দীপক ভৌমিকের একগুচ্ছ কবিতা

সকালপোয়াতি ও ইস্টিশন

একটা সকালপোয়াতি, মনের ছানা, কাছে ইস্টিশন।
বনবাদুরেরা সবে ফিরেছে, রোদঝাড় ছড়াচ্ছে ক্ষণ;

রোবটধর্মী কিছু স্মৃতি, সকাল আবেগে ভাসেও বেশ।
সকালপোয়াতির দেশটা মাটিতেই, আকাশে সে রেশ।

কোথাও নেই পরমায়ু, বোঝাই যায় দুপুর গড়ালেই।
মনভালোর তেলেশমাতি তোমার গ্রীবার ও মরালেই।

দূর করেছো সব বয়সসীমা, লাগেনি তাতে দুগ্ধবীমাও
চারমিনিটে সারাজীবন দেখাও, আছে ওতে মুগ্ধসীমাও!!

আচারবিচার নেই তোমার, স্পর্শ ছোঁয়াও মনগিটারে।
স্তব্ধতাবরফ বরাদ্দ রেখেই আমাকে ভরাও সন্ধিতারে।

অন্যবেলা অন্যবিছানা সাজাও তোমার আয়েশ নিয়ে
জল জানেনা তুমি আমার জলকুটুম, জলেই হচ্ছে বিয়ে!!

সকালপোয়াতি মনখারাপে আনন্দ আনে, কুইকথেরাপি।
সকালপোয়তি জাদু জানে, টি-ব্যাগে দেয় লুক’এরঝাঁপি।

 

13100802_10207412586847666_6353010714396511788_n

পাখিকথা

একটা শব্দ করে শখের পাখিটা উড়ে গেলো।
কোনো আলোচনা হতে দিলো না।

পাখিরা বোধহয় এমনই হয়।
জীবনে কখনো রেশন নিতে চায় না।

আরেকটা পাখি পাশে বসে।
হাসিমুখে সব দেখছে।

উড়ে যাওয়া পাখিটার সহ্যের কিনারায়
শহরের যত নাকফুলের সব রূপকথাও
ধোপে টিকছিলো না।

এই পাখিটাও বেশ একহাত নিচ্ছে।
শিষ দিচ্ছে বাঁধ ভাঙার ইচ্ছেতে

দূরে অতীত পাখি ও সামনে বর্তমানজন
দুয়ের মধ্যেই নেশা চেপে বসেছে
অতলান্তিক গভীরতার

যদি রোজ এমন পাখিসভা হোত
খুঁজে নিতাম জীবনের নানান কোণ

শব্দসভা, শিশসভা, গুড়-বাতাসার মতো
খুব মিষ্টি সন্ধ্যে সন্ধ্যে সভা
উপরের দিকে তাকিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ানো
নাকফুল মেয়েবউদের বলতাম,
‘আপনি কিছু দেবেন?’
‘আর কিছু না হোক একটা শব্দ!?’
‘শিশ না হোক ফিসফিসই চলুক,
শব্দে শব্দে দিন না আহুতি? দিন!’

পাখিদের জীবন এতো রঙিন যে
পাখিরাও জানে না
কখন তাদের পরিযায়ী হতে হয়..!!

উড়ে যাওয়া পাখিটা প্যাসিমিস্টিক ছিল
তাই আলোচনার পথে এলোনা..!!
বর্তমানের পাখিটা সুররিয়ালিস্টিক হয়ে
কানের আরাম মনের শান্তি নিয়ে
শিশ-ভজনায় মজে আছে..!!
আলোচনা ভুলে আনন্দের বাজার খুলেছে..!!

 

13083250_10207406577017424_7471686947153633373_n

মেয়েটিকে

যে মেয়েটিকে আমি রোজ দেখি
সে দেবতার ছলে গড়া
যে মেয়েটিকে আমি রোজ দেখিনা
সে মার্ক্সের দ্য ক্যাপিটল দিয়ে গড়া
দু’জনের মধ্যে মিল এসে গেলে
চাঁদ-সুরুজ, যুক্তি-বুদ্ধি-মেধা
চমক দিয়ে উঠে, গমক দেয়
যে মেয়েটিকে আমি দেখতে পাই
সে পার্ল এস বাকেরও মা হয়
যে মেয়েটিকে আমি না দেখি
সে মাক্সিম গোর্কিরও মা হয়

সেই মেয়েটিকে আমি নারী সাহসিকা বলি
সেই মেয়েটিকে আমি হৃদয়ে কোলাহল বলি
এই মেয়েটির প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় সময় সময়
পুঁজিবাদ দীর্ঘজীবী হবার কৌশল নিয়ে নিেেল
এই মেয়েটিরই আবার মুখ রক্তাভ হয়ে উঠে
যখন সমাজ থেকে দূষিত রক্তরা ঝরে যায়

যে মেয়েটি আমার পুনর্বিন্যাস ঘটালো পরতে পরতে
তার দুই রকম রূপ এসে মিলে আমার এক সাঁকোতে

যে মেয়েটিকে আমি রোজ দেখি
কথা বলতে গিয়ে হঠাৎই তার লাইন কেটে যায়
ইথারের আজন্ম ঈর্ষায়, ঠিক তখুনি আমার বুক
ফেটে – স্রোতের নদী বেরিয়ে যায়, এই মেয়েটি বরাবর
কোনো সরোবরে দাঁড়ায় না, যেখানে দাঁড়ায় তার দু’পাশে
আমার মত আর কোনো মাল্যবান বসত গড়েনি কখনো
এই মেয়েটি হাইপেশিয়ার মত একলা জীবন কাটাতে গিয়েও
আমার জীবনে পরম বক্তা হয়ে উঠে ভালোবাসা ও চেতনার
যে মেয়েটিকে আমি দেখিনা রোজ
সেই মেয়েটি আমার স্বপ্নভোজের পাল নাড়ানো এক শাখাচিল
এই দুয়ের আঁচিলে বেড়ে উঠা আমার প্রণয়বলয় রোজ মেহফিলে
ঠুমরির সুরে বেদরদি আলাপ ভুলে এক রহম দিলের খোঁজ দেয়

যে মেয়েটিকে আমি রোজ দেখি এবং দেখছি
ঘরেতে না এসেও সে মনে আসে যায়
যে মেয়েটিকে আমি রোজ দেখিনা ও দেখছিনা
সে আমার শরীরের অর্ধযামিনী কেড়ে নেয়, অর্ধদিনটুকুও
অন্ধকারে আমার চৈতন্যে একই সত্তার এই দুই শাখার লড়াই
পিছনে পায়ে পায়ে হাঁটা সবুজ সারসের নিস্তব্ধতা নিয়ে আসে

একদিন জানা গেল এই দুই মেয়ের
জন্ম হয়েছিল একই দিন এক শরীরে
অথচ কি অবলীলায় বিভক্ত ও এক করেছিলো
আমার জীবনের পহেলা বাতাস ও পয়লা প্রণয় !!

 

এক যে ছিলো কন্যা

এক যে ছিলো কন্যা
এক যে ছিলো তুলারু
এক যে ছিলো কন্যা
এক যে ছিলো দাবাড়ু

কন্যা এখন মেয়ে, মা, নারী ও লাল শাড়ি
ঠিক তার পাশেই দাঁড় করিয়ে রেখেছি দাঁড়ি,
বৈঠা হাতে আর দাঁড়ি সাথে ঝিকোনো মেঘে
কন্যার কোনো ভিটে নেই, আছে তীরের বালি..!!

এক যে ছিলো কন্যা
এক যে ছিলো তুলারু
এক যে ছিলো কন্যা
এক যে ছিলো দাবাড়ু

কন্যার এখন আঠারো মনে পড়ছে
ছেলেটির মাথায় ঘুরছে সেই একুশ
আকাশের ঠিকানায় কন্যারই চিঠি
তার জেরক্স কপি ছেলের মাটির ঘরে
হ্যারিকেনের আলোয়, চারপায়া টেবিল
হয়ে ছেলেটির কাছে যখন ফিরে এলো
কন্যার মানচিত্রে তখন চুয়ান্ন বর্ষসময়
আর ছেলেটির কপালে তেষট্টির মহারণ…
সময়ের মধ্যাকর্ষে জ্বলছে তখন চিতা পোড়ানো জখম..!!

 

তুমি ও এপিটাফ

অচেনা ব্যালকনি তুমি, আত্মহত্যার দুপুর তুমি
লাল শাড়ি তুমি, ফুলশয্যার এপিটাফ তুমি
নতুন কিছু তুমি, পুরাতন কিছু হলেও তোমাকে
নিয়ে সংসার, বেদনার জলভূমি হলেও তুমি
পুতুলে সাজানো ঘর তুমি, অগ্নি-নৈঋতে ঝড় তুমি
বাসনার কৌশিকধ্বনি তুমি, সংসার মানেও তুমি

বহুমাত্রিক তোমাকে নিয়ে আমাদের ত্রিমাত্রিক প্রেম
কবে থেকে মাত্রা গোনা শুরু করলো তাও তুমি
অতিমাত্রিক জ্যোছনা, ভিন্নমাত্রিক শরীরে ঢল তুমি
হাতখোঁপা খুলে আমার বুকে ঝাঁপ দেয়াটাও তুমি

শুধু দুই মাত্রায় যখনই ডাক দাও স্পর্শ খুঁজে ফিরে
দ্বিমাত্রিক আমার শাবল দিয়ে খুঁড়ি তোমাকেই
সেখানেও তুমি করে মন ব্যথা হয়ে আসে আমারই
পায়রা তুমি, খরগোশ তুমি, বাঁচামরাটাও তুমি

তুমি মিললে সকাল হয়ে যায়, লাইটারে জ্বলো তুমিই !!

 

13164356_10207442946366635_3984772579440446295_n

জীবন মানে

জীবনের পুরোটাই রোদ, বৃষ্টি, রাত, নয়তো মেঘ।
কারণে, অকারণে এই প্রাণেও ভর করে সব আবেগ।
জীবন মানে ব্যর্থ সময়, সফল সময়, সময় গুণিতক।
সংসারে সঙ সাজা, নিরব রাজার কাছে করবীনি শখ।
পাল তুলে কেউ চলে যায় নৈনিতালে, কেউবা ত্রিতালে।
দাদরা, কাহারবা, তেওড়ায় ভর করে ভাসছে মৃগালে।

জীবন মানে গ্রাম থেকে ভেসে শহরে আসারই ইতিহাস।
শহর থেকে গ্রামে বাঁচামরা পেশা, ফসকানো স্মৃতিঘাস।
রক্ত-মাংস, ব্যর্থ বাসনা, বেদনার চক্ষু,হামাগুড়ি প্রাণ।
রোজ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা ইচ্ছা, স্বেচ্ছা ও পরিত্রাণ।

জীবন মানে দোষ, জলের পাকে জলের অশান্ত রঙ শীত
পাড়ার পর পাড়া ধরে ডুবে মরা, রাজনৈতিক যত গীত
সেই হাওয়ার অপেক্ষা, নদীর বালিতে ডুবে থাকার ভূমি
জীবন মানে নদীর ডানায় ছুঁয়ে দেখা তোমার মরুভূমি

জীবন মানে স্নেহসবুজ নিরবতা, দীঘিঅলা চোখ, সুখের
কস্তুরীর বাঁকে বাঁকে মাটিরই গুণ, দাবি জোড়া চোখের

জীবনের অপেক্ষায় একজোড়া চোখের দাবি জীবনেই শুনি
জীবন মানে খুন হওয়া নারী রক্তে এই গ্রামে ওই গ্রামে তুমি!

জীবনের পুরোটা মুর্ছা যায়, যখন তোমার কৃষক-রক্ত ঝরে।
কারণে, অকারণে এই প্রাণেও কারা যেন হুট করে ঢুকে পড়ে।

জীবনের পুরোটাই জাগ্রত, তোমার ক্যাডার হয়ে বেঁচে আছি।
জীবনের অনামিকায় কাজল না লাগিয়ে প্রোথিত হয়েই বাঁচি।

 

রাস্তা ও মেঘবিড়ি

ছেঁড়া ছেঁড়া রাস্তা। ছেঁড়া ছেঁড়া মানুষ।
ধোঁকা দেওয়া সব শব্দ। কেড়ে নেয় হুঁশ।
মেঘবিড়ি টানছে আকাশটা। কি বেহুঁশ!
ছেড়ে দেওয়া, কেড়ে নেওয়া, গর্বহীনকুশ
পুড়ছে রোদটাটানো রাস্তায় কাছের রোষ।

একটা অটো। তার ড্রাইভার দিচ্ছেই পুশ,
একটা ঠুমরি গাওয়া মন তার বহুত খুশ।

বৈঠকি বাকোয়াজ জানেনা সে, দিলে তুষ
জ্বালানো গলা নিয়ে গায় সে দারুণ জোশ

‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে, ও ইয়ে দুখ সহা না যায়ে
হায় রাম, পেয়ারি কোয়েলিয়া তিরছি নজরিয়া,
মুঝে বিরহানকো সাতায়ে, ইয়াদ পিয়া কি আয়ে…!!

ছেঁড়া ছেঁড়া পাশটায় ছেঁড়া ছেঁড়া সব মানুষ
বাতাসে ভেসেই চলেছে অটোডিঙানো বেহুঁশ
সেই গলা, সেই সুর ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে-এ-এ-এ..!!

13062508_10207428709250716_3478098471994156432_n
ভর শুধু ভর

ভর কি শুধু ভর..!!
উর্ধ্ব থেকে অধ..
অগ্নি থেকে নৈঋত..
ঈশান থেকে বায়ু..
তোমার পরমায়ু
ভর শুধু ভরইতো
একেলা তৈরি তো?
বিস্তীর্ণ জীবনমদ..
কখনো তার হ্রদ
করছেই সমুদ্রবধ
পথ তার বৈরি তো।

ভর কি শুধুই ভর
ডাকে না স্বপনস্বর ?
আমি মেঘলা আয়ু
নিয়ে জাগাই স্নায়ু,
যখন তোমার বুকে
বোঝো সত্যি সুখে ?

ভর করছি বলে ভর
থেকে আমি হই হৃত
আমি যত বাউলতর
ততটা হই স্বৈরী তো ?

ভর থেকেই ভর করি
তোমার জন্য খুব লড়ি
ঊর্ধ্ব থেকে এ-ই অধ
সরিয়ে দিই সব দুর্মদ

ভর কি শুধুই ভর..!!
অগ্নি হোক কি নৈঋত ?

 

এসো, রিলেট করি

এসো তোমার সাথে নিজেকে রিলেট করি।
এসো, তোমার সাথে সানাই সানাই খেলি।
এসো, সূর্য উঠে গেলে থামতে হবে আমাদের।
এসো, রক্ত ঝরার আগে আন্দোলনে জড়াই।
আর কিছু বলার আগে চলো আকাশকে দেখি,
পায়রার উড়াউড়ি দেখি, নিজেদেরকে দেখি।
এসো আজ, আহ্বানের টেম্পো উঠে গেছে, এসো।

এসো, শোনো, সময় এর কয়টা দোলনা আছে?
আমাদের মত দোলে? এসো, সময়কেই দোলাই।
এসো, রিলেশনে সঙ্কট এলে ফের রিলেট করবো।

এসো, আমরা আমাদেরকে রিলেট করে ফেলি।
এসো, আমরা ভোকাল কর্ডটা একসাথেই ধরি।
শরীর নিবন্ধনের আগে এসো মন নিবন্ধন করি।
এসো, খুব কাছে থেকে দেখছি ‘কা করো সজনি’-র
‘কা করো’-টা বারবার বাজছে, সংকোচ ধুয়ে নিই।

এসো, শোনো, চালাকির জ্বালা আছে, আমাদের নেই !!

তুমি ও বোধ

তুমি ও আমার বাউন্ডুলে মন,
এক আকাশের ভিন্ন দুই বোন।

তুমি ও আমার ভীষণ রকম
বোধ, জীবনের শীতল জখম।

তুমি এই শহর জুড়ে হাঁটো ঠিক,
পার্থিব অনল তখন তুচ্ছ লিরিক
হাঁটা ভোর, আর আমি চিত্রচোর।

তুমি ও আমার শীতল সময়শখ,
এক বেলাকার ভিন্ন দুই শাদাবক।

তুমি পথে নামো যখন কেউ নেই
দুই আকাশে এক যোগ হয়ে সেই
আমার তোড়জোড়, মায়াঘোর।

তুমি ও আমার বাউন্ডুলে মন,
এক আকাশে দুই পৃথিবীর ক্ষণ।

তুমি ও আমার মানচিত্র বাধা
আকাশের ঠিকানায় আধাআধা !!

 

কবি ও অন্ধের চশমা

একদিন কেউ বলেছিলো, শুধু কবিদের প্রজাপতি কেন উড়ে ?!
কবি উত্তর ভুলে চেয়েছিলো চুপচাপ, তুরিয়ানন্দে মাথা ঘুরে !!
প্রশ্ন উঠলো কবিদের হিমবাহ, অতল অন্তর, আগুন জ্বালা কি রে ?
সেই মাথা সোজা হলো, দক্ষের সাধ্য ছিলনা তাকে নিয়ে সে ফিরে।
ফিসফিস করে উঠলো শব্দপ্রবাহ, এ কান থেকে ও কান, মুদি দোকান।
অন্ত্যমিল কেনো রে? জীবনে কি কখনো হয়নি প্রেমের অমিল মোকাম ?

বলেছিলো, প্রশ্ন উঠলো, ফিসফিস করে উঠলো যত ডিমপারানি প্যাঁচাল
মানুষ এক চাল দেয় তো, কবি দেয় সাত চাল, একটুও বাধেনা ক্যাচাল !!

কথায় কথার তাপক্রিয়া, বাতক্রিয়া, ধূসর উদাস কবি সাহসেও দ-বৎ
যুদ্ধ দেখা কবি, সন্ধি-বিচ্ছেদ দেখা, আদি-আস্তি-নাস্তি সবই কি জন্মসৎ ?!

থেকেছিলো গোলাপের বর্ণনা, পাশবিক-পাহাড়ি কল-কব্জা নাড়ানো কথা
কবি একা হেসেছিলো, গলা ঝেড়ে কেশেছিলো, মনময়তাকে ছুঁয়ে অযথা।

ছিলো আশ্রয়ের গল্প, পোতাশ্রয়ের শূন্যতা, ট্রায়াঙ্গল নিয়ে গা হিড় হিড়ানো
আউলা যুক্তি, একজন বুড়ো লোক ও সাগরের গল্প, হেমিংওয়েতে ভিড়ানো।

ছিলো নিরাশ্রয়, পাল না তোলা, ভাবুক বাহনে চড়ে বসা কবির নভোযান
পসরা ছড়ানো ফানুস তাড়ানো, অজলোকেদের চওড়া দাপট আর অপমান।

একশ বছর পরে একদিন সেই দৃশ্য তুলে ধরা হলো লোকমহল্লায় ও আসরে
ওই কবির বুকটা ফুটে উঠছিলো শাদা কাশ আর সর্ষেফুলের রসাল বাসরে।

সময়ের ঔরশে কবির জনম হয়, চিন্তা দৃষ্টি বোধ বেড়ে উঠে খুব লীলায়নে
কড়া পাকের সন্দেশের মতো কবি বিস্তৃত হয় জন্ম-মৃত্যুর রহস্যর শিলায়নে।

একসময় উপরের দিকে চোখ ফেললো কবি। দ্যাখে, অনেকগুলো কচুরিফুল
তার দিকে সিঁদুরের মতো ঠোঁটেলা হয়ে আছে, দিচ্ছে ভাষার আশ, মজুরিদুল।

কবিরা নারদ, পারদ চড়াতে পারে, সময় অসময় লা প্লাতায় ছুটে যায় চলে
মানুষের সিন্দুকে কবিদের বুনট অন্ধের চশমায় আলো, শেকল ছাড়ার দলে।।

 

প্রতীক্ষা ও মায়া

প্রতীক্ষা, অবসর আর সংসারের পদ্য-প্রবন্ধ
তোমার কাঁধে ব্যাগ, ঝলমলে টি-শার্ট সব
পাতাপুষ্প, দুপুর, বৃক্ষ, বুনো পাখির মতো
শহরের পথে এক সফেন আড্ডা, শিল্পের দাবি
করা রক্ত, যুদ্ধময় সংকল্প, পল্লবিত যত শ্লোক
তোমার অন্তর্ধানের বিকল্প নয়, তুমি অন্ধের
মতো করে চোখ মুদে থাকলেও ছবিটা ভেেেস
উঠে, ডাক দিয়ে বলে, এই পরকীয়াময় মানুষ
জীবনে খুব বেশি পর হতে নেই, পর হওয়ার
সাঁকো পার হওয়া যায়না, ফুলসেরাতেও নয় !!
০২.

আশ্চর্য মায়ার ভেতর দিয়ে যারা চলে ফেরে
তাদের জীবন কি সমগ্র জীবন? ঝড়ের পরও
ঝড় এসে বালি ছড়িয়ে যায় চোখে, মুখে, সুখে
তখনও বৃক্ষতলে এক দেহ জাতীয় চলচ্চিত্রের
মতো নগর পিতার রূপ নেয়, মায়া কেটে গেলে
গদ্যের খুঁটি এসে সার বেধে দাঁড়ায় কর্মীর মতো
নীলাভ এক নারীর আস্তানায় তার খবর পৌঁছায়
অনেক আগেই নীলকণ্ঠ হওয়া এক মানুষ তারই
অপেক্ষায় ছিলো গোটা জীবন, তার সময়বীজই
হাজার চিন্তার মধ্যে কেশর নাড়িয়ে ছুটে চলেছে
স্থির আর অস্থির এই দুই বিভ্রমের মধ্যে দিয়ে সে
ছায়া দিয়ে অজানা আবেগের স্মৃতিই রেখে যায়
পাহাড়চূড়ায়; যেখান থেকে ফিরে আসাটা কঠিন।

 

তোমার এপিটাফ

কি সুন্দর তোমার ছবি। কি সুন্দর তোমার পোট্রেট !!
তোমার সামনে এপিটাফ, প্রার্থনার শব্দ সারি সারি।

আর পিছনে আমি দাঁড়িয়ে। তোমার সাথে হৃদয়সংযোগ করছি।
কি সুন্দর তোমার চাউনি। অথচ মনকে ফাঁসিতে ঝোলাচ্ছো !!

তোমার ধুলোভর্তি কফিনে মাকড়শার জালের মত আঙুলবাচ্চা
এই বার্তা দিচ্ছে, ভালোবাসার আঠায় একটা স্বদেশী টান আছে।

তোমার ছবিটা গ্রামবাসীরা নিয়ে গেছে, আর পোট্রেটটা দিয়েছে
ধুলিমোড়া দেখে, আসলে বোঝেইনি নাড়া দিলেই বেরিয়ে আসবে
তোমার মেমোরিয়াল, বরের চেয়েও যার চোখে বেশি জল আসে।

কি সুন্দর তোমার ছবিউপন্যাস। একটা আজীবনের মেঘ ছাওয়া।
তোমার সামনে আমার মমি, সংযোগ পিয়াসী ভাবটা এখনো আছে !!

 

কিছু নারী

কিছু মোহিনী দৃষ্টি বাজপাখির মত আমার কাছে এসে ঝাপটাক..
কিছু কোজাগরী, মাঘী, বৈসাবি এসে দিয়ে উঠুক চড়া হাঁকডাক
কিছু নারী সঙ্গিনীর মতো, বন্ধুর মতো এসে গোল হয়ে সার বাধুক
কিছু প্রজাপতি টুকরো বেদানার মতো মিষ্টি মিষ্টি ডানাগুলো দুলুক !!

কিছু মা, কিছু স্ত্রী, কিছু প্রেমিকা, কিছু সেক্স ওয়ার্কার তাদের গল্প বলুক,
কিছু পতিত, কিছু লম্পট, কিছু লুচ্চা, কিছু রোমিও তাদের ফোবিয়াতে
ডরপুক হয়ে হাঁটুক, নেতানো ফিতের মতো, কলমের মুখে লাল কালি না
নীল কালি বেরোবে সেটা কেউ ঠিক না করুক, কে বেশ্যা আর কে নয়
সেই সাহসী নিয়ম ভাঙা সত্যিটা বেরিয়ে আসুক, ঠিক এই সময় কিছু-ওও
রঙিন চোখ স্বপ্নলালা ঢেলে দিক, উষ্ণতা বইয়ে দিক চারপাশে, শব্দাভাসে

কিছু তরল বেরোক না নারী কিংবা পুরুষের শরীর থেকে, সময় নির্মাণ
করুক তার স্বাচ্ছন্দ্যের সততা, কিছু উগ্রপন্থি চিহ্নিত হোক, তারপর শব
থেকে হবে নতুন শরীরের শ্রুতি, নতুন ভাষা, নতুন গান, নতুন বন্ধুতা,
কিছু বুক টাটানো স্তন বলুক না ভালোবাসা একটা খাড়া দোতারার টান,
সিনাটান সিম্ফনি, দিন আর রাতের ওয়েভ ভাগাভাগি না করে বলুক, হ্যাঁ
বলুক না আমাদের মতো সাহসী উচ্চতা ছিলো বলেই ভালোবাসা আর শরীর
একটা মেলেডিয়াস মিল্কিওয়ে তৈরী করতে পেরেছিল জীবনের, গ্যালাক্সিওয়ে

কিছু মোহিনী দৃষ্টি, সাগরদাঁড়ির মত সন্তান নজর কাড়ুক, তারপর না হয়
ক্যাপটিভ লেডি অথবা পিগম্যালিয়ন নিয়ে কথা বলা যাবে, এ¯্রাজ বেজেই
যাক না, তারপর শক্তি পরীক্ষায় ধরা দেবে ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’ !!

 

13076701_10207414688220199_8444736695305416507_n

অমৃতসর ও জ্যোছনাবাগান

অমৃতসরে তোমার ওষ্ঠ
কাশ্মিরে তোমার অধর,

ভুবনেশ্বরে পুজার হৃদয়
কি করে থাকে ঝড়াশর

তোমার চিহ্ন দেখে জড়
এই অবস্থায় চুপ, নির্দয়..?

মধ্যপ্রদেশে আমি আছি
ঝাড়খণ্ড লাল পতাকায়

ত্রিপুরা যখন কুমিল্লা হয়
বান্দরবানে কূলমান ক্ষয়।

দুই বাংলার মূল চরে ভয়
পাছে অভিমানে ঝড় বয়..!!

অমৃতসর থেকে বান্দরবান
মনের দূরত্ব জ্যোছনাবাগান

ওইখানে ঠিক ঠিক দেখা হবে
এটুকু বুঝে নিও তুমি নিশ্চয়।

 

মধ্যবিত্ত

জীবনের ছোটোগল্পে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা
সারাজীবন একই রাখার কি-ই দরকার?
ঝড়ের সম্ভাবে যে যেভাবে এসেছে আর
যাবে, অনুভূতির চক্ষু দিয়ে ঢালো গঙ্গা।
জীবনের শেষান্তে মধ্যবিত্ত জীবন ভাষা
হোক ভাষান্তর, বসন্তপ্রায় কোন সংকেতে
তরুণ মধ্যবিত্তের কাছে সকাল-কুয়াশা
বয়েসী মধ্যবিত্তের রেওয়াজ মঙ ক্ষেতে
বেঁচে থাকার অক্সিজেন নিতে রোজ হাঁটা
জীবনের ছোটগল্পে মধ্যবিত্তের কেক হোক
উদযাপনের অপেক্ষায় থেকে আর না কাটা
সকাল হোক পাথর, সন্ধ্যা নদী, মর্ত্যলোক
হোক তাজ্জব লীলাময়, বাদ সাধবে না মঙ্গা।
জীবনের ছোটোগল্পে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা
সারাজীবন একই রাখার কি-ই দরকার?
শঙ্কা আর দোলা দেশান্তরী হোক না তার
মাটির প্রদীপে জ্বলুক না তার উরু জঙ্ঘা।

 

13043383_10207370804643137_2045836473538918380_n

দীপক ভৌমিক : জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ (১ ফাল্গুন ১৩৬৮) সালে। কবিপ্রতিভায় সফল হয়েও সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সমান পারদর্শিতা রয়েছে লেখকের। সত্তরের শেষার্ধে লেখালেখি শুরু করা এই লেখক-কবি আশির দশকে স্বীয় প্রতিভার শক্তিশালী স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তার প্রকাশিত দুটি কবিতার বই, ‘অবেলায় অবগাহন’ (২০০১) ও ‘রাত্রির মদ্যগান’ (২০১১)