আদর দিয়েই পারবেন…

রিমঝিম আহমেদ

শৈশব হাতড়ে দেখলে যেমন পেয়ে যাবেন বন্ধুদের সাথে কাটানো দুষ্টু মিষ্টি দিনগুলো তেমনই আপনার বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে কিছু কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাও। যা আপনার আমার পিছু ছাড়েনি, তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এখনো।  মনে হতে পারে এসব না থাকলে জীবনটা আরেকটু সুন্দর হতো, সুখময় হতো। কমবেশি আমাদের সবারই এমন খারাপ অভিজ্ঞতা আছে যা এখনো দগদগে।

শিশুকাল একটা মানুষের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। শিশুর মনো-সামাজিক বিকাশ কতটা ভালোভাবে হয়েছে তা ওই সময়ের পরিচর্যা ও যত্নের উপর নির্ভর করে। কতটা বিকাশউপযোগী পরিবেশে বড় হয়েছে ভালো-মন্দ তার উপরও অনেকটা বর্তায়।

আমি আমার মাকে পেয়েছি সাতবছরের একটু বেশি সময়। কিন্তু সে বয়সের খুব বেশি স্মৃতি মনে না থাকলেও কয়েকটা স্মৃতি ভুলতে পারি না। সেসবের ভেতর সুখ যেমন আছে, আছে পীড়াও। মনে আছে মা আমাকে পাশে বসিয়ে পরম যত্নে মেহেদি গাছ লাগানোরর কথা। শুধু তাই নয় বলছিলেন-কীভাবে যত্ন নিলে এই গাছ ডালপালা ছড়িয়ে সবুজ দেবে। মা মরে যাবার বহুবছর পরও মেহেদি গাছসহ অন্য সব গাছের যত্ন নিয়েছি। গাছগুলোর সাথে অনেক সুখ-দুঃখের গল্প শেয়ার করেছি। গাছ মানুষের মত কথা বলতে পারে না এটাই আফসোস!

বাবা-মা’র মধ্যে একদিন তুমুল ঝগড়া হল। আমার ওইটুকুন বয়সের স্মৃতি ঝগড়ার কারণটা ধরে রাখতে পারেনি। তখন আমি আর ছোট আরো দুই বোনের জন্ম হয়েছে। আমি ও পিটেপিটি আরেক বোনও স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি সবে। আর সবার ছোটt arunnoloak বোনটি আধো আধো কথা বলে। বাবা প্রচণ্ড রাগি। কোনভাবেই আর মা’র সাথে থাকবেন না। চলে যাবেন নিজের গ্রামে। শেষতক চলেই গেলেন, গিয়ে কতদিন ছিলেন ব্যাপারটা অবান্তর।  কিন্তু মা আর দেরি করেননি। আমার চড়ুইপাখি ওজনের একরত্তি শরীরটাকে মাথায় অথবা কাঁধে তুলে মারলেন এক আছাড়।  আর আমার হাঁটু ছিঁড়ে, ঠোঁট ছিঁড়ে, মাথায় জখম হয়ে রক্তারক্তি অবস্থা। সম্ভবত জ্ব্রর এসেছিল খুব। আমি বুঝিনি আমার কী দোষ!  তারপর গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখি আমি মায়ের কোলে আর মা অঝোরে কাঁদছে…

মা মারা গেলেন। আমি এই স্মৃতি ভুলিনি। মায়ের আক্রোশ কেন আমার উপর গিয়ে পড়ল তাও জানতে পারিনি তবে বুঝতে পেরেছি। মা মারা যাবার পর বাবা আগলে রাখতে চেয়েছেন। আমার দরিদ্রবাবা অনেককিছু আমাদের দিতে পারেননি কিন্তু বাবার চণ্ডালের মত রাগ আর সে রাগের বশবর্তী হয়ে চেলা কাঠেরর পিটুনি আর মাথায় তুলে আছাড় মারার অনেক দুঃসহ স্মৃতি আমাকে দিয়ে গেছেন। তাই বলে কি বাবা ভালো বাসেননি?  কিন্তু বাবার ভালবাসাকে ছাপিয়ে দখল করে নিয়েছে সেসব মারের স্মৃতি। মনে পড়ে- তখন আমি সেভেনে পড়ি। আমাদের গ্রামে সবে কয়েকবাড়িতে পল্লীবিদ্যুৎ এসেছে। স্বভাবত ঘরে ঘরে টেলিভিশন হয়নি। আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে মায়ের ছোটবেলার বন্ধু, (তাঁর মেয়ে আবার আমার বন্ধু) ইসলামি খালাম্মার বাড়ি। ওঁদের ঘরে টেলিভিশন আছে। তখন কী কারণে জানি  বাংলা ছবি প্রচার হত বৃহস্পতিবার রাত এগারটায়। আমি থাকতাম দাদীর সাথে আমাদের পুরনো ভিটেয়। হয়তো মায়ের স্মৃতির কারণেই আর সব কাজিনদের সঙ্গের লোভে আমি নতুন ভিটেয় থাকতাম না। সাড়ে নয়টা-দশটার দিকে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন দাদী।  আমি চুপিচুপি দরজা খুলে ভোঁদৌড়। টিভিতে বাংলা ছবি আমাকে টেনে নিয়ে গেল আর সিনেমায় বুঁদ  হয়ে গেছি বলে ভুলেই গেছি আমি পালিয়ে এসেছি। ততক্ষণে আমার তল্লাশিতে লোকজন বের হয়ে গিয়েছে। অবশেষে খুঁজেপেতে নিয়ে যাওয়া হল, আমার বুকে তখন দামামা বাজছে। চাচাতো বোনের ট্রাকড্রাইভার স্বামীর লৌহ নির্মিত হাতে চপেটাঘাত খেয়ে গাল ফুলে ডোল, আমার বইপত্র ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হল। ভাবলাম, হয়তো বাবার মার থেকে অন্তত বেঁচে গেছি। কিন্তু নাহ, ভোরবেলা বাবাকে খবর দেয়া হয়েছিল হয়তো! সেদিন আমার পা ভাঙল বাবার এক আছাড়ে, চেলা কাঠের আঘাতে  পিটের চামড়া দড়ি পাকিয়ে গেল। ডাক্তার ডাকা হল, সুস্থভাবে বেঁচে থাকলাম কিন্তু আমার মনে স্থায়ীভাবে বসত গড়ল যে অসুখ, বাবা কি কোনদিন জেনেছিলেন!

বাবাও মারা গেলেন কৈশোরে। আশ্রয় মামার বাড়ি। মধ্যবিত্ত পরিবার, মধ্যবিত্ত মানসিকতা। এটা করা যাবে না ওটা ছোঁয়া যাবে না। যতসব সংস্কার ও নিয়মের বাড়াবাড়ি। শারীরিক নয় এবার সঙ্গী হল মানসিক পীড়ন।  কেবল মনে হত ঘর ছেড়ে পালাই।  তারা জানতেনই না শাসনের বদলে তারা মূলত নির্যাতনই করছেন। ছোট খালাম্মা ছিলেন আমাদের নির্ভরতা, বটগাছ।  মামি কিংবা নানী কিছু কটাক্ষ করে বললেই সব রাগ আমার উপর এসে পড়ত। ঝাড়ুপিটা খেয়ে খেয়ে মনে হত ঘর ঝাড়ু দেবার জন্য ঝাড়ুর বিকল্প কিছু আবিষ্কার করি। কিন্তু খালাম্মাও কি জেনেছেন আমাদের আশ্রয়, ভালবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি বিপরীত দিকেই হেঁটেছেন! এসব নির্যাতনের ফলাফল কী?  শুধু শরীরের ব্যথা?  না, এই আঘাত যত না শরীরের তারচে অধিক মনের ওপরই প্রভাব ফেলেছে। হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা, আত্মহত্যা প্রবণতাসহ নানাবিধ আত্মবিকাশের অন্তরায় উপসর্গ শিশুমনে প্রভাব ফেলেছে।

আমার জেঠাতো ভাই আলী। গোবেচারা গোছের ছেলে ছিল। মাঝে মাঝে কয়েকটা কাণ্ড ঘটাত যা ও করেছে ভাবাই যেত না। একদিন এমনই কোন কাণ্ড ঘটিয়েছে হয়তো। বড় জেঠিদের উঠোনে ছিল মস্ত এক কাঁঠাল গাছ, শাহজাহান চাচ্চু সে গাছে দড়ি বেঁধে এক্সারসাইজ করতেন। সেই দড়ি দিয়েই আলীকে বাঁধা হল গাছের সাথে। তারপর কী মার!  না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আমি খুব কেঁদেছিলাম সেদিন, আলী তো আহাজারি করছিল প্রাণ বাঁচাতে। প্রাণে বেঁচেছে আলী তবে সেদিন কি সে তার নিষ্ঠুর মায়ের মৃত্যু কামনা করেনি!

আমাদের ছোটবেলায় সব বিদ্যালয়েই বেত রাখা হত। শিক্ষকের হাতে বেত মানে তিনি শিক্ষক এটা একটা সিম্বল।  মার খায়নি এমন কে আছে? মনে পড়ে আমাদের ইংরেজি শিক্ষক জরিফ আলী স্যারের কথা। সর্বক্ষণ ডুবে থাকতেন নিজের চিন্তার ভেতর। পড়া পারা না পারা বিষয় নয় বেঞ্চের শুরুতে যে বসত তাকে বেত্রাঘাত খেতেই হত। একদিন কী এক কারণে আমাদের এক ক্লাসমেট তাহেরকে তুমুল পিটানো শুরু করলেন স্যার। আর থামেন না। স্যার যখন থামলেন তখন আমরা তিরতির করে কাঁপছি সবাই ভয়ে। তাহের’র ইয়্যুনিফরম চুইয়ে রক্ত ভেসে আসছে। ওর বাবা খবর পেয়ে ছুটে এলেন, ছেলেকে হসপিটালে নিয়ে গেলেন।  স্যারের চাকরি যায়নি তবে শুনেছি ক্ষমা চেয়েছেন।

এরকম হাজারো গল্প আছে আমাদের, প্রত্যকের। আমি পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিয়ে কাজ করছি অনেকদিন। সেসব অভিজ্ঞতাও কম বিচিত্র নয়!  মাদ্রাসার শিক্ষকের নির্যাতনের ভয়াবহতা কতরকম হতে পারে সেসব ঘর পালানো, মাদ্রাসা পালানো পথকে আশ্রয় করা শিশুরা বলতে পারে। মা’রা তার শিশুকে ধরে নিয়ে এসে বলতেন, “আফা, শুধু চামড়াটা আর হাড্ডিটা রাখবেন, মেরেধরে মানুষ বানায়া দেন! ” তারা আদতে জানেন না মেরেধরে নির্যাতনের মুখে মানুষ হয় না কোন শিশু। হয় আত্মবিকাশহীন অথবা অপরাধী।

আমরা কথায় কথায় বলি “শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে”। কিন্তু অনেকেই জানি না যে এই কথিত শাসনই আবার নির্যাতনে রূপ নিতে পারে। ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপকালে শিশুদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বাড়িতে তাদের মা-বাবা অথবা অভিভাবকরা শারীরিক শাস্তি দেন কি না?  উত্তরে প্রায় সকলে (৯৭%) জানিয়েছে বাড়িতে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। ৭৪ ভাগ শিশু বলেছে বাসায় মা-বাবা তাদের শারীরিক শাস্তি দেন।

মা-বাবা, বড় ভাইবোন বা বাড়ির অন্যান্য অভিভাবকেরা শাসন থেকে নির্যাতনে রূপ নেয়ার বিষয়টি ধরতে পারেন না। গতানুগতিক ধারণায় শিশুদের ধমক-ধামক আর মারধর না করলে ‘মানুষের মতো মানুষ’ বা জীবনে সফল হয় না। অথচ এ ধারণাটি যে মারাত্মক ভুল তা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। জাতিসংঘ’র শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ১৯ এ পিতামাতা, অভিভাবক ও শিশু পরিচর্যায় নিয়োজিত, অন্যকোন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় শিশুকে আঘাত বা অত্যাচার, অবহেলা বা অমনোযোগী আচরণ, দুর্ব্যবহার বা শোষণ এবং যৌন অত্যাচারসহ সকল শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ আইনানুগ, প্রশাসনিক, সামাজিক এবং শিক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে বলা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুদের কেমন করে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে হবে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে বাবা-মা বা পরিবারের অন্যান্য বড়দের কাছেই এর সমাধান রয়েছে। বাংলাদেশের শিশুরাও এ ব্যাপারে মত দিয়েছে। নিজের মতামতের সাথে নিচের মতামতগুলো মিলিয়ে দেখা যাক!

  • শিশু ভালো আচরণ আশা করে।প্রতিদানে তার আচরণও ভালো হয়।তাই শিশুর ভালো আচরণের প্রশংসা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • মারধর শিশুকে হীনমন্য করে তোলে,ফলে শিশু হারিয়ে ফেলে আত্মবিশ্বাস। তাই শিশুকে মারধর না করে ‘আমি চাই/জানি তুমি এমন কাজ করবে না,’ বলা যেতে পারে।
  • শিশুকে সরাসরি সমালোচনা, বকাবকি, লজ্জা না দেওয়া।বরং তাকে সে কাজের সম্ভাব্য ক্ষতির দিকটি বোঝানো।
  • নিজের ভুল স্বীকার করলে শিশুরাও তাদের ভুল স্বীকার করতে শেখে। নিজের ভুলের জন্য স্যরি বলতেই পারেন।
  • শিশুদের প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। ফলে শেখার আগ্রহ গড়ে ওঠে এবং সে যৌক্তিক আচরণ শেখে।
  • কোন সিদ্ধান্ত শিশুর উপর চাপিয়ে দেয়ার চাইতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া।
  • নৈতিকতা নিয়ে শিশুর সাথে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। উচিত শিশুর নৈতিক কাজের প্রশংসা করা
  • অন্যদের সাথে শিশুর মেলামেশার সুযোগ করে দেয়া। যাতে শিশু সমাজ ও বাস্তবতা বুঝতে শেখে।

সরকার ইতিমধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বাড়িতেও যাতে শিশুরা শাস্তিবিহীন বেড়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে বড়দের সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি শিশুদের শাস্তির হাত থেকে রক্ষা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রয়োজন এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কোন সহজ কাজ নয়!  এজন্য ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি সকলকে স্ব স্ব অবস্থানে ভূমিকা রাখতে হবে।

তার আগে তো আমাদের জানতে হবে শিশু কারা! অনেকেই শিশুর সঠিক বয়স ও সংজ্ঞা জানি না।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, জাতীয় শিশুনীতি ২০১১, জাতীয় শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিশু বলতে ‘১৮ বছরের নিচে সকল মানব সন্তানকে বুঝানো হয়েছে।’

শিশুরা ভালবাসা দাবি করে। এটা তাদের সহজাত এবং মৌলিক চাহিদা। আমরা বড়রাই ভেবে দেখি না কেন, শাস্তি কি আমাদের ‘ভালো মানুষ’ তৈরি করতে পেরেছে? উপরন্তু কিছু বাজে অভিজ্ঞতা আত্মবিকাশে বাধাগ্রস্ত করেছে। আমাদের শিশুরা যাতে সে বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয় সে ভূমিকা আমাদেরই তো পালন করা উচিত। আসুন শিশুদের জন্য একটা ভালবাসার জগৎ তৈরি করি।

তথ্যসূত্র ও নামভূমিকা : ইউনিসেফ ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রচারাভিযানের লিফলেট।