কোরিওগ্রাফি কাজটা উপভোগ করি

যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আলো ঝলমলে দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা কোনটি? তাহলে অবশ্যই সবাই ফ্যাশন শো’র কথা বলবেন। অনেকে সিনেমা, নাটকের কথাও বলতে পারেন। হ্যাঁ আলো ঝলমলে দুনিয়া বলতে ফ্যাশন শো’র র‌্যাম্পে হাঁটাকেই বোঝায়। অনেক আলোর নিচে মডেলরা জমকালো পোশাক পড়ে র‌্যাম্পে হেঁটে যান। আর চারপাশ থেকে ক্যামেরার ফ্লাশ লাইট মুহূর্তে জ্বলে উঠে সব চমকে দেয়। চারপাশ থেকে শোনা যায় করতালি। সত্যিই এ এক রঙিন দুনিয়া। সবাই এর উপরিভাগটাই দেখেন। ভেতরের গল্প কেউ জানেন না। জানতে চাইলেও এর ভেতরের মানুষ ছাড়া জানার কোন উপায়ও নেই। আমরা সেই মডেলিং এর ভেতরের গল্পই বলতে চেষ্টা করছি। র‌্যাম্প মডেল হতে হলে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে একজন মডেলকে আসতে হয়। এজন্য প্রয়োজন অনেক পরিশ্রম, মেধা ও ধৈর্য্য। কথা হয়  তেমন একজন ফ্যাশন জগতের স্বপ্নবাজ তরুন ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার লিটন দাশ লিটু সঙ্গে। চট্টগ্রামের মিডিয়ায়  সকলের কাছে লিটু দা নামে পরিচিত। তিনি জানান একটি শো করতে হলে এর পেছনে কি কি করতে হয়। কিভাবে একজন মডেল ফ্যাশন শো’র মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরেন।  সাক্ষাৎকার  নিয়েছেন : কমল দাশ।

তারুণ্যলোক: আপনি তো দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের  ফ্যাশন অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেন, শুরুর গল্পটা জানতে চাই…
লিটু: আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় মডেলিং দিয়ে। মডেল হতে হলে অবশ্যই গ্রুমিং করে আসতে হয়। ২০০৭ সালের দিকে প্রথমে মডেল ও কোরিওগ্রাফার  সাইফ  আজাদ ভাইয়ের পরিচালিত একটি মডেল গ্রুমিং স্কুলে ভর্তি হই। স্কুলটি ছিল শিশু একাডেমী এলাকায়। তখন আমি সবেমাত্র স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছি। গ্রুমিং স্কুলে অনেক ছেলেমেয়েই একসঙ্গে ছিলাম। তাদের অনেকেই এখন বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। সেই সময় ঢাকায় মডেলিং ছিল খুবই জনপ্রিয়। নোবেল ভাই, মৌ আপা, পল্লব ভাই, ফায়সাল ভাই, তানিয়া আপা, সুইটি আপারা ছিলেন মডেলিংয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। টিনএজ ছেলেমেয়েদের মধ্যে মডেলিং করা তখন ছিল ড্রিম। সেই স্কুল থেকে গ্রুমিং করে পরে একে একে প্রায় ১০ টি শোতে মডেলিং করি।

1তারুণ্যলোক: এরপর ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার হিসেবে কিভাবে কাজ শুরু করলেন?
লিটু: বিভিন্ন কারণেই আমি হঠাৎ এ জগৎ থেকে দূরে সরে যাই। আবার ফিরে আসি ২০০৯ সালে। এসেই আমি ও আমার এক বন্ধু মিলে একটি  মডেলিং স্কুল খুলি , নাম ষ্টার ফেয়ার । সেই স্কুল থেকেই মূলত বিভিন্ন ফ্যাশন শোর আয়োজন করতাম। অনুষ্ঠানে আমি কোরিওগ্রাফির  কাজ করতাম। বেশ কয়েকটি শো আয়োজন করার পর মনে হলো যে, আমি নিজেই কিভাবে একটি ফ্যাশন শো’র কোরিওগ্রাফি করতে পারি আর স্কুল করতে পারি । সেই থেকে শুরু প্রমোট মডেল গ্রুমিং একাডেমী ও একক ফ্যাশন কোরিওগ্রাফির কাজ করা।

তারুণ্যলোক:  বর্তমানের বিভিন্ন ফ্যাশন শো সম্পর্কে কিছু বলেন…
লিটু: আগে শুধুমাত্র ডিজাইনারদের করা পোশাক পরে মডেলরা সেই পোশাকের প্রদর্শনী করতো। একজন মডেল হচ্ছে আসলে হ্যাঙ্গার এর মতো। যেখানে কাপড় ঝোলানো থাকে। এখন ফ্যাশন শো বিভিন্নভাবেই ছড়িয়ে গেছে। অনেকটা বিনোদনের মধ্যে পড়ে গেছে। আগেও বিনোদনের মাধ্যমেই ফ্যাশন শো হতো। থার্টি ফার্স্ট নাইট, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে বিভিন্ন ফার্ম টিকিট বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব অনুষ্ঠান করে থাকে।

তারুণ্যলোক: ফ্যাশন শো তো আমরা স্টেজে দেখি, কিন্তু স্টেজের পেছনের গল্পটা দেখা হয় না। যদি বলতেন…
লিটু:একটি ফ্যাশন শো দর্শকের সামনে হাজির হওয়ার আগে অনেকগুলো ধাপ পার হয়ে আসতে হয়। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো পুরো দায়িত্বটা একজন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে দেয়। সেই ফার্ম এবার কিভাবে শো’টি পরিচালনা করবে তার একটি পরিকল্পনা করে হাউজে জমা দেন। স্পন্সর কারা থাকবেন, কোরিওগ্রাফার কে থাকবেন, কোন কোন ডিজাইনারের ড্রেস থাকবে এগুলো একজন আয়োজকের কাজ। কোরিওগ্রাফারের কাজ হচ্ছে, কোন কোন মডেল র‌্যাম্প কিউ’তে হাঁটবেন, মেক-আপ আর্টিস্ট কে থাকবেন, কি ধরনের মিউজিক শো চলাকালীন ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজবে, মডেলরা হাঁটার মাঝে কে কোথায় দাঁড়াবেন, সেটটা কেমন হবে। এছাড়া অনুষ্ঠানটির থিম কি হবে এগুলোও একজন কোরিওগ্রাফারের কাজের অংশ। রিহার্সেল পর্বও থাকে। আবার শো এর আগে এসে মডেলরা অন স্টেজ রিহার্সেলও করে থাকেন। এরপর নির্ধারিত সময়ে দর্শকরা সেই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। এই হচ্ছে স্টেজের পেছনের গল্প।

তারুণ্যলোক: আপনি এই কোরিওগ্রাফির বাইরে আর কি করেন , আর এই কাজটা কেন বেছে নিলেন…

লিটু:  আমি মূল প্রফেশন হিসেবে নিয়েছি কোরিওগ্রাফিটাকে ।  এখন কোরিওগ্রাফি নিয়েই চিন্তা করছি, চলছি এবং ভাবছি। আমি একসময় চাকরি করতাম। আমি একটু স্বাধীনচেতা টাইপের । চাকরি করলে বিভিন্নভাবে টাইম মেইনটেইন করতে হয়। অনেক জনের কথামত চলতে হয়। কোনো স্বাধীনতা থাকে না। আমি খুব ফিল করতাম যে, আমার এমন একটি কাজ দরকার, যেটি আমার মত করে এবং আমার ইচ্ছে মত করতে পারবো। এরপর আমার মনে হলো যে, কোরিওগ্রাফিটা এমনই একটি  কাজ যেখানে একেবারে নিজের মত করে কাজ করা যায়। আমি আমাকে কিভাবে হাইলাইট করবো, কিভাবে প্রেজেনটেশন দিব, কোন কাজটি করবো, কোন কাজটি করবোনা এখানে আমার পুরো স্বাধীনতা আছে। আর সব চাইতে বড় কথা আমি এই কাজটাকে খুব প্রাণ দিয়েভালোবাসি।

তারুণ্যলোক: ব্যাঙ্গের ছাতার মতো অসংখ্য মডেল বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

লিটু: কিছু অসাধু এবং সুযোগ সন্ধানী লোক মডেলিংয়ে এসে প্রকৃত মডেলদের ক্ষেত্রগুলোকে কলুষিত করছে। এতে নতুন যারা আসছে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।  আবার পুরনো যারা আছেন তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য এই জগৎ কে ব্যবহার করছে।

তারুণ্যলোক: আপনি ওতোপ্রতোভাবে মডেলের সাথে জড়িয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে আপনার সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয় কি?

লিটু: সামাজিক মর্যাদায় কোনো সমস্যা নেই। বরং আমার গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে। মডেলিংয়ে এক সময়ে আমার পরিবার থেকে বাঁধা ছিল। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। মধ্যবিত্ত পরিবার মিডিয়াতে কাজ করাকে ভাল চোখে দেখে না। আগে তাদের অনেক খারাপ ধারনা ছিল। এখন কাছ থেকে দেখে তারা বুঝে যে, মডেলিং আসলে একটি  কাজ। আমার পরিবার, প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব সবাই গর্ববোধ করে যে, আমি মডেলিংয়ে কাজ করি এবং একজন ভালো  কোরিওগ্রাফার . চট্টগ্রামের যারা মডেলিং করতে চাই তারা লিটু চিনে । আমি ২০/২৫ টা শো করেছি ঠিক . ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছি । চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে যত ছেলে-মেয়ে নাম করেছি ৯৫ পাসেণ্ট আমার হাতে তৈরি । আমার থেকে তৈরি হয়ে অন্যরা বাণিজ্যিক শো করতে তাদের নিয়ে যায় ।

2

তারুণ্যলোক: বাংলাদেশে মডেলিংয়ের সম্ভাবনা কেমন?
লিটু:  নতুন মডেলদের আমি কাজ করাতে পারবো। যেমন- কোরিওগ্রাফি, ড্রেস ডিজাইনিং, গুরুমিং, ডিরেকশন প্রভৃতি। এগুলো মডেলিংয়েরই অংশ। তখন আমার সামনে নতুন রা থাকবে। আমি ক্যামেরার পেছনে থেকে নতুনদের নিয়ে কাজ করাতে পারি। আসলে  চাইলে মডেলিং আজীবন চলতে থাকবে। এর কোনো শেষ নেই। মডেলিংয়ের সম্ভাবনা ব্যাপক।

তারুণ্যলোক: নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
লিটু: মডেলিং একটি কাজ- এই চিন্তা নিয়ে মডেলিংয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকটি কাজকে সম্মান দেখাতে হবে। কাজের প্রতি সিরিয়াস হতে হবে।  কাজকে সম্মান দেখাতে না পারলে কাজ তার রিটার্ন  দেবেনা।

তারুণ্যলোক: মডেলিং নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
লিটু: আমি এখন দেশের ভিতরে মডেলিং করছি। আমার দেশের বাইরে মডেলিংয়ে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।  আর এ লক্ষ্যেই আমি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

ছবি: কমল দাশ।