নেই মানা

নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া মানে একটা অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে বেরিয়ে পড়া! তার নেশাই এখন পেয়ে বসছে মহিলাদের। কয়েকজন বন্ধু দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ছেন দিব্যি! আবার ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর দৌলতে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্যই আয়োজন হচ্ছে ট্রিপযজ্ঞের! ‘ওবেলা’ তথ্য দিল এমন কয়েকটি সংস্থার, যারা শুধুমাত্র মহিলাদের জন্যই সফরের ব্যবস্থা করে।

কোলে-কাছে-পিঠে
কয়েকজন কাছের বন্ধু, কিংবা ধরুন ‘বেস্টি’কে নিয়েই দু’জন মেয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন! সমীক্ষা বলছে, নতুন জায়গায় বেড়াতে গেলে সেখানকার সংস্কৃতি, লোকাচার, খাবার, পোশাকের ব্যাপারে জানতে-বুঝতে মেয়েরাই বেশি আগ্রহী হন। বেড়াতে যাওয়াটা এক্ষেত্রে ঠিক ‘একা’র না হলেও আপনি নিজে কিন্তু নিজেরই দায়িত্বে। সেটা একদিকে যেমন সজাগ রাখবে, আবার কোনও ‘ইনহিবিশন’ ছাড়া কয়েকটা দিন বেঁচে নেওয়ার সুযোগও দেবে। চেনাশোনা বলতে আপনার টিম-ট্রাভেলার্স! নতুন বন্ধু হওয়ার সম্ভাবনাটা সুতরাং থাকছেই। আর চেনা গণ্ডির বাইরে গেলে এমনিতেই বন্ধনগুলো কাটানো সহজ হয়। অচেনা পরিবেশ, তার সুন্দর স্বাদ-গন্ধ কয়েকটা দিন উপভোগ করার পসার সুতরাং প্রচুর। সামনেই গরমের ছুটি। ঘুরে আসতে পারেন গোয়া, কেরল, কাশ্মীর কিংবা লাদাখ। ‘লাদাখি উইমেন্‌স ট্রাভেল কোম্পানি’ প্রথম মহিলাদের জন্য ট্রিপ আয়োজন করেছিল, ২০০৯ সালে। তাদের ওয়েবসাইটে রয়েছে চলতি বছরের প্রোগ্রাম। তাছাড়াও প্রচুর উইমেন্‌স ট্রিপ ক্লাব এবং তাদের ওয়েবসাইট রয়েছে বাজারে। অনলাইনে শিডিউলগুলো ঘেঁটে দেখতে পারেন একবার। বেশিরভাগ ট্রিপ শুরু হচ্ছে মে মাসে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভাগে-ভাগে কয়েকটা ট্রিপ করায় সংস্থাগুলো। তবে ঘোরাঘুরির অভ্যেস থাকলে কাছের কয়েকজন বন্ধু মিলে নিজেরাই প্ল্যান করে ফেলতে পারেন বেড়ানোটা! ফেসবুকেও এ রকম অনেক ট্রাভেলার্স পেজ থাকে। সেখানে খোঁজ করলে হয়তো দেখবেন, একটা গ্রুপই বানিয়ে ফেলা গেল!

ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে
যাঁরা নিজেরাই প্ল্যান করবেন ঘুরতে যাওয়ার, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রথমেই ছকে নিতে হবে কোন জায়গা থেকে শুরু করলে গন্তব্যে পৌঁছনোটা সহজ হবে। বিশেষ করে ঘুরতে যাওয়াটা যদি ভিনরাজ্যে বা ভিনদেশে হয়। অনেকেরই বন্ধুবান্ধব বাইরে থাকেন। রি-ইউনিয়ন ট্রিপ প্ল্যান করতে হলে একটা মিটিং পয়েন্ট রাখতেই হবে। যদি কাশ্মীর বা লাদাখ যেতে চান, দিল্লিতে সকলে জড়ো হতে পারেন। কেরলে যেতে চাইলে কোচিন। বাকিটা ফ্লাইটে নাকি হাইওয়েতে সেই সিদ্ধান্তটাও আগেভাগে নিয়ে রাখুন। ট্রাভেল এজেন্সির শরণাপন্ন হলে অবশ্য এগুলো নিয়ে মাথাব্যথা থাকে না। বেশিরভাগ এজেন্সিরই নিজস্ব প্রোগ্রাম রয়েছে মহিলাদের জন্য। প্যাকেজ ট্যুরই। কিন্তু নিজেদের মতো করে সেটাকে সাজিয়ে নিতে পারেন ট্যুরিস্টরা। রোড ট্রিপ চাইলেও বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। ‘ইনক্রেডিব্‌ল ইন্ডিয়া’র একটি শিডিউল রয়েছে, উদয়পুর, জৈসলমের, জয়পুর, আগরা, বারাণসী হয়ে দিল্লি। আরেকটি সংস্থা রয়েছে ‘ওয়াও ক্লাব’। এরা শুধু ভারতে নয়, বিদেশেও মহিলাদের জন্য ট্যুরের ব্যবস্থা করে। জার্মানি, আমেরিকা, চিন কিংবা ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটা স্পেশ্যাল ট্যুর কেমন হতে পারে, এই ফাঁকে দেখে িনন। বেশিরভাগেরই খরচটা টুইন শেয়ারে হিসেব হয়।


‘লাদাখি উইমেন্‌স ট্রাভেল কোম্পানি’র ছবি।
বিকল্পনীয়
অনেকে আছেন, সাধারণত ট্যুরিস্টরা যেখানে ভিড় জমান না— সে সব জায়গায় যেতে আগ্রহী। কাছাকাছির মধ্যে ঘুরতে চাইলে ডুয়ার্স কিংবা দক্ষিণবঙ্গে চলে যান। গরুবাথান, নাগরাকাটা, ইচেগাঁও, শেউলে— অপশন অনেক। মজার ব্যাপার হল, এসব জায়গা যত নির্জন-ট্যুরিস্টহীন— থাকা-খাওয়ার খরচ তত কম। হোম স্টেগুলো খুবই নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন। আর বাড়ির মতোই খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। চাইলে লোকাল ক্যুইজিন রান্না করা শিখতেও পারেন বাড়ির গিন্নির থেকে! যাঁরা ঘুরতে গেলে আক্ষরিক অর্থেই গণ্ডি পেরোতে চান, তাঁদের জন্য তো অপশন আরও বেশি! চলে যেতে পারেন মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ। বা হিমাচল প্রদেশ। কিংবা ভুটান। পাহাড়-সমুদ্রের বাইরে যদি ল্যান্ডস্কেপ কিংবা নদী পছন্দ হয়, আর বন্ধুরা হন ওয়াইনের ভক্ত— নাসিক ঘুরে আসতে পারেন। ‘দ্য ওয়ান্ডার গার্লস’ নামে একটি সংস্থা রয়েছে, এই ট্রিপগুলো আয়োজন করে দেয় তারা। অনেক সময়ই বিদেশ থেকেও মহিলারা উইমেন্‌স ওনলি ট্রিপগুলোয় নাম লেখান। তাঁদের সঙ্গে আলাপ-বন্ধুত্ব হলে চেনাজানার পরিধিটাও বাড়ে।

আহ্লাদে আর্ট
অনেক সময় কিছু কিছু সংস্থা ফোটোগ্রাফি বা কালচার ট্যুরেরও বন্দোবস্ত করে। এক্ষেত্রে দল আবার বেশি ভারী হলে মুশকিল। সকলের রুচি-মনন সমান নয়। ‘ইনক্রেডিব্‌ল ইন্ডিয়া’র এ রকম একটি ট্যুর হয় অস্ট্রেলিয়া এবং নেপালে। দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানেও রয়েছে এই একই ব্যাপার। পুরনো দিল্লির জমাট ইতিহাস, ওল্ড ওয়ার্ল্ড চার্ম, মধ্যপ্রদেশের আদিম জঙ্গল কিংবা রাজস্থানের বালি-রং-আকাশের স্থাপত্য— ফোটোগ্রাফির বিষয় তো বটেই! সাধারণত এই ধরনের ট্রিপে পেশাদার-অ্যামেচার সকলেই যান। আদান-প্রদানে শেখাটাও হয়। আসলে ফোটোগ্রাফি বা লোকাল ক্রাফ্ট শেখার একটা সুযোগই বলা যেতে পারে এই ট্রিপগুলোকে। সঙ্গে একজন বা একাধিক অভিজ্ঞ ট্রেনারও থাকেন। এই স্পেশ্যাল ট্রিপগুলো অবশ্য নিজেরা করাটা মুশকিল। একজন সিধুজ্যাঠা-গোছের কেউ সঙ্গে গেলে তবেই সার্থক! এই ব্যাপারটা অনেকটা বড়দের সামার ক্যাম্প আর কী!

নিরাপদে ঘুরিতং
সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ভারতের মধ্যে কয়েকটা জায়গা মেয়েদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। যদিও ধারণাটা ‘আপেক্ষিক’। তবে সেই তালিকায় রয়েছে নৈনিতাল, আমদাবাদ, পুদুচেরি, শিমলা, শিলং, মাইসুরু, খাজুরাহো, হাম্পি— যেগুলো এমনিতেই শান্তিপূর্ণ। তবে দলবেঁধে গেলে আর একটু সতর্ক থাকলে বিপদ এড়ানো যেতেই পারে। সাধারণত মেয়েরা একসঙ্গে থাকলে একটা নিরাপত্তাবোধ থাকেই। কারও কাছে নিজেকে প্রমাণ করার চাহিদা থাকে না। ইমোশনাল কানেকশনটাও মেয়েরা নিজেদের মধ্যে ভাল তৈরি করে ফেলতে পারেন। তার সঙ্গে যদি আগ্রহগুলোও মিলে যায়, জার্নিটা জমে যাবে না?

 

চেক লিস্ট— (যেগুলো মাথায় রাখবেন)
১। যাঁরা সঙ্গে যাচ্ছেন, তাঁদের পরিচয় আগেভাগে জেনে নেবেন। ফোন নম্বর সঙ্গে রাখবেন প্রত্যেকের। যদি ট্রাভেল এজেন্সি মারফত বন্দোবস্ত হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে নেওয়াটা বাঞ্ছনীয়।

২। পারলে বাকিদের সঙ্গে ফোনে আলাপ-টালাপ সেরে রাখবেন। ফেসবুকেও কথা বলে নিতে পারেন। একেবারে অচেনা গ্রুপের সঙ্গে গেলে সেক্ষেত্রে আগে থেকে সকলের সম্পর্কে কিছুটা করে
জানা থাকা ভাল। আলাপ চালাতে সুবিধে হবে।
৩। লাগেজের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। শুধু নিজের নয়, বাকিদের ব্যাপারেও। পার্সে যেন পরিচয়পত্র সব সময় থাকে। দেশের মধ্যে হোক বা বাইরে। মোবাইলের চার্জারও। বিদেশে গেলে সেখানকার সিম নিয়ে নিন মোবাইলে। খরচ কম পড়বে। পেপার স্প্রে ভুলবেন না। ফার্স্ট এডও।
৪। সব সময় গ্রুপের বাকিদের উপর নির্ভরশীল হতে না হয়, খেয়াল রাখবেন। প্রত্যেকেই নিজেদের দায়িত্বে বেড়াতে বেরিয়েছেন। যদিও অসুবিধেয় পড়লে জানবেন, অন্যেরা আপনার পাশে আছেন।
৫। সব সময় ট্রাভেল এজেন্সির সদস্যের ফোন নম্বর রাখবেন সঙ্গে। কোনও বিপদে পড়লে ওঁদেরকে আগে জানান। সাধারণত ট্যুর এজেন্টরা এলাকার প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনগুলোও জানেন। ওঁদের থেকে লোকাল পুলিশের নম্বরও রেখে দিতে পারেন নিজের কাছে।
৬। দলের সঙ্গে বেরিয়ে একা-একা বেশি এদিক-ওদিক যাবেন না। এতে টিম স্পিরিট নষ্ট হয়। তার মানে অবশ্য এই নয়, যে ২৪ ঘণ্টাই আপনি টিম-সদস্যদের সঙ্গে কাটাবেন।
৭। বিদেশে গেলে সেখানকার কারেন্সির হিসেবটা জেনে রাখুন। যে কোনও ব্যাঙ্কেরই মাল্টি এক্সচেঞ্জ কার্ড হয়। পারলে সেটা নিয়ে রাখতে পারেন। লেনদেনে অতিরিক্ত ব্যয় হবে না।
৮। নিজেরা বেড়াতে গেলে খরচটা শেয়ারে হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে একজন পুরো দায়িত্বটা নিন হিসেব রাখার। না হলে ট্রিপের শেষে ‘গুড উইল’ কিন্তু ফু়ড়ুৎ!
৯। যাওয়ার সময় লাগেজ হালকা রাখবেন। কারণ শপিংয়ের জন্য আলাদা লাগেজের বন্দোবস্ত করতেই হবে। ‘বেস্টি’র লাগেজে নিজের কেনাকাটা পাচার করার চেষ্টা না করাই ভাল!