বিজ্ঞানপ্রেমী একজন ড. এ আর খান

বাংলাদেশের বিজ্ঞান আন্দোলনের অগ্রপথিক ড. এ আর খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী যাকে ‘সাইকেল স্যার’ হিসেবে চেনেন। দেশের মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা ছিল যার জীবনের অন্যতম ব্রত। যুক্ত ছিলেন অনুসন্ধিৎসু চক্র ও বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে। গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে তাঁর আকর্ষণ ছিল বরাবরই। সেদিনও তাই মেঘমুক্ত আকাশের তারা দেখার সুযোগটি হাতছাড়া করেননি। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনের টেমস নদীর তীরে তারা দেখেছেন। কিন্তু ফেরার পথে রেলস্টেশনে পড়ে গিয়ে সংজ্ঞা হারালেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ হারাল জ্যেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আনোয়ারুর রহমান খানকে। গত ২৫ মে বাংলাদেশ সময় ভোর চারটা ৫০ মিনিটে (স্থানীয় সময় রোববার রাত ১১টা ৫০) মিনিটে লন্ডনের সেন্ট মেরিস হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি দুই মেয়ে ইরফাত খান ও নিশাত শরীফকে রেখে গেছেন। গুণী এ মানুষটির তরুণবেলা কেমন কেটেছে পাঠকদের জন্য সেই গল্প তুলে ধরছেন সৈয়দ শিশির

বাবা ছিলেন বিসিএস কর্মকর্তা। ৬ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে ড. এ আর খান সবার বড়। বাবা আলতাফুর রহমান খান, তিনিও এ আর খান নামে সুপরিচিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে মুচকি হেসে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘বলতে পারেন এটি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য আর পরিচিতির সূত্র। আমার দাদা থেকে নাতি পর্যন্ত প্রত্যেকের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ- এ আর খান।’ বিজ্ঞানপ্রেমী এই মানুষটির পূর্ণাঙ্গ নাম আনোয়ারুর রহমান খান। ১৯৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালির বেগমগঞ্জে নানাবাড়িতে তার জন্ম। দাদার বাড়ি বিক্রমপুরের ষোলগড়ে। বাবার চাকরি সূত্র ধরে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ালেও তার সুন্দর শৈশব কেটেছে ঢাকায়। ১৯৩৫ সালের কথা। তার বাবা তখন ঢাকা কালেক্টরের ট্রেজারার ছিলেন। সেই সুবাদে পুরান ঢাকার এক জমিদার বাড়িতে বসবাস করতেন। সে এলাকার ইটের রাস্তা আর ঘোড়ার গাড়ির স্মৃতি ৮৪ বছর বয়সেও তাকে নিয়ে যেতো হারানোর শৈশবে। গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে বাসাবাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষার পর্ব সমাপ্ত করেছেন। ১৯৩৬ সালে বাবা বদলি হন পশ্চিমবঙ্গের মেদেনীপুরে। তারপর সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, কুমিল্লা ঘুরে ষোলগড়ে। সিরাজগঞ্জের বিএম উচ্চ বিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। পাবনা জিলা স্কুলে ১ বছর এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ২ বছর পড়ালেখা করেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের সেই দিনগুলো খুবই আনন্দে কেটেছে বলে জানান ড. এ আর খান। শহরটির বুক চিরে বয়ে গেছে খরগ্রোতা টাঙন নদী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোমরে রশি বেঁধে গাছে বা খুঁটিতে আটকিয়ে নদীতে লাফ দিতাম, যেন গ্রোতের টানে হারিয়ে না যাই।’ কথাগুলো বলার সময় ৮৪ বছরের তরুণ ড. খানের ঘোলাটে হয়ে আসা চোখ দুটি যেন চকচক করে উঠেছিল। টাঙনের স্রোত যেন জাগিয়ে দিয়ে গেল তার সবুজ শৈশব। প্রায় পাঁচ মিনিট চুপচাপ বসে থেকে আবারও কথা শুরু করলেন। নিজের পড়াশোনার কথা। বললেন, ‘পড়াশোনায় আমি কখনোই ভালো ছিলাম না। আসলে পড়াশোনায় ছিলাম অমনোযোগী। খেলাধুলা ছিল খুবই প্রিয়। সারাদিন হৈচৈ করে বেড়াতাম।’ তবে কারো সঙ্গে ঝগড়া করতেন না। কখনো কারো মনে কষ্ট দিতেন না বলে জানান তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তার পড়ালেখায় কয়েক বছরের একটা বিরতি ছিল। ১৯৪৬ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। প্রায় ১ মাইল দূরে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো তখন। কয়েক গ্রাম পর একটি পাঠশালা কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সন্ধান পাওয়া যেত। কখনো নদী সাঁতরেও স্কুলে যেতে হতো। তিনি এতটাই দুরন্ত ছিলেন যে, পকেটে সবসময়ই গুলতি রাখতেন। দর্জিকে শার্ট-প্যান্টের পকেট বড় রাখতে অনুরোধ করতেন। কারণ পকেটে যে গুলতি রাখতে হবে। তবে তিনি একথাও অকপটে স্বীকার করেন যে, এখনকার মতো সেই যুগে পড়াশোনার এতটা চাপ ছিল না। স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার হওয়া অনেক কষ্টকর বলে সেই পথে হাঁটেননি। ছোটবেলা থেকেই অংকে ভালো ছিলেন। তবে সারাক্ষণ ভাবতেন বিজ্ঞান নিয়ে। নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে শিক্ষকের অনুরোধে দশম শ্রেণীর অংক করে দিতেন শিক্ষার্থীদেরকে। ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থানকালে জোরালো হয়েছিল তার বিজ্ঞান ভাবনা। সেই ১৯৪০-১৯৪১ সালের কথা। সেখানে কোনো রেডিও আর বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে দেশ-বিদেশের কোনো সংবাদ জানা সম্ভব হতো না। এক সময় স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবে কলকাতা থেকে একটি রেডিও আনা হলো। এটি খবরের সময় উঁচু স্থানে রাখা হতো। ব্যাটারি চার্জ করে আনতে হতো সুদূর দিনাজপুর থেকে। এই অনগ্রসরতার জন্য তিনি বিজ্ঞান চর্চায় পিছিয়ে থাকাকেই দায়ী করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উন্নতির মূলই হলো বিজ্ঞান। তাই বিজ্ঞান চর্চার প্রসার ঘটাতে হবে। এ বিষয়ক চাকরির ক্ষেত্র বাড়াতে হবে।’ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশা বাদ দিয়ে ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হন পদার্থবিদ্যায়। ১৯৫৫ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভের পরের বছরই অ্যাসিস্ট্যান্ট টু প্রফেসর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পিএইচডি করার লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে লন্ডনে যান। সেখানে গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেছেন। তখন শিক্ষকতা করেছেন লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজে আর গবেষণা করেছেন ন্যাশনাল ফিজিক্স ল্যাবরেটরি এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে। পিএইচডি সম্পন্ন করে ১৯৬৭ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল সময়টাতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হলে (বর্তমানে সূর্যসেন হল) থাকতেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে- তা তিনি কখনো ভাবতেও পারেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মানুষের মনুষ্যত্ববোধ যদি লোপ পায়, তাহলে যে আর কিছুই থাকে না।’ একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার ভাবনা নিয়ে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। তার ছোট ভাই আশফাকুর রহমান খান তখন ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন এবং নিয়মিত সংবাদ পাঠ করতেন। স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে এলাকাবাসী ড. খানকে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। কিন্তু গরিবের গম নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় বলে পরে আর সেই পথে হাঁটেননি। দেশের প্রায় ল্যাবরেটরিতে অলস পড়ে থাকা যন্ত্রগুলো শিক্ষার্থীদের মেধা চর্চায় কাজে লাগানোর ভাবনায় নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ইউনিট্রনিক্স লিমিটেড’। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছুদিনের মধ্যেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭২ সাল থেকে ‘অনুসন্ধিৎসু চক্র’ ও ‘বিজ্ঞান জাদুঘর’-এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে জোরালোভাবে শুরু করেন বিজ্ঞান আন্দোলন। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় তিনি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ জ্যোতির্বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটায় বলেই তিনি এ নিয়ে কাজ করছেন।
ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলেও পাবলিক বাসে চড়েই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেতেন। কারণ এতে করে কিছুটা হলেও যানজট কমে, পরিবেশ রক্ষা পায়। ফটোগ্রাফি তার নেশা। সময় পেলেই প্রিয় ক্যামেরাটি হাতে নিয়ে ক্লিক করে বসতেন। নিয়মিত গান শুনতেন। অবসর কাটতো ই-বুকে বই পড়ে। বাইসাইকেল  ছিল তার প্রিয় বাহন। তার বাবাও সাইকেল চালাতেন। যিনি কিনা জেলা অফিসার থাকাবস্থায়ও সাইকেলে চড়ে অফিসে যেতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাইকেল চালিয়ে কোথাও গেলে পথেঘাটে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয় না। সময়মতো যথাস্থানে পৌঁছা যায়। অর্থ সাশ্রয় হয়। পরিবেশের ক্ষতি হয় না। তা ছাড়া সাইকেল চালানো স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।’ তিনি সাইকেল চালানোর জন্য পৃথক লেনের স্বপ্ন দেখতেন নিজ দেশে। লন্ডনে সাইকেলের জন্য পৃথক লেন থাকায় তিনি সেখানে সাইকেলেই যাতায়াত করতেন।
তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘২০০ বছর পর বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে তুমি কেমন পৃথিবী কল্পনা কর? এ লক্ষ্যে তুমি কী করছ? শুধু অন্যে করে দেবে- এমন আশায় থাকলে হবে না। জীবনটাকে বুদ্ধিমান প্রাণীর মতোই পরিচালনা করতে হবে। ঠিক রাখতে হবে পরিবেশ, তবেই ভবিষ্যতেও এখানে জন্মাতে পারবে বুদ্ধিমান প্রাণী।’ ড. এ আর খানের স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নে তরুণসমাজ এগিয়ে আসবে- এমনটিই সময়ের দাবি।

(নোট :সৈয়দ শিশির তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন ২০১৪ সালের ১৫ মে)