ধূসর দেয়াল

1896804_793546944046379_7550423345240283486_n

মদিনা জাহান রিমি

 

টিউশনি শেষ করে জিনিয়া হেঁটে বাড়ি ফেরে। পথে তার ভার্সিটি। আজ ক্লাস নেই তবু ভার্সিটির নিচে চায়ের দোকানে উঁকি দিলো জিনিয়া। বন্ধু শোভনকে দেখে এগিয়ে গেলো। জিনিয়া এক কাপ চা নিয়ে শোভনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল-

– বন্ধের দিনেও ভার্সিটির সামনে তোর চাঁদ মুখ দেখা যায় কেন?

শোভন সরে গিয়ে জিনিয়াকে পাশে বসার জায়গা করে দিলো। ঠোঁট কিছুটা বাঁকিয়ে বলল-

– সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের দোকানে বসে ঝিমাচ্চি।small_art-Srividya_G_S

জিনিয়া  ওর পাশে বসলো। চায়ের কাঁপে চুমুক দিলো। একটু গম্ভীর মুখে বলল-

– সকালে উঠে ভার্সিটিতে কেন? আজতো ক্লাসও নাই! বাসায় কোন ঝামেলা হয়েছে নাকি?

শোভন ওর কথার গুরুত্ব না দিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে রসিকতা জাতীয় কথাবার্তা চালিয়ে গেলো, শোভন বলল-

– তুই কি জানিস তোর জন্য কতো স্বপ্নিল সকাল এভাবে ব্যর্থ পার করেছি? তুই কি জানিস আমার প্রতিটা নির্ঘুম রাতও ব্যর্থ মনে হয় তোর জন্য?

জিনিয়া হেসে উঠে। শোভন অন্য দিকে তাকিয়ে চুপ করেই বসে থাকলো। সে অদ্ভুত ভঙ্গীতে ঠোঁট বাঁকিয়ে রাখে মাঝে মাঝে। চমৎকার দেখায়। ওর চেহারায়  কিশোর-কিশোর ভাব আছে, ঠোঁট বাঁকিয়ে রাখলে বয়স আরও কয়েক বছর কমে যায় বলে মনে হয়। ও উল্টো দিকে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ, জিনিয়া  বিরক্ত হয়ে বলল-

– কিরে কথা বলিস না কেন?

– কবিগুরু না কে যেন মনে হয় প্রেমিকার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা’।

জিনিয়া  মাথায় হাত চাপড়ে বলল-

– বন্ধু তুই চুপ করেই বসে থাক। আমি তোকে এক বস্তা ধন্যবাদ দিবো তোর কথা বন্ধ করলে।

শোভন হাসে। ব্যগের ভেতর থেকে একটা স্পাইরাল খাতা বেড় করে। জিনিয়ার দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে গেলো, সে গভীর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে-

– শেষ করে ফেলেছিস!

শোভন উত্তর দেয়না। ওর হাসিমুখটা ক্ষণিকের মধ্যে শ্রাবণের আকাশ হয়ে যায়। শ্রাবণের আকাশ মেঘের কারণে যতটুক অন্ধকার হতে পারে এই মুহূর্তে শোভনের মুখের দিকে তাকালে সেই আকাশ আরও অন্ধকার হয়ে যেত। ঐ অন্ধকার এতোটা সাহসী অন্ধকার হতো যে, তিন দিন আকাশ অন্ধকার হয়ে থাকতো, মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে না ঝড়ে, ঐ তীব্র অন্ধকারের সাহস আরও বাড়িয়ে দিতো।

এই গল্পটা লেখার সময় গল্পের একটা জায়গায় প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলেছিল। গল্পের নায়ক একজন ছাত্রনেতা, ছাত্রনেতা তরুণ সমাজকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে যাবার বিপ্লবী বক্তৃতা দিবে, শোভন কিছুতেই সেই বক্তৃতা গুছিয়ে লিখতে পারছিল না। প্রতিটা লাইনে প্যাঁচ লেগে যাচ্ছিল, সেই প্যাঁচ জিনিয়া  পাঁচ মিনিটে খুলে দিয়েছিল। সেদিন শোভন টিউশনির টাকাও পেয়েছে। গল্পের প্যাঁচ খোলার আনন্দে সে এবং জিনিয়া কাচ্চি বিরিয়ানি খেলো, বিরিয়ানির সাথে শোভন বোরহানি, জিনিয়া  পেপসি খেলো। ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে দুজন পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে ফেলল। পান খেয়ে লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁট বাঁকালে শোভনকে কেমন লাগবে জিনিয়ার খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কিন্তু সেদিন শোভন একবারও ঠোঁট বাঁকাল না। ঐদিন সে সর্বক্ষণ দাঁত বেড় করে বিশ্রী ভাবে হাসতে থাকলো।

জিনিয়া আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলল-

– শুন বন্ধু, টাকা কোন সমস্যাই না, দেখবি ঠিক প্রডিউসার পেয়ে যাবি।

বলতে বলতে জিনিয়া  থেমে যায়। কারণ সে জানে শোভন তার মতোই টিউশনি করে ব্যস্ত ঢাকায় টিকে আছে। প্রতি মাসের শেষেই দোকানে বাকীতে চা-সিগারেট খাওয়া শুরু করে। ক্লাসের লাঞ্চ ব্রেকে শুকনো মুখ করে ক্যান্টিনে ঢুকে একটা কিছু কিনতে যেয়েও কেনে না, ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি খেয়ে ক্লাসে ঢুকে পরে। টাকাটা আসলে অনেক বড় সমস্যা। নির্দয়, নিষ্ঠুর জাতীয় সব ধরণের নেতিবাচক শব্দের সাথে নিজেদের সম্পর্ক খুব বেশী জোড়াল করে ফেলছে মানুষ দিনে দিনে। সম্পূর্ণ নতুন একজন তরুণ পরিচালকের সিনেমার জন্য টাকা নিয়ে কেউ বসে আছে এমনটা ভাবাও অপরাধ। এই তরুণ কতটুকু মেধাবী, তার হাতের স্ক্রিপ্টে কি সৃজনশীলতার সৌরভ মিশে আছে? যদি থাকে তাহলে প্রডিউসারের নাক পর্যন্ত এই সৌরভ পৌঁছবে কি করে?

শোভনের HSC পরীক্ষার সময় তার বাবার মৃত্যু হল, রসায়ন পরীক্ষা দিতে যাবার ঠিক দশ মিনিট আগে। পরীক্ষা দিতে যাওয়া হল না সেবার। পরের বছর পরীক্ষা দিলো, বিচিত্র কারণে সে রসায়নেই ফেল করলো। লেখাপড়া বিষাক্ত হয়ে উঠলেও তৃতীয়বার সে পাশ করলো। রেসাল্ট এনে সে মনে মনে আযান দিলো, তার নিজের কাছে মনে হচ্ছিলো সে নতুন করে জন্ম নিয়েছে।

যে সময়টা শোভন পরীক্ষায় পাশ করতে পারছিল না, সময়টা অনেক দীর্ঘ। সময় কাটানোর জন্য বন্ধু বান্ধবকেও পাওয়া যেত না কারণ সবাই বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি হয়ে নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। একদিন স্কুল-কলেজ একসঙ্গে পার করেছে বন্ধু নাইমা কে ফোন করে বলল, ‘কাল একটু আমার সাথে বেড় হতে পারবি? বাসায় থাকতে থাকতে, আর একা-একা রাস্তায় হেঁটে হাঁপিয়ে উঠেছি’। নাইমা জোড়াল গলায় বলল সে আগামী কাল সকালেই তার সাথে বেড় হবে, সারাদিন ঘুরে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে বাড়ি ফিরবে। পরদিন সকালে শোভন ওর ফোনের অপেক্ষা করতে করতে দুপুরের দিকে তাকে নিজেই ফোন করলো, প্রথমবার রিং বাজলো কেউ ধরল না, দ্বিতীয় বার ‘ আপনার Dial-কৃত নাম্বারটি এখন বন্ধ আছে’ শুনে মোবাইলটা পকেটে রেখে রাস্তায় রাস্তায় অনেকক্ষণ এলোমেলো হাঁটল সে। শফিক, রাতুল, পিয়ালদের আড্ডায় মাঝে মাঝে আগে যেত, কিন্তু তাদের ভার্সিটির সুন্দরী মেয়েদের গল্প শুনতে শোভনের ভাললাগতো না। কোন মেয়ে আজ ক্লাসে কার পাশে বসেছে, কার জামার গলা বেশী বড়, কে হাঁটার সময় কোমরটা অস্বাভাবিকভাবে দোলায়, এইসব গল্প নির্বাক হয়ে শোনার থেকে বিছানায় চিত হয়ে সুয়ে ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার আনন্দ হতো। একাকীত্ব কাটানোর জন্য শোভনের একটা বিশেষ দিকে ঝোঁক বেড়ে গেলো, ছবি আঁকার নেশা হয়ে গেলো প্রবল। রংতুলি হাতে শুধু সময় নষ্ট করত তা কিন্তু নয়, অসাধারণ ছবি এঁকে ফেলত। তার আঁকা মেঘলা আকাশের একটা নাগরিক ছবি তাদের ড্রয়িং রুমে বাঁধাই করে টানিয়ে রাখা হয়েছে। শোভনের খালাতো বোন এই ছবি দেখে ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করলো তার একটা ছবি এঁকে দিতে হবে। সে বর্ণনাও করে দিলো কীভাবে আঁকতে হবে- ‘শোভন ভাইয়া, আমার চুল তো ছোট করে কেটে ফেলেছি, তুমি ছবিটা আঁকার সময় বেণি করা লম্বা চুল আঁকবে, এমনিতে আমি কখনো টিপ পরি না কিন্তু ছবিতে বিশাল আকৃতির একটা টিপ বসিয়ে দিবে, রবি ঠাকুরের গল্পের নায়িকা- নায়িকা ফ্রেভার চাই, বুঝলে?’। সে সময়টাতেই একদিন শোভন ভাইকে চমকে দিবে ভেবে ভাইয়ের একটা ছবি এঁকে ভীষণ উদ্দীপনা নিয়ে তার সামনে ছবিটা নিয়ে গেলো। ভাই মহা বিরক্ত হয়ে বলেছিল- ‘রং নষ্ট করে আমার ছবি আঁকার মানে হয়? রং কিনতে তো টাকা লাগে? নাকি দোকানদার তোমাকে ফ্রিতে রংতুলি সাপ্লাই দিয়ে বলে, এই যে স্যার ছবি আঁকেন, পারলে বসে বসে রং গুলিয়ে শরবত বানিয়ে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলুন’। ঐদিনের পর থেকে শোভন তুলি হাতে নেয়নি আর কখনো।

ভার্সিটিতে ভর্তির পর থেকেই শোভনের নতুন নেশা চেপেছে, সে সিনেমা বানাবে। ‘গরীবের ঘোড়া রোগ’ এর মতো অবস্থা। রং নষ্ট করেছে বলে ভাইয়ের একদিনের কঠিন কথায় ছবি আঁকাই ছেড়ে দিয়েছিল, সে স্বপ্ন দেখছে একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র নির্মাণের! এখন তাকে বাহিরের মানুষের কঠিন কথা হজম করতে হতে পারে, সে পারবে?

ব্যাগের ভেতর স্ক্রিপ্টের স্পাইরাল খাতা ঢুকিয়ে ফেলল শোভন। শোভন মলিন মুখে বলল-

– তীব্র কষ্টে মানুষ কাঁদতে পারে না, এমন একটা কথা প্রচলিত আছে না?

জিনিয়া  কিছু বলার আগেই শোভন নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে হূহূ করে কেঁদে উঠলো। ভাগ্যিস এই মুহূর্তে চায়ের দোকানের আশেপাশে পরিচিত কেউ নাই। জিনিয়া  বিব্রত বোধ করছে। কেউ কাঁদলে সে সান্তনা দেয়ার মতো কথাবার্তা বলতে পারে না। উল্টো যে কাঁদছে তার উপর ভীষণ রাগ হয়। জিনিয়া  বলল-

– বোকার মতো কাঁদিস নাতো, ভালো সময় আসবে নিশ্চয়ই। সৃষ্টিকর্তা কাউকে অতৃপ্ত অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে দিবেন না।

জিনিয়া থেমে গেলো, কারণ প্রতিটা মানুষই আসলে অতৃপ্ত অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।

শোভন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, হুট করে ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলো। ওকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। জিনিয়া দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য মনে মনে কিছু একটা গল্প ফাঁদার চেষ্টা করলো। জিনিয়া  হড়বড় করে বলা শুরু করলো-

– জানিস বন্ধু, কাল আমি ভয়ে দাঁত কপাটি লাগা অবস্থা? জানালা খোলা রাখলে তো আমার রুমে চাঁদের আলো আসে, তিনটার দিকে যখন ঘুম ভাঙল তখন আবছা আলোয় দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানালার কাছে পা ঝুলিয়ে আমার বিছানায় বসে আছে। আমি নড়াচড়া করার শক্তিটা পর্যন্ত পাচ্ছি না, আরও ভয় পেলাম কখন জানিস? যখন রীতিমতো রবি দাদু কথা বলতে শুরু করলেন আমার সাথে। রবি দাদু যখন হাসি হাসি মুখে গল্প করতে শুরু করবে আমি চিৎকার দিতে গিয়ে দেখি গলা দিয়ে শব্দ বেড় হচ্ছে না। বুঝ আমার অবস্থা সেইসময়। দাদু কিন্তু বুড়ো বয়সের বেশে আসেন নাই, উনি এসেছেন তার যুবক চেহারা নিয়ে। কি যে সুন্দর দেখাচ্ছিল দোস্ত। পাঞ্জাবীর কালারটা ঠিক মনে করতে পারতেছি না, কিন্তু চাদরটা ছিল সাদা। কি রে তুই আমার গল্প শুনছিস না?

– শুনছি, বলে যা রবি ঠাকুর তোর সাথে কি কি গল্প করলেন?

– দৃশ্যটা ভেবে দেখ কি চমৎকার? একটা কাজ কর না? তোর স্ক্রিপ্টে নায়িকার সাথে এই দৃশ্যটা রাখ।

শোভন মাথা নিচু করে বসে আছে। জিনিয়া  আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে আবার গল্প শুরু করলো-

– তারপর কি হল শোন, আমি মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়ছি, ‘ লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্জোয়ালিমিন’। নিজেকে সামলেছি এটা বুঝিয়ে যে যা দেখছি সব মস্তিষ্ক তৈরি করেছে, এখানে রবি ঠাকুর বসে থাকতে পারেন না। এসব ভাবতে ভাবতে মনে হয় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। অজ্ঞান অবস্থাতেও অনুভব করছিলাম, রবি দাদুর মুখে চাঁদের আলো পরেছে আর উনি আমাকে ক্রমাগত বলেই চলেছেন, ‘তোমায় গান শুনাব জিনিয়া’!

জিনিয়ার গল্পে শোভন হাসার চেষ্টা করেও পারলো না। রিকশা ভার্সিটির সামনে আসতেই শোভন নেমে হনহন করে চায়ের দোকানের আড়ালে ওর বসার জায়গায় চলে গেলো। জিনিয়াও পেছন পেছন গিয়ে ওর পাশে বসলো। জিনিয়া মাথা সামনের দিকে বাড়িয়ে বলল-

– আমি বুঝতে পারছি না আমার এলোমেলো উদ্ভট বন্ধুটা হুট করে গম্ভীর হয়ে কেন বসে আছে?

শোভন তবু চুপ করে বসে রইলো। জিনিয়া চা নিয়ে এলো। ভার্সিটির অন্য বন্ধুরা আসছে গল্প-গুজক করে চলেও যাচ্ছে। শোভন একটা কথাও বলছে না। জিনিয়া  ওর ভাবলেশহীন চেহারা দেখে বুঝতেও পারছে না, এই মুহূর্তে এতো গম্ভীর হয়ে বসে থাকার কি কারণ হতে পারে। শোভন এক দৃষ্টিতে রাস্তার ব্যস্ত মানুষ গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে, কি ভাবছে কে জানে। জিনিয়া  হাসার চেষ্টা করে বলল-

– চল উদ্দেশ্যহীন ভাবে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটি?

হুট করে শোভন, জিনিয়ার দিকে একটা অন্যরকম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বলল-

– তোর হাত ধরে হাঁটব।

জিনিয়া অপ্রস্তুত অবস্থায় বলে ফেলল-

– তোর ধারণা আমি যার তার হাত ধরে হেঁটে বেড়াই?

শোভন তার স্বভাবসুলভ ভাবে ঠোঁটটা বাঁকিয়ে বলল-

– শুন, বারবার আঘাতে পাথরও ভেঙে যায়, কিন্তু আমি জানতাম না পাথরের থেকেও কঠিন কিছু থাকতে পারে। তুই পাথরের থেকেও কঠিন। তুই ভালো করেই জানিস এই মুহূর্তে তোর এতোটা কঠিন হওয়াটা আমাকে কতটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছে!

– কি যুক্তিতে কষ্ট পাচ্ছিস সেটাই তো বুঝলাম না? আজ হাত ধরে হাঁটতে চাইছিস, কাল হয়তো জড়িয়ে ধরে সুয়ে থাকতে চাইবি? তোকে ভালো করে চিনি বলেই তোর সাথে কঠিন করে কথা বলি। তোর সাথে নরম হয়ে কথা বললে তুই বহু আগেই জড়িয়ে ধরে সুয়ে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতি।

– তুই আমাকে তাহলে ভালই চিনে গেছিস? আপাতত আর কঠিন কথা বলিস না, আমি নিতে পারছি না।

শোভন উঠে চলে গেলো। সে যাচ্ছে তার বড় বোনের বাসার দিকে। বোনের কাছে টাকা চাইতে গেলে একটা সুবিদা, সেটা ফেরত দেয়ার দুশ্চিন্তা থাকে না। এভাবে নিতে নিতে কতো টাকা শোভন নিয়ে ফেলেছে তার কোন হিসেব নেই। অথচ ভাইয়ের কাছে টাকা চাওয়া মানেই মোটামুটি একটা শিক্ষা-সফর শেষ করার মতো। শোভন সব সময় চেষ্টা করে কীভাবে ভাইয়ের কাছে টাকা না নিয়ে চলা যায়। তাছাড়া দুলাভাইয়ের ব্যবসা এখন তুঙ্গে। এইতো গতমাসে নতুন গাড়ি কিনে ফেলল। নতুন গাড়িতে মধ্যরাতে এলোমেলো ঘুরে বেড়ানর দাওয়াতে, শোভনের সাথে দুলাভাইয়ের অনেক গল্প হল। সম্প্রতি গাড়ি কিনেছে এমন একজন মানুষের সব ব্যপারেই আনন্দ হবার কথা, শোভন যা বলছে সব কিছুতেই উনি আনন্দ পাচ্ছেন বলে মনে হল। কিন্তু একই মুহূর্তে শোভনের আনন্দিত হবার মতো কিছু অবশিষ্ট নাই। গাড়ির ভেতর নিজেকে কীট-পতঙ্গ বলে মনে হচ্ছিলো ওর। দামী গাড়িতে নিজেকে এতটাই বেমানান লাগছিল যে সে হুট করে দুলাভাইয়ের অনুমতি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলো।

বোন- দুলাভাই দুজনই আজ বাড়িতে আছেন। যদিও দুলাভাই ভীষণ ব্যস্ত মানুষ, আজ অনেকদিন পরে তাকে বাড়িতে দেখা গেলো। শোভন মাঝে মাঝে ভাবে কোথাও চাকরী না পেলে দুলাভাইয়ের এসিস্টেন্ট হয়ে যাবে, ব্যবসায়ীরা তো ভীষণ ব্যস্ত মানুষ তাদের একজন বিশ্বস্ত সাহায্যকারী থাকা দরকার। চলচিত্রের স্ক্রিপ্ট আপাতত আলমারিতেই তোলা থাকুক। দুলাভাইয়ের সামনে বসে থাকতে শোভনের অকারণেই ভীষণ ইতস্থত লাগছে। ওর বারবার মনে হচ্ছে দুলাভাই ওর চোখ দেখেই বুঝে ফেলবে সে বোনের কাছে টাকা চাইতে এসেছে। এই মুহূর্তে উনি মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। এ বাড়ির ড্রয়িং রুমটা চমৎকার সাজানো গুছানো থাকে। শোভনের আঁকা বাঁধাই করা একটা ছবিও দরজার পাশেই রাখা। দুলাভাই পত্রিকা ভাজ করতে করতে বললেন-

– পরের মাসে সিংগাপুরে যাচ্ছি, এবার তোমার আপুকে সঙ্গে নিতে পারছি না বলে মনটা খারাপ।

– যেতে পারছে না বলে আপুরও মন খারাপ নাকি?

– ওর আমার থেকেও বেশী মন খারাপ।

– আসার সময় ওর জন্য এক গাদা গিফট নিয়ে আসলেই মন খারাপ ভুলে যাবে।

শোভনের হুট করে মনে পরল সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, মনে হতেই প্রচণ্ড ক্ষুদাবোধ হল। বিস্ময়ের ব্য্যপার, সঙ্গে সঙ্গে নীলা সন্দেশ এবং চা নিয়ে ঢুকল। শোভন-

– আপু বেশী ক্ষুদা লেগেছে, ভাত খাবো।

– আপাতত চা খেয়ে ফেল, তোর জন্য চিকেন বিরিয়ানি বানাচ্ছি। বেশী সময় লাগবে না।

– আপু তোমার বিরিয়ানি রান্না দেখতে দেখতে চা খাই? রান্না ঘরে একটা চেয়ার দাও।

শোভন খানিকটা অন্য মনস্ক হয়ে নীলার গল্প শুনছে। শোভন যেকোনো মন খারাপ কর্পূরের মতো উড়িয়ে দিতে পারে কিন্তু আজ ওর মন খারাপ ভাবটা যেতে চাইছে না। ওর বারবার মনে হচ্ছে একটা অদৃশ্য হাত সবসময় ওকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখতো, আজ হুট করে সে নিজেই হাত ছেড়ে দিয়েছে। নীলা বলল-

– কিরে কি এতো ভাবছিস?

– কিছু ভাবছি নাতো আপু! বিরিয়ানির সুগন্ধ ক্ষুদা তো বাড়িয়ে দিচ্ছে, আপাতত খাওয়ার কথাই ভাবছি।

– অন্তত আমার চোখ ফাঁকি দেয়া তোর পক্ষে সম্ভব না? কি হয়েছে তোর?

– কিছু না আপু, তুমি কি এখন একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করবে?

– বিরক্ত করছি? মুখ পেঁচার মতো করে বসে আছিস তাই জিজ্ঞেস করলাম।

নীলা চুলার আগুন কমিয়ে দিলো, বিরিয়ানি মনে হয় হওয়ার পথে। নীলা বলল-

– আমার কিছু কেনাকাটা আছে, একা শপিং করতে ভাললাগে না, তোর দুলাভাই সময় পাচ্ছে না, ভাবছি তুই আর আমি চলে গেলে কেমন হয়?

– তাহলেই বুঝেছি তোমার কাহিনী। যা কিছু কিনবে সব তো আমার জন্য। এর আগেও এই কথা বলে তুমি আমাকে নিয়ে গেছো আর নিজের জন্য একটা সুতাও কেন নাই। তোমার বেশী ভালবাসা আমার অত্যাচারের মতো লাগে।

নীলা হাসছে, অট্টহাসি। শোভনও অনেকক্ষণ পর হাসল। নীলা প্লেটে বিরিয়ানি বাড়ছে। পৃথিবীর অল্প কয়েকজন প্রিয় মানুষের মধ্যে নীলা একজন, যে সেই ছোটবেলার মতোই এখনো শোভনকে হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। শোভনের যখন মনে হয় এই বিশাল পৃথিবীতে তার জন্য কেউ নাই তখন সে নীলার কাছে চলে আসে। বোনের মুখটা দেখলে ওর যাবতীয় বিষাদ চলে যায়। নীলার ভালবাসাটা মাঝে মাঝে অস্বস্তিকরও। শোভনের বয়স যে চব্বিশে পরেছে তা নীলার মনে থাকে না, যে কারো সামনেই নীলা এমন ভাবে তার সাথে কথা বলে যেন শোভন এখনো সাত বছরের শিশু। বোনের বাসা থেকে চলে যাবার সময় প্রায়ই দিনে শোভন, নীলার দিকে তাকাতে পারে না, ভীষণ কষ্ট হয় ওর। বোনটা কেন অন্য একটা বাসায় থাকে? নানারকম বাহানা নিয়ে দেখা করতে হয় নিজের বোনটার সাথে। নীলা প্লেট হাতে নিয়ে বলল-

– আয় আমি খাইয়ে দেই।

শোভন এক প্রকার প্লেট কেড়ে নিয়ে বলল-

– ঢং করবা না, আমি নিজেই খাবো।

– তোর বান্ধবী জিনিয়ার না বিয়ে ঠিকঠাক হয়েছে বলেছিলি? কবে বিয়ে, ছেলে কি করে?

– কেমিস্ট্রি নাকি ফিজিক্স, কিসের যেন লেকচারার।

– বাহ ভালো তো।

– যে লেকচারার সে সারক্ষন লেকচার দিবে, জিনিয়া লেকচার পছন্দ করে না। আপু, আমার কিছু টাকা লাগবে, দিতে পারবে?

– অবশ্যই। কতো লাগবে যাবার সময় নিয়ে নিস মনে করে। জিনিয়ার বিয়েতে ওকে সুন্দর একটা গিফট দিতে হবে। মেয়েটাকে আমি ভীষণ পছন্দ করি।

– মেয়েটাকে তো আমিও ভীষণ পছন্দ করি।

বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ হয়তো দেখে না, শোভন প্রতিটা দিন তার কাজলা দিদিকে গভীর মমতা নিয়ে মনে করে। সে তার বাবাকেও তীব্র আবেগে মনে করার চেষ্টা করে। পার্থক্য শুধু বাবার কাছে এটা- সেটা বাহানা নিয়ে দেখা করার কোন উপায় নাই। বাবার মুখটা দিনদিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পিতা- মাতা পৃথিবীর সব থেকে ভালবাসা এবং মমতার জায়গা, তারাই সন্তানদের রেখে চলে যায় না ফেরার দেশে। এই মৃত্যুর নিষ্ঠুরতাটা কতই না সাধারণ একটি নিয়ম! শোভনের মনে আছে বাবার মৃত্যুর সময় নীলা যখন হূহূ করে গগনবিদারী কান্না কেঁদে উঠেছিল বাবা নীলার দিকে তাকিয়ে ছিল, কথা বলার শক্তি তার ছিল না। আদরের কন্যাটির চোখের পানি কীভাবে সহ্য করেছিল সে? মৃত্যুপথযাত্রীর সামনে কাঁদা মানা,এমন একটা আইন থাকলে ভালো হতো। শোভন বলল-

– আপু বিরিয়ানি খুব সুস্বাদু হয়েছে। ঘরে মিষ্টি পান থাকলে নিয়ে এসো, আয়েশ করে পান খেতে হবে।

– পান আছে, তুই আগে খাওয়া শেষ কর। আর একটা চিকেন দেবো?

– অবশ্যই দিবা না, এর মধ্যেই তুমি দুটা দিয়ে ফেলেছ, তুমি দশ হাত দূরে গিয়ে বসে থাকো।

নীলা পাশে বসেই শোভনের আয়েশ করা খাওয়া দেখছে আর টুকিটাকি গল্প অব্যাহত রাখছে। নীলা বলল-

– গতবছর আমার বান্ধবী মৌসুমির বিয়ে হল যে? সেদিন ওর বাসায় যেয়ে দেখি চেহারা খারাপ হয়ে গেছে, জিজ্ঞেস করলাম তোর এই অবস্থা কেন, বলে সারারাত নাকি ওর ঘুম আসে না। দিনেও ঘুমোতে পারে না। ঘুমের ওষুধ খেলে নাকি দু এক ঘণ্টা ঘুম হয়।

– উনার খুব খারাপ ধরণের insomnia হয়েছে। দ্রুত ডাক্তার দেখাতে বল। নাহলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে, তখন ঘুমের ওষুধ খেয়ে যে দু ঘণ্টা ঘুম হচ্ছে সেটাও আর হবে না।

– বলিস কি? কি সাংঘাতিক সমস্যা, একটা মানুষের ঘুম আসবে না কেন।

– এই সমস্যা জিনিয়ারও আছে, ঘুম নিয়ে তার নানা কাহিনী। মাঝরাতে উঠে বসে থাকে, রবীন্দ্রনাথের সাথে গল্প গুজক করে।

– রবীন্দ্রনাথ! ওর কি মাথায় সমস্যা নাকি?

– মাথাতেও খানিকটা সমস্যা আছে বোধহয়।

শোভনের খাওয়া শেষ, নীলা ওর জন্য পান নিয়ে এসেছে। নীলা নিজেও পান মুখে দিয়েছে। নীলা কিছু একটা ভেবে আবার বলতে শুরু করলো-

– তুই যে ‘এসো ছবি আঁকি’ তে কিছুদিন ওদের কর্মশালায় কাজ করলি? তোকে ওরা ভীষণ পছন্দ করেছেন, পার্মানেন্ট পেইন্টিং টিচার হিসেবে নিয়ে নিতে চায়, ওই সম্পর্কে তো আর কিছুই জানালি না?

– এসব কতো আগের কথা! তুমি এখনো ‘এসো ছবি আঁকি’ তে পরে আছ? আমি তো ‘এসো ছবি বানাই’ এ লাফ দিয়েছি।

– মানে?

– মানে আপাতত তোমার না জানলেও চলবে। আসলে আমার ধারণা কখনোই না জানলে চলবে।

– কি আবোলতাবোল বলছিস?

– কিছু না।

পরের দিন চায়ের দোকানের সামনে জিনিয়াকে দেখেও শোভন ভার্সিটির ভেতর চলে গেলো। কোন কথা বলল না। এদিকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি আসবে। জিনিয়া বৃষ্টিতে ভেজার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য মেঘ কেটে রোদ উঠে গেলো। জিনিয়া, শোভনের খোঁজে ভেতরে গেলো। দেখল সিঁড়িতে বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। জিনিয়া পাশে বসে বলল-

– পরিচালক সাহেব আমার হাতটা একটু ধরবেন?

জিনিয়া হাত এগিয়ে দিয়েছে। শোভন বলল-

– সব বিষয় নিয়ে ইয়ার্কি করবি না জিনিয়া। কারো স্বপ্ন নিয়ে ইয়ার্কি চলে না।

– প্রিয় মানুষ সব পারে। স্বপ্ন পুরনে সাহায্য করে, ইয়ার্কি করে। সব, সব করে।

শোভন, জিনিয়ার হাত ধরল। জিনিয়া অন্য হাত দিয়ে শোভনের হাত চেপে ধরল। ক্লাসের টাইম হয়ে গেলে দুজন ক্লাসে চলে গেলো। ক্লাস শেষ করে বেড়িয়ে জিনিয়া মুখে কিছু বলল না। আবার হাত বাড়িয়ে দিলো শোভনের দিকে। শোভন হাতে হাত রেখে মৃদু হেসে বলল-

– আধেক পাগলিটার আজ হয়েছে কি?

– কি আর হবে, চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে।

– ফাইজলামি করার মতো কিছু বলি নাই। আমি সত্যি জানতে চাই এই খেলার মানে কি?

– আমি তোর প্রিয় মানুষ না? আজ রাতে আমরা এক সাথে থাকলে তোর আনন্দ হবে?

শোভন, জিনিয়ার হাত ছেড়ে দিলো, বলল-

– চল তোকে হোস্টেলে দিয়ে আসি।

– এক রাতের আনন্দ নিতে ইচ্ছে করছে তোর সাথে।

– জিনিয়া প্লীজ, তোর অদ্ভুত চিন্তা আমার মাথায় ঢুকানোর চেষ্টা করিস না।

– সত্যি নিয়ে যাবি না তোর সাথে?

– না।

– আমি যে যাবোই। সস্তার কোন হোটেলে চল।

– কেন এসব বলছিস?

– তোর সঙ্গে রাত জেগে নিষিদ্ধ কাব্য রচনা করবো।

– নিষিদ্ধ না, আমি তোর সঙ্গে শুদ্ধ কাব্য রচনা করতে চাই, করবি? বিয়ে করবি আমাকে?

– এই সময় বিয়ে? তোর বাসায় নিশ্চিত তুলকালাম কাণ্ড হয়ে যাবে।

– হোক যা হয়!

 

শ্রাবণ মাসের দুপুর। শোভন সাইকেল নিয়ে বের হয়েছে। ওর চোখে পানি। সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক দূরে হলেও সূর্যের কড়কড়ে রোদে সে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মায়ের পায়ে যে পানি আসছে তা থেকে যাচ্ছে কারণ উনার কিডনির সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার যেসব পরীক্ষা দিয়েছেন সেগুলো করতে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। শোভন ভেবে পাচ্ছে না মাথার উপর ভেঙে পরা আকাশ সে কীভাবে সামলাবে। আপাতত সে ধানমণ্ডির রাস্তার জ্যাম সামলে এলোমেলো সাইকেল চালাচ্ছে। কলিজার ভেতর মায়ের মুখের পাশাপাশি যে আরও একটি ছবি থাকে শোভন যাচ্ছে তার কাছে। সে ধানমণ্ডি লেকে অপেক্ষা করছে।

শোভনের একমাত্র বন্ধু ইসমাইল। টাই পরে কেউ লেকে বসে থাকে না। কিন্তু সে আছে। সবুজ শার্টের উপর তার হলুদ টাই ঝুলে আছে। শোভন বেকার হলেও ইসমাইল একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সায়েন্স পড়ায়। শোভন মায়ের ব্যপার বলছে, তার শরীর কাঁপছে। এর মধ্যে ইসমাইল জিজ্ঞেস করলো-

– তারমানে জিনিয়া এবং তোর বিয়ে আজ বাদ? জানিয়েছিস ওকে? দেখা যাবে কাজী অফিসে তোর জন্য বসে আছে।

– ওকে জানাবার সাহস পাচ্ছি না।

– ও বুদ্ধিমান মেয়ে ও বুঝবে।

– ও বুঝবে তা তো জানি, কিন্তু তুই তো জানিস ওর যে খালার বাড়িতে আশ্রিতা ঐ খালা সর্বক্ষণ ওকে মানসিক অত্যাচার করে বাড়ি থেকে তারাতে চাইছে।

শোভন বিরক্ত চোখে ইসমাইলের টাইয়ের দিকে তাকাল। ইসমাইল বলল-

– কি দেখছিস?

– তোর এই বিশ্রী হলুদ টাইটা আজ পুড়িয়ে ফেলবি।

– তুই আমার প্রেমিকা নাকি যে তোর কথায় আমার সাধের টাই পোড়াবো?

গভীর দুঃসময়ে শোভন হেসে ফেললো। ইসমাইলও হাসতে শুরু করলো। শোভন দ্রুত জিনিয়াকে স্টার কাবাবে চলে আসতে বলল।

জিনিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শান্ত ভাবে বলল-

– তুমি বেকার, ধার করে মায়ের চিকিৎসা শুরু করেছো, সব বুঝতে পারছি, তবু বিয়েটা হোক আজই?

– ভেবে বলছ?

– হুম।

– আমরা এখন যে বাসায় আছি, একটা ঘরে মা এবং আমার ছোট বোন থাকে। অন্য যে পাখির খোপের মতো ঘরে সেটায় আমি এবং ছোট মামা থাকি। ছোট মামার টিউশনির টাকায় সংসারের খাওয়ার খরচ চলে, তাকে তো ঘর থেকে বের করে দিতে পারছি না। তাহলে তোমাকে কোথায় নিয়ে তুলবো এই সমস্যার সমাধান?

– তোমার কোন বন্ধুর বাসায়?

– বন্ধুর বাসায় কতদিন?

– যতদিন পারা যায়?

– আচ্ছা তাহলে তাই হোক।

শোভন বুঝতে পারলো এই মেয়েকে পরিস্থিতি বুঝানো যাবে না। আসলে ওর দোষ নেই। সে নিজেও গভীর দুঃসময়ে আছে। এখন একটা বেলী ফুলের মালাতে ওকে খুশী করা যাবে না, ওকে বিয়ে করে ওর বিপদ থেকে ওকে উদ্ধার করতে হবে। মধ্যবিত্তরা প্রেমের ক্ষেত্রে ভীষণ অসহায়, এদের অসহায়ত্ব দেখে দূরে বসে ঈশ্বরের মনটাও হয়তো খারাপ হয়। হে ঈশ্বর তুমি দয়ার পবিত্র হাত মাথায় রাখো। তা নাহলে বিশেষ কোন উপায়ে তোমার বানী পাঠাও, যারা মধ্যবিত্ত, তাদের জন্য ‘প্রেম’ নিষিদ্ধ।

কাজী অফিসে বিয়ে শেষ করে জিনিয়ার স্থান হল ইসমাইল এবং তার স্ত্রীর ছোট্ট সংসারে। খালার বাসা থেকে মুক্তি পেয়ে জিনিয়া যার পর নাই খুশী। ইসমাইলের স্ত্রী অবনী কে তার পছন্দ হয়েছে। ঝামেলা বিহীন ওদের সংসার দেখে কিছুটা নির্দোষ ঈর্ষা হচ্ছে। অবনী হাসতে হাসতে বলল-

– দুঃখী মেয়েরা দেখতে অসম্ভব সুন্দরী হলেও তাদের চেহারা থাকে মরা মরা। তোমারও একই অবস্থা। তবে থুঁতনির বাম দিকের তিলটা তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। ঐ তিলের সৌন্দর্য তোমাকে এখনো জীবন্ত রেখেছে।

জিনিয়া বুঝতে পারছে না, অবনী তার প্রশংসা করলো নাকি অপমান। অবনী বলল-

– গ্রাজুয়েশন শেষ করে শোভন ভাই বেকার বসে আছেন। সমস্যাটা কি বলেন তো ভাবী?

জিনিয়া এবার নিশ্চিত হল যে অবনী তাকে সূক্ষ্ম অপমান করে যাচ্ছে। অবনী আবার বলল-

– আমার মামনি তো কলেজের অধ্যাপক, তাই স্কুল মাষ্টার ইসমাইলের সঙ্গে আমার বিয়েই দিতে চাইছিলেন না। পরে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দিয়েছেন। তুমি তো তোমার খালার কাছে মানুষ হয়েছ তাই না? আমি শুনেছি যারা ছোটবেলা থেকে দুর্দশার মধ্যে বড় হয় তারা খুব চালাক হয়। তুমি বোকার মতো একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করলে কেন?

– বোকামিটা করে শান্তি পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে এই বোকামিটা না করলেই বোকামি হয়ে যেত।

– এখন এমন মিষ্টি কথা বের হচ্ছে। কিন্তু সংসার শুরু করার জন্য কিছু প্রস্তুতি তো থাকা উচিৎ? অন্তত বসবাস করার মতো ঠাই, বাসর করার মতো ঘর।

জিনিয়া বুঝতে পারছে শোভনের একমাত্র এবং সব থেকে কাছের বন্ধুর স্ত্রী তাকে অপমান করে ভীষণ আনন্দ পাচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে জিনিয়া জানালো সে এই বাসায় আর এক মুহূর্ত থাকবে না। তাকে ওদের বাসায় নিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে সে বারান্দায় পাটি পেতে ঘুমাবে।

জিনিয়াকে নিয়ে বাসার গেট দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝড় শুরু হল বাসায়। বেকার ছেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে বৌ নিয়ে চলে এসেছে! কোন মতে বুঝিয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করা হল। জিনিয়া শোভনের খুপরি ঘরে ঢুকেই টেবিলে দেখতে পেলো সেই ধূলা মাখা স্ক্রিপ্ট এর খাতা। জিনিয়া বলে-

– এটা এখনো আছে!

– চলো আজ দুজন মিলে এটা পুড়ায় ফেলি।

– আছে থাক। স্বপ্ন যা পোড়ার তা এমনিতেই পোড়ে, আগুন জ্বালিয়ে স্বপ্ন পড়ানোর প্রয়োজন হয় না।

জিনিয়া ঘরের জানালাটা খুলে বাহিরে তাকায়। শোভন ওর হাত ধরে আছে।