ধানসিঁড়ি নদী আইসিইউতে, বাঁচাতে এগিয়ে আসুন

আল মামুন

ধানসিঁড়ি নদী বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলায় অবস্থিত। একদা প্রমত্তা নদীটি এখন ক্ষীণকায়া। বাংলা সাহিত্যে ধানসিঁড়ি নদীটি প্রেম এবং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিখ্যাত প্রকৃতিবাদী কবি জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার বিখ্যাত লাইন─‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়…।’

এই হলো মোটামুটি ধানসিঁড়ি নদীর পরিচয়। এটুকু লিপিবদ্ধ আছে বাংলা উইকিপিডিয়াতে। আসলে উইকিপিডিয়াতে এই উপস্থিতিটুকু থাকলেও বাস্তবে ধানসিঁড়ির অস্তিত্ব খুব একটা চোখে পড়ে না। নামটুকু ছাড়া আর যেটুকু আছে সেটুকুকে নদী না বলে খাল বলাই ভালো।

ধানসিঁড়ি নদীতে আমার বাবা ইলিশ মাছ ধরেছেন। আমরা শৈশবে ধরেছি পুটি মাছ বাইন মাছ। সেই নদী এখন শুকিয়ে মরা খাল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই সত্যি এবং একইসঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগে কবি জীবনানন্দ দাশ কোন্ দুঃখে বলেছিলেন─ আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে…! নদীর বর্তমান এই অবস্থা দেখলে নিঃসন্দেহে দুঃখে তিনি কপাল ফাটাইতেন!

কবির স্মৃতিবিজড়িত ধানসিঁড়ি নদীটি প্রবাহিত হয়েছে ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে সুগন্ধা বিশখালী, জাঙ্গালিয়া, সন্ধ্যা আর সুয়েজ খাল গাবখান চ্যানেল ছুঁয়ে। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এ নদীর অপর প্রান্ত গিয়ে রাজাপুরের বাগড়ি বাজারের তীরবর্তী জাঙ্গালিয়া নদীতে পড়েছে।

ধানসিঁড়ি এককালে নদী স্রোতস্বিনী ছিল। এখন নদীটির সেই স্রোত নেই, নেই সেই ভরা যৌবন। কালের প্রবাহে এই নদী কেবল শীর্ণ হতে হতে মৃত নদী। শীতকালে পানি শুকিয়ে এমনই হয় যে, হেঁটেই নদীটি পার হওয়া যায়। যদিও বর্ষা মৌসুমে কিছুটা প্লাবিত হয়। সেই যৌবনদীপ্ত স্রোত আর হয় না।

কথিত আছে, ধানসিঁড়ি নদী পারাপারে এক ডোঙ্গা ধান সিদ্ধ হওয়ার সমপরিমাণ সময় লাগতো বলে এর নাম ছিল ধানসিদ্ধ নদী। আবার কেউ কেউ বলেন, রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি এলাকায় সে সময় শত শত ডোঙ্গায় ধান সিদ্ধ করা হতো। বিভিন্ন স্থানের লোকজন এখানে ধান সিদ্ধ করার জন্য নৌকায় করে ধান নিয়ে আসতো। এ কারণেই এ নদীর নাম ধানসিদ্ধ নদী।

কোথাও এমনও উল্লেখ আছে─ নদীর বিশাল চরে ব্যাপক ধানের চাষ হতো। কৃষকরা সে ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য হাজার হাজার মণ ধান আঁটির ওপর আঁটি বেঁধে সিঁড়ির মতো করে সাজিয়ে রাখত। আর সেখান থেকেই নদীর নাম ধানসিঁড়ি।

যেখানে যা-ই উল্লেখ থাকুক সে সব এখন ইতিহাস। আর এই ইতিহাস ঘেঁটে কী ছিলো আর কী ছিলো না তা না ভাবাই ভালো। বরং চোখ ফেরানো যেতে পারে ধানসিঁড়ি নদীর বর্তমান অবস্থার দিকে।

ধানসিঁড়ি নদীর বর্তমান অবস্থা যদি চোখ খুলে দেখা হয় তাহলে মনের কষ্টে দু’চোখ বেয়ে যে জল পড়বে তাও হয়তো এই নদীতে এখন আর অবশিষ্ট নেই! বিশ্বাস না হলে দেখে আসুন একবার। জল শুকিয়ে কতটা খা খা করছে ওর বুক!

সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীর উৎসমুখ থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খননের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। ওই সময় সাড়ে চার কিলোমিটার খনন করা হয়েছিল। নিয়মিত বরাদ্দ না দেয়ায় পরের সাড়ে তিন কিলোমিটার আর খনন করা হয়নি।

ধানসিঁড়ি নদীর রাজাপুর অংশের অবস্থা খুবই করুণ। এই অংশে খননের অভাবে ও বাগড়ি বাজার গরুর হাট এলাকায় দখল হওয়ার কারণে নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাপুর অংশের পিংড়ি-বাগড়ি-বাঁশতলার মোহনা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। কিন্তু উৎসমুখ ভরাট হওয়ায় নদীর ওই অংশ আবারো ভরাট হয়ে গেছে। সর্বত্র কচুরিপানা আটকে আছে।

ধানসিঁড়ি নদীটি যে কেবল শুকিয়ে গেছে তা-ই নয় বরং পলি জমে কমেছে এর দৈর্ঘ্যও। ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদী এখন ৫-৬ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে।

ধানসিঁড়ি যেনো চুলপাকা বৃদ্ধা এক নারী। রোগে-শোকে জরাজীর্ণ তার শরীর। যিনি এখন শুয়ে আছেন মেডিক্যালের নিরস আইসিইউর বেডে। বৃদ্ধা নারী জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে বলে তাকে হয়তো আর আইসিইউর বেড থেকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানো সম্ভব না।

তবে আমরা বিশ্বাস করি নদী কখনো মরে না তাকে যদি না মেরে ফেলা হয়। আমরা চাই না আমাদের প্রিয় কবি জীবননান্দের স্মৃতিবিজড়িত ধানসিঁড়ি নদীটি এভাবে আইসিইউর বেডে শুয়ে ধুকে ধুকে মরুক। আমরা চাই এই নদী আবারও ভরা যৌবন নিয়ে ফুলেফেঁপে উঠুক। আমরা চাই আবারও এই নদীর বুকে প্রিয় কবির প্রিয় কবিতা মুখে নিয়ে উদোম শরীরে ভাসতে।