আমার রেকর্ডটা যে কেউ ভেঙে দিতেই পারে, আমার পরম্পরাকে মুছে ফেলা সহজ হবে না

• হ্যাপি নিউ ইয়ার। ২০১৬ সালের প্রথম দিন কীভাবে সেলিব্রেট করলেন?
ইউসেইন বোল্ট: বাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে ডোমিনো গেমস খেলেই সময় কাটিয়ে দিলাম। আসলে আমি যখনই বাড়িতে থাকি, সঙ্গী হিসাবে থাকে বিগ স্ক্রিন টেলিভিশন আর প্লে-স্টেশন। সেগুলো নিয়েই দিব্যি সময় কেটে যায়। ওই সময়ে বন্ধুদেরও ডেকে নিই। একসঙ্গে ডিনার করি। ওদের উপস্থিতিটা আমাকে আনন্দ দেয়। তবে হ্যাঁ, মহিলাদের উপস্থিতিও আমাকে কিন্তু আনন্দ দেয়। বিশেষ করে সুন্দরী মহিলাদের!

•  ২০১৬ সালে অ্যাথলেটিক্স বিশ্বের কাছে আপনার বার্তা কী?
ইউসেইন বোল্ট: (অট্টহাস্য) হাহাহাহাহা…। আমি এখনও দৌড়চ্ছি এবং আমিই সেরা।

• রিও অলিম্পিক্সের প্রস্তুতি কেমন চলছে?
ইউসেইন বোল্ট: কোচ গ্লেন মিল্‌সের পরামর্শ মেনে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করে যাচ্ছি।

• অলিম্পিক্সের কথা মাথায় রেখে বিশেষ কোনও ট্রেনিং করছেন?বোল্ট: না, আলাদা কোনও ট্রেনিং করছি না। মূল বিষয়গুলো একই রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে সাফল্যের মূল সূত্রগুলোকে অবিকৃত রেখেছি। কোচ গ্লেন কোনও সময় আমাকে খারাপ কিছু করার পরামর্শ দেন না। উনি কিন্তু একবারের জন্যও আমাকে এটা বলবেন না যে, যাও বাইরে গিয়ে একটু চিকেন নাগেট্‌স খেয়ে এসো। গ্লেন তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেন না। আমি হয়তো মজা করে বললাম, চিকেন নাগেট্‌স খেতে চললাম। গ্লেনসের নিশ্চিত জবাব হবে, ‘যাও! যা খুশি খেয়ে এসো!’ আসলে কোচও জানে, কড়া অনুশাসনের বৃত্ত তৈরি করলেও আখেরে তা কোনও কাজে আসে না। এটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ব্যাপার।

• এখনও কি আপনি পুরনো ডায়েট মেনেই চলছেন? নাকি সেই তালিকায় সামান্য বদলও এসেছে?
ইউসেইন বোল্ট: আমি স্বাস্থ্যবর্ধক খাবার খাওয়ার চেষ্টা করি। বেশি রাত পর্যন্ত জাগি না। কিন্তু গত চার মাস ধরে কেএফসি’র মুখরোচক খাবার খাইনি, এটা আমাকে যেন তিলে তিলে মেরে ফেলছে! আমি তো মাঝখানে ব্যক্তিগত শেফ’কে ঘুষ দিতে চেয়েছিলাম, যাতে ও আমাকে নিজের পছন্দের পদগুলো একটু খাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু ও তো ঘুষ নিলই না, উল্টে বাড়িতে আমার পিছনে সর্বক্ষণ ছায়ার মতো পাহারা দিয়ে চলেছে! সারাক্ষণ আমাকে যেন তাড়া করে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই ও যা রান্না করে দিচ্ছে, সেগুলোই খেতে হচ্ছে। শুধু কী তাই! আমার মুখের সামনে একগাদা ভিটামিন ট্যাবলেট এবং অন্যান্য ওষুধ সাজিয়ে রেখে দিচ্ছে যাতে আমার তা খেতে কোনও ভুল না হয়। এই মুহূর্তে প্রচুর শাকসবজি এবং‌ ফল খাচ্ছি। কিন্তু এ-ও জানিয়ে রাখি, আমি এই খাবারগুলো দু’চোখে দেখতে পারি না!

• ২৯ বছরের মধ্যেই আপনি সমস্ত ধরনের সাফল্য অর্জন করে ফেলেছেন। আরও এমন কিছু লক্ষ্য কি অধরা রয়ে গিয়েছে, যার স্বপ্ন দেখেন?
ইউসেইন বোল্ট: রিও অলিম্পিক্স থেকে আরও তিনটে সোনা জেতার জন্য নিবিড় প্র্যাক্টিস করছি। পাশাপাশি আমার যে বয়স হচ্ছে সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ! কিন্তু আরও একটা ব্যাপার এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল। প্রতি তিন মাস অন্তর আমি জার্মানিতে এক চিকিৎসকের কাছে গোটা শরীরের ‘মট টেস্ট’ (মোশন ট্র্যাকিং টেস্ট। এতে অ্যাথলিটদের শরীরে বাড়তি কোলেস্টেরল জমা অথবা হৃদ্‌যন্ত্র, রক্তচাপের সমস্যা থাকলে তা ধরা পড়ে) করাই। ওটাতে বোঝা যায়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ, হাত এবং পায়ের পেশির নমনীয়তা কতটা স্বাভাবিক রয়েছে। আমি কিন্তু একবারও ওই ‘মট টেস্টে’ কাউকে হতাশ করিনি। বলতে পারেন, এখন কোচের অনুশাসনে আমার ট্রেনিং আগের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।


বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেও বন্ধু ক্রিস গেইলের লড়াই এবং অধ্যবসায়ের ভক্ত বোল্ট।—টুইটার

• ২০১৫ সালটা কেমন কেটেছে বলে আপনি মনে করেন? গত বছর নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কি খুশি ছিলেন?
ইউসেইন বোল্ট:  হ্যাঁ। ২০১৫ সালে তো আমি ভাল দৌড়েছি। অনেক রকম বিপত্তিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বেজিং বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটে সোনা জিতেছি।

•  গ্যাটলিনের বিরুদ্ধে জয়টা আপনার কাছে কতটা তৃপ্তির ছিল?
ইউসেইন বোল্ট: যে কোনও বড় চ্যাম্পিয়নশিপে জিতলেই আমার খুব আনন্দ হয়। ভক্তরা কী চাইছেন, কে কত সময় নিয়ে দৌড়চ্ছে অথবা ট্র্যাকে কার প্রতি আমার নজর থাকা উচিত, এই ব্যাপারগুলো আমাকে স্পর্শই করে না। সেই তাগিদই অনুভব করিনি। নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে আমি শুধু লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই। এই মুহূর্তে আমার জীবনে একটি শব্দ রয়েছে, তা হল িলগেসি। সেই পরম্পরা মেনে আমি যদি কোনও রেসে অন্যদের চেয়ে পাঁচ মিটার এগিয়ে থাকি এবং আরও দশ মিটার দূরত্ব বাকি থাকে, আমি কিন্তু সেই সময় নিজের দৌড়ের গতি কমিয়ে বুকে চাপড় মারব না। নিজেকে ঠেলব আরও ভাল সময় করে লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য। প্রত্যেক মুহূর্তে এই ভাবনা আমাকে তাড়া করে।

• নিজেকে আরও ভালভাবে মেলে ধরতে আপনার প্রেরণা কী?
ইউসেইন বোল্ট: অন্যতম সেরা অ্যাথলিট হিসাবে মানুষ আমাকে মনে রাখবেন, এটা আমার একান্ত ইচ্ছা। আমি কিন্তু ইতিমধ্যে সর্বকালের সেরা স্প্রিন্টারের স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমি যদি সোনা জয়ের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারি, আমাকে সকলে সর্বকালের সেরা অ্যাথলিট হিসাবে মর্যাদা দেবেন। কোনও একদিন অন্য কোনও অ্যাথলিট হয়তো আমার একটা রেকর্ড ভেঙে দিতেই পারে। কিন্তু বোল্টের পরম্পরাকে হারাতে হলে লড়াই করতে হবে আমার এই গোটা শরীরটার বিরুদ্ধেও। কীভাবে আমি নিজেকে তৈরি করে এই উচ্চতায় উঠেছি, সেটার সঙ্গেও তো লড়াই করতে হবে বাকিদের। তাই আমি যত বেশি জিতব, আমার পরম্পরা আরও বেশি দীর্ঘ হবে। তাকে মুছে ফেলা সহজ হবে না বাকিদের কাছে। প্রত্যেক দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এই ভাবনাই আমাকে আরও ভাল কিছু করার শক্তি দেয়।

• ডোপিং বিতর্কে মুখ ঢেকেছে অ্যাথলেটিক্সের। একদিন ভক্তরা যাঁকে নায়কের আসনে বসিয়েছিলেন, সেই মানুষকেই পরে ডোপ কেলেঙ্কারির শিকার হতে দেখলে আপনি কি যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়ে পড়েন না? মনে মনে প্রচণ্ড আঘাত পান অথবা রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, এই খবরগুলোতে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়ে থাকে?
ইউসেইন বোল্ট: আমাদের অ্যাথলেটিক্স এমন কলঙ্কে আক্রান্ত, তা দেখা যে কোনও সময়েই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু আমি নিজের মধ্যেই নিমগ্ন থাকি। আরও বেশি কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্বকে এই বার্তা দিই , চারপাশে যাই হোক না কেন আমি কিন্তু সততা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছি।

• এমন মুহূর্তও তো এসেছে আপনার জীবনে যেখানে ডোপিং কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত কোনও অ্যাথলিট রয়েছেন আপনার পাশের লেনে! তার সঙ্গে দৌড়তেও হয়েছে আপনাকে। সেই সময়ের অনুভূতিটা কেমন হয়?
ইউসেইন বোল্ট: আমি তো কোনও নিয়ম তৈরি করিনি। তাই আমার পাশে যে-ই দাঁড়াক না কেন, দৌড়তে হবেই।

• এখনও কি সময় বার করে ক্রিকেট মাঠে খেলতে নামেন? কোনও ম্যাচ দেখার সময় কি পান?
ইউসেইন বোল্ট: না। সময় পেলে একটু আধটু ফুটবল খেলি। কিন্তু সেই অর্থে ক্রিকেট খেলা বা দেখা তেমন একটা হয়ে ওঠে না।


সুন্দরী ভক্তদের উপস্থিতি এবং এমন চুম্বন উপভোগ করেন বিশ্বের দ্রুততম মানব।—টুইটার

• ক্রিস গেইলের মতো একজন মানুষ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? বাইশ গজের এত বিনোদন দেন গেইল। সেই মানুষই সম্প্রতি বিগ ব্যাশ লিগে এক মহিলা সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। আপনার কি মনে হয়, কোথাও গিয়ে গেইলকে ভুল বোঝা হচ্ছে?
ইউসেইন বোল্ট: ক্রিস সম্পর্কে আমার কিছু বলার দরকারই পড়ে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি ওকে চিনি। জানি, আজ যাকে দেখে দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন, সেই ক্রিস কতটা কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে এই জায়গায় তুলে এনেছে। ক্রিস গেইল আমার খুব ভাল এক বন্ধু। মনে আছে, একটা চ্যারিটি ম্যাচে আমি ওকে বোল্ড পর্যন্ত করে দিয়েছিলাম! আমার মনে হয়, গেইল এই ঘটনায় মোটেও খুশি হতে পারেনি। বরং আমার মনে হয়, এই ঘটনায় কেউ যদি সবচেয়ে অখুশি, অপ্রস্তুত হয়ে থাকে তার নাম ক্রিস গেইল।

• এত বছর ধরে আপনার এই তারকার মর্যাদা কীভাবে ধরে রেখেছেন? কোনও কোনও সময় কি এমনও মনে হয়নি যে, সেই তারকাসুলভ জনপ্রিয়তা আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যাহত করেছে?
ইউসেইন বোল্ট: এতদিন ধরে যে সাফল্য পেয়েছি, তার মধ্যে থেকে খুঁজে বার করি ইতিবাচক বিষয়গুলোকে। সেগুলোর ওপর বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছি। আজ আমি যে জায়গায় রয়েছি, তার জন্য সম্মানিত এবং নিজেকে ভাগ্যবান বলেই মনে করি। আমার কিন্তু ব্যাপারগুলো খুব মজার বলে মনে হয়। আমি কিন্তু সেই তালিকাভুক্ত মানুষদের মধ্যে পড়ি না, যারা তাদের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ পছন্দ করে না। আমার অন্যতম একটা পছন্দের কাজ হল, সেই সমস্ত মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করা, যাঁরা আমাকে এই কিংবদন্তির স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই তো সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেখা হল মাইকেল জর্ডানের সঙ্গে। সত্যি বলতে, ওঁকে সামনে থেকে দেখে আমি নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আরও চমকে গিয়েছিলাম এটা দেখে যে, ওঁর মতো কিংববদন্তিও জানেন, আমি কে!

• আপনি ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অন্ধ ভক্ত। চলতি ইপিএলে টিমটা কেন প্রত্যাশাপূরণ করতে পারছে না? আপনার কি মনে হয় লুই ফান হাল-কে সরিয়ে পেপ গুয়ার্দিওলা বা জোসে মোরিনহোকে দায়িত্বে আনা উচিত?
ইউসেইন বোল্ট: আমি নিশ্চিত, খুব তাড়াতাড়ি ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড আবার লিগ টেবিলের ওপরে উঠে আসবে।

• চলতি বছরে বিয়ে করার কোনও পরিকল্পনা কি রয়েছে?
ইউসেইন বোল্ট: হাহাহাহাহা…! বন্ধু, এটা আপাতত গোপনই থাক! রিও অলিম্পিক্স থেকে আরও তিনটে সোনা জিততে হবে আমাকে। আপাতত সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। যাবতীয় মনঃসংযোগ করছি সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য। সূত্র : এবেলা