হরেক ক্রিম বা লোশন তো আছেই, কিন্তু এপ্রসঙ্গে কয়েকজন হল অফ ফেমে ঢুকে যাওয়া অথচ বিস্মৃত খেলোয়াড়কেও স্মরণ করা প্রয়োজন। আমরা অনেকেই আছি যারা আর কোনও কালে মাখি না- মাখি, শীতে বাধ্যতামূলকভাবেই স্নানের আগে সর্ষের তেল মাখতাম এই সেদিনও। কিন্তু তেল মাখা হঠাৎ করে ব্যাকডেটেড হয়ে পড়ল যেদিন (তেল দেওয়া যদিও চিরন্তন এবং এখনও প্রাসঙ্গিক) সেদিন থেকে আমাদেরও বডি অয়েলের সাথে সোহাগ। গ্লিসারিনও আজ সর্ষের তেলের সাথেই প্রায় খরচের খাতায়। যদিও জেল্লা যে ত্বকে থাকে না, থাকে নিজের বাঁচায় সেটা আপাতত সমস্ত ল্যাবরেটরিতেই প্রমানিত তবুও শীতকালে কিন্তু সর্ষের তেল বা গ্লিসারিনকে একটু বাড়তি সম্মান দেখানোই যায়।

‘শীতকালে আরেকটা রোগের কথা ভুলে গেছিলাম। শীত পড়তে না- পড়তেই মানুষ ঝপাঝপ এত বিয়ে করে ফেলে কেন কে জানে! সুখে থাকতে মানুষের অসুখ বাধাবার ইতিহাস অবশ্য কম পুরোনো নয়। আর এ রোগের টোটকাও আপাতত কিছু নেই’– গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বলেন সুপর্ণাদির বাবা। এদিকে কাশতে কাশতে কখন যে মাথা ধরে গেছে আমার কে জানে…

‘আর বলে রাখি, কবিতা কপচানোর সাথে স্নান না করার একেবারেই কোনও সম্পর্ক নেই বাপু। শীতকালে তিনমাস স্নান না করে ঘুমিয়ে থাকার প্ল্যান করলে আমাকে জাস্ট ভুলে যা। রোজ আগাপাশতলা সাবান মাখতে হবে তা তো বলছি না, কিন্তু স্নানটা করিস। দিনের পর দিন স্নান না- করাটাকেও কিন্তু অসুস্থতার ক্যাটেগরিতে ফেলে দেওয়া যায়’– বুঝলাম এখনও বেজায় বিরক্ত হয়ে আছে সুপর্ণাদি, ‘ক্যাবলাকান্ত সব। নিশ্চয়ই মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়? এবার এক সপ্তাহ পড়ে থাক বিছানায় আর করলার ঝোল গেল। কিস্যু হবে না তোদের! শীতের দুপুরে কোথায় বোটানিক্যাল- প্রিন্সেপ ঘাট উড়ে বেড়াবি আর বাড়ি ফিরে একটিবার লেপের ভেতর সেঁধিয়ে মিনিমাম আটঘন্টা নাক ডেকে বেরোবি তা না সব রোগজ্বালার ঠিকুজিকুষ্ঠি নিয়ে পড়েছে আর কীভাবে সামলে থাকবে তার ছলছুতো। অতিসাবধানী ভীতুর ডিম জাতি একটা। তোদের মাথাব্যথা হবে না তো কার হবে?’

শেষটায় এই শ্লেষটাও মাথা পেতেই নিতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় পাশ থেকে সুপর্ণাদির বাবা উদাস গলায় ব’লে উঠলেন ‘আমাদের স্বর্গ নেই সুপর্ণা, ছিলও না কোনওদিন, শুধু স্যারিডন আছে’…