অ্যাকোয়ারিয়ামের সংসার

977589_10151639737124630_1414118305_o

রিটন কান্তি নাথ

 

 

দিদা এটা কী মাছ ?’

বটির একদিকে মাছের মাথা অন্যদিকে পুরো শরীরটা ধরে জোড়ে একটা চাপ দিল নাজমা বেগম, মাছটা দুই টুকরো হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। প্লাটিকের বাটিতে মাছের টুকরোগুলো রেখে ছাই মাখা হাতে আরেকটি মাছ ধরেন তিনি। নাতির প্রশ্নটা শুনে তিনি কিছুটা মজা পেয়েছেন। ধারালো লেখাপড়ার জমানায় তিনি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। উনার বাবা উপজেলা পরিষদে চাকরি করতেন, শিক্ষিত মানুষের সাথে মিশেছিলেন, শিক্ষার গুরুত্ব জানতেন। তাই একটা স্বপ্ন সবসময় লালন করতেন, দুই মেয়েকে তিনি কমপক্ষে বি.এ পাস করাবেন। কিন্তু বড় মেয়েটির পড়ালেখার মাথা ছিল না, মনোযোগও ছিল না- বইয়ের চেয়ে বাইরে মনোযোগ ছিল বেশী; তাই এগুতে পারেনি। সে কারণে নাজমা বেগমের উপর উনার বাবার প্রত্যাশা ছিল দ্বিগুণ। কিন্তু কী আর করা ! যে সময়ে মেয়েদের মাসিক হওয়ার সাথে সাথে মহিলার কাতারে ঠেলে দেয়া হয় সে সময়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন মেয়েকে বিয়ের পরিবর্তে বি.এ পাশের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে সাহস প্রয়োজন তা নাজমা বেগম কিংবা তাঁর বাবা কেউ দেখাতে পারেননি। তাই বিয়ের পরও শিক্ষার আগুন নাজমা বেগমের বুকের ভেতর ছাই চাপা থাকলেও কখনো নিভে যায়নি। যেখানে যা পেয়েছেন গ্রোগ্রাসে পড়েছেন। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন। নিজের একটি মেয়ে একটি ছেলে, তাদের মানুষ করেছেন । মেয়েটি ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর সাথে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয়েছে। একমাত্র ছেলে সোহাগ বর্তমানে একটি প্রাইভেট ব্যাংকের সহকারী ব্যবস্থাপক; দুই বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রীপুত্রকে নিয়ে তার গুছানো সংসার। বছরে দুয়েকবার গ্রামের বাড়িতে যায়। মার সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে আসে। এবার সোহাগ অনেকদিন যেতে পারেনি বলে নাজমা বেগম নিজে চলে এসেছেন ছেলের কাছে। আসার সময় গ্রামের টাটকা শাকসবজি ও কয়েক পদের মাছ এনেছেন। কাল রাতে আসতে দেরি হওয়ায় দিনা মাছগুলো ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। আজ সকালে যখন মাছগুলো বের করল তখন আবীর হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল এবং সেগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দিদা এটা কী মাছ ?’

নাজমা বেগম নাতিকে কোলে টেনে নিয়ে বললেন,  ‘এগুলো পুকুরের  মাছ, আমার মনে হয় তুমি এই মাছের নাম জানো, মনে করার চেষ্টা কর, খেতে খুব মজা ।’

খেতে মজাদার হবে কী হবে না সেই অনির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে সেদু’দিকের কাঁটার উপর ভর দিয়ে মাছগুলোর নড়াচড়ায় মন দিল। এরকম মাছ আগে দেখেছে বলে মনে পড়ছে না তার । সে কয়েকবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে মাছের নামটা মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু বাংলা শব্দার্থের মত এই মাছটার নামও সে মনে করতে পারছে না। তারপর হঠাৎ নাম মনে করায় ইতি টেনে সে মাছের দিকে মন দিল। আজ বিকালে তার বন্ধু সুমিত ও রকিবকে জানাতে হবে, শুধু তারাই লাফালাফি করতে জানে না, এমন এক ধরনের মাছ আছে যেগুলো এদের চেয়ে দ্রুত লাফাতে পারে। শূনে অবশ্য বিশ্বাস করবে না, এই ধরনের মাছতো তারা কখনো দেখেনি। দেখবে কোত্থেকে, তাদের তো দিদা নেই। আবীরের চকচক করতে থাকা চিন্তার সূত্রগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিনা কন্ঠস্বর বের হয়ে আসে, ‘মা কৈ মাছগুলো তো ধরতে পারছি না। কাটব কিভাবে ?’

এ গুলোর নাম কৈ মাছ ! এ নাম তো আবীরের কাছে নতুন নয় । তার বাংলা বইয়ে ‘বাংলাদেশের মাছ’ অধ্যায়ে এই মাছের নাম পড়েছে সে। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায়ও এই মাছটার নাম লিখেছে। মাছটাকে আগে কখনো দেখেনি , তাতে কী , শিং, মৃগেল, শোল মাছের নামও তো লিখেছে, সেগুলো কি কখনো দেখেছে? কিন্তু তার অবাক লাগে এত ছোট নামের মাছ এত বেশী লাফায় কী করে ? তার বাবার সাথে সে কয়েকবার বাজারে গিয়েছিল। সেখানে সব মাছ সুবোধ বালকের মত শান্ত  হয়ে শুয়ে থাকে । থরে থরে সাজানো, একটা মাছও লাফায় না। বাজারবিছিন্ন এই বিরল মাছটা তাই তার বন্ধুদের না দেখালেই নয়।

‘মা, প্লিজ আমাকে একটা মাছ দাও।’দিনার দিকে হাত বাড়িয়ে ধরে আবীর।

‘যা এখান থেকে, তুই মাছ দিয়ে কী করবি ?’

‘আমার একটা মাছ দরকার, ছোট হলেও চলবে, অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখব।’

‘এগুলো পুকুরের মাছ, অ্যাকোয়ারিয়ামের না। গোল্ডফিস বা ক্যাটফিস লাগলে বল, তোর বাবাকে বলে এনে দেব।’ কথা বলতে বলতে দিনার একটা কৈ মাছ ধরার চেষ্টা করে।

‘সেগুলো  আছে, আমার কৈ মাছ দরকার। প্লিজ মা, একটা দাও না! অনলি ওয়ান ।’

ড্রয়িংরুমে রাখা সুন্দর কারুকাজসমৃদ্ধ অ্যাকোয়ারিয়ামটা সোহাগ আবীরকে কিনে দিয়েছিল বছরখানেক আগে। সে সারাদিন অফিসে থাকে। দিনাও সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আবীর স্কুল থেকে এসে এদিক ওদিক না গিয়ে ঘরে সময় কাটানোর  জন্যই অ্যাকোয়ারিয়ামটা নিয়ে আসে সোহাগ। ড্রয়িংরুমে বত্রিশ ইঞ্চি এলইডি টিভিটা বসানোর পর এক কোণে কিছু শোপিশ দিয়ে ফিলআপ করা গেলেও অন্য কোণটা বিশ্রী ভাবে খালি পড়ে ছিল। টিভি দেখার সময় বারবার ঐ খালি জায়গায় তার চোখ চলে যেত। তাছাড়া তারও অ্যাকোয়ারিয়ামের শখ অনেক দিনের । তার বাবা জলিল আহমেদ স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অন্যান্য শিক্ষকের মত স্কুল থেকে ফিরে বাজারের ঔষধের  দোকানে বা লাইব্রেরিতে আড্ডা দেয়ার অভ্যাস জলিল সাহেবের ছিল না।  শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ক্ষেতখামার নিয়ে পড়ে থাকতেন। নিজের তিন বিঘা জমি নিজে চাষ করতেন, কাউকে বর্গা দিতেন না। যথেষ্ট উন্মুক্ত আবাদি জায়গা ছিল, সবজি চাষ করতেন, একটি মাত্র পুকুর ছিল-যদিও তেমন বড় নয়, সেখানে মাছ চাষ করতেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোনা এনে পুকুরে ছাড়তেন। যথেষ্ট কৃষিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। যেহেতু সোহাগ এসএসসি পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেছে সুতারাং বাবার কাজে তাকেও সঙ্গ দিতে হয়েছে। জমিতে ক্ষেত খামারের কাজের চেয়েও পুকুরের মাছ চাষটা তাকে ভীষণ টানত। ফোনাগুলো একটু বড় হলেই সারা পুকুরে যে কী প্রাণময় আনন্দযজ্ঞ শুরু হয়ে যেত! অনেক বিকাল স্কুল থেকে ফিরে সে শুধু পুকুরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীতে শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দূরত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে পুকুরের প্রতি মোহনীয় টানটাও বেড়েছে। কিন্তু সেই পুকুর পাড়ে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ক্যারিয়ারের ঘোড়া  তাকে পিঠে বসিয়ে পুকুর পাড় থেকে উঠিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি নিরাপদ প্রকোষ্টে ফেলে রেখে চলে গেছে নিরুদ্দেশে। দিনার সাথে বিয়ে হওয়ার চৌদ্দমাস পর বাবা মারা গেলে গ্রামের সাথে সংযুক্ত রশিটাও আস্তে আস্তে ঢিলে হয়ে পড়ে। এখনো যে ছিন্ন হয়ে যায়নি সেটা তার মা নাজমা বেগমের কারণে। জমিগুলো তার বাবার মৃত্যুর পর বর্গা দিলেও পুকুরটা দেয়নি। তবে সেখানে মাছের চাষও এখন আর হয় না। সেই অতৃপ্তি থেকে ফ্ল্যাটে একটা অ্যাকোয়ারিয়াম রাখার শখ তার অনেকদিনের । তাছাড়া ড্রয়িংরুমে কাচবন্ধি টলটলে পানির মধ্যে গোল্ডফিসের নড়াচড়া ঘরের সৌন্দর্য অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে, সেই চিন্তা থেকে অ্যাকোয়ারিয়ামটা নিয়ে আসা। প্রতি সপ্তাহে বন্ধের দিন পানি চেঞ্জ করে দেয় সোহাগ। স্কুলফেরত আবীরের বড় একটা সময় কাটে গোল্ডফিস,ক্যাটফিসের সাথে। এখন সেখানেএকটি কৈ মাছও সামিল হয়েছে।

নাজমা বেগম খোলা আবাহাওয়ার মানুষ। মানুষজনের সাথে কথা না বললে তাঁর পেটের ভাত হজম হয় না। ঘরে যদিও তিনি ও তাঁর এক দূরসম্পর্কীয় ভাইপো থাকেন তারপরও সকালে কিংবা বিকালে বাড়ির কয়েকজন সাথী না হলে তিনি চা খেতে পারেন না। তাঁকে চা করে কাউকে খাওয়াতে হয়না, যে কেউ ঘরে গিয়ে চা বানিয়ে নিয়ে আসে, তিনি সবাইকে নিয়ে চা খেতে খেতে গল্পগুজব করেন। সারাদিন ঘরের দরজা খোলা রাখেন, বাড়ির লোকজন নির্দি¦ধায় যাতায়াত করে, তাঁরও সবার ঘরে অবাধ প্রবেশাধিকার।  এখানে, ছেলের কাছে,সাজানো গুছানো ফ্ল্যাটে আসার দু’দিন পর সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি বাড়ির মত দরজা জানালা খুলে দিলেন। সকালের নির্মল হাওয়া হু হু করে ঢুকে রাতের বাসি বাতাস বের করে দিয়ে যে সুশীতলায় ভরে দিল।  সে হাওয়ায় তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর ছেলে-বউ-নাতি কেউ এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। তিনি দরজা পেরিয়ে বারান্দায় চলে এলেন। সামনের ফ্ল্যাট থেকে দিনার বয়সী একজন তার মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে আসছে, কাঁধেস্কুল ব্যাগ। সেটা দেখে নাজমা বেগমের মন্টুর কথা মনে পড়ে গেল। মন্টু তাঁর চাচাত দেবর, কাঁধে মোটা গাঁট নিয়ে বাড়ি বাড়ি কাপড় ফেরি করে বেড়ায়। নাজমা বেগম কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই  তারা লিফটে ঢুকে পড়ে । নাজমা বেগম বুকভরা কৌতুহল নিয়ে বারান্দার আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছেন। যেদিকে চোখ রাখছেন সেদিকে দৃষ্টি প্রতিহত হয়ে ফিরে আসছে। কোথাও নেত্রসুখকর কিছু চোখে পড়ছে না।  কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকেই সোহাগের উত্তেজিত প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন।

‘মা,দরজা কি তুমি খুলেছ ?’

‘হ্যাঁ , কী হয়েছে ?’

‘মা,  এসময় কি কেউ দরজা খোলা রাখে এখানে ? চারিদিকে চোর ছ্যাঁচোড় ঘুরঘুর করছে। তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না।’সোহাগের কণ্ঠভরা বিরক্তি।

‘এখানে চোর আসবে কিভাবে, নিচে গার্ড আছে না ! তাছাড়া আমরা তো সবাই জেগে আছি। নাজমা বেগম বিস্ময়মাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন।’

‘গার্ডরাই এখন চুরি করে বেশী, আশেপাশে কে কোথায় চুরির আশায় চুকচুক করছে কিভাবে জানবে তুমি। ফ্ল্যাটের মালিকরাও এখন চোরের তালিকার বাইরে নয়।’

‘কি যা তা বলছিস, এত টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছে, চোর হতে যাবে কেন?’

‘সে সব আমি তোমাকে বুঝাতে পারব না। আমি ব্যাংকে চাকরি করি, আমি জানি কে কিভাবে ফ্ল্যাট কিনে।  কোন কিছু লাগলে দিনাকে বলো, সে ব্যবস্থা করে দেবে। তোমার বাইরে  যাওয়ার দরকার নেই।’

নাজমা বেগম আর কিছু বললেন না, তবে মনটা ভার হয়ে গেল। সোহাগ অফিসে চলে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গেলেন দরজা বন্ধ করতে । আবীর বাবার পিছু পিছু দৌড়ে গেল দরজা বন্ধ করতে, যেন দরজা বন্ধ করা ভীষণ মজার একটা কাজ। এরপর দিনা আবীরকে স্কুলের জন্য তৈরী করল। সামনের ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া মেয়েটির মত কাঁধে ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার সময় বলল, ‘মা দরজাটা বন্ধ করে দিন। আমি এসে বেল বাজালে তবেই খুলবেন । খোলার আগে কী হোলে দেখবেন আমি কিনা। আমি ছাড়া অন্য কেউ হলে খোলার দরকার নেই।’ নাজমা বেগম মাথা নেড়ে দরজা বন্ধ করলেন। তাঁর বুকের ভেতর একটা বায়ুচাপ সারাদিন ঘুরপাক খেয়েও স্থির হতে পারল না। পরদিনও একই দৃশ্যায়ন। সোহাগ সকালে অফিসে চলে যায়, ফিরে সন্ধ্যার পর। ফিরেই টিভি নিয়ে বসে। আগে সপ্তাহে একদিন অ্যাকোয়ারিয়ামের পানি পাল্টাতো , এখন কৈ মাছটা রাখার পর প্রতিদিন পানি পাল্টাতে হচ্ছে। পানি দ্রুত ঘোলা হয়ে যাচ্ছে, মাছের ঘাইয়েসাদা নুড়ি পাথর, আর্টিফিসিয়াল লতা-গুল্ম গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। গোল্ডফিস ও ক্যাটফিসগুলো কি সুন্দর করে সাবলীলভাবে ধীর লয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামে চলাফেরা করে, নিথর জলের বুকে সামান্য আলোড়নও তোলে না। কিন্তু কৈ মাছতো শান্ত থাকার মাছ নয়, সে সারাদিন ছটফট করে, একবার উপরে যায়, একবার নিচে আসে, কাঁচের দেয়ালে উজান বায়, লতা-গুল্ম-নুড়িপাথরে ঘাই মেরে এলোমেলো করে দেয়, অন্য মাছদের তাড়া করে বেড়ায়।কৈ বড্ড অস্থির মাছ !

প্রতিদিন পানি পাল্টিয়ে দিতে হলেও সোহাগ কৈ মাছটার চলাফেরায় খুব মজা পাচ্ছে, আর আবীর তো আগে স্কুল থেকে এসে ভিডিও গেম নিয়ে বসে যেত, এখন অ্যাকোয়ারিয়াম নিয়ে পড়ে থাকে, কতবার অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে পানি ছলকে ছলকে তারউপর পড়েছে ! তারপরও বিরক্তি নেই। আরো একটা কৈ মাছ কেন অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখল না সেটা নিয়ে সোহাগ ও আবীর মাঝে মাঝে আপসোস করে। এসব নিয়ে দিনা মহাবিরক্ত । বাইরের উটকো ঝামেলা মাথায় আনবে বলে এমনিতে আবীরকে বাইরের কোথায় যেতে দেয় না, স্কুল থেকে এসে ভিডিও গেম খেলে, নাহলে টিভিতে নিক চ্যানেলে ‘মোটো পাতলো’ নিয়ে পড়ে থাকে অথবা ঘরে নিজের খেলনা নিয়ে সময় কাটায় আর সোহাগের তো কোথাও যাওয়ার সময়ই হয় না, অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে অফিস। এতে দিনা নিশ্চিন্তে থাকতে পারে, বাপ-বেটা চোখের সামনে থাকলে সে প্রশান্ত চিত্তে ঘরের কাজকর্ম করতে পারে। কিন্তু অ্যাকোয়ারিয়ামে কৈ মাছটা নিয়ে বাপ-বেটা যা শুরু করেছে তাতে তাকে সারাদিন তটস্থ থাকতে হয়। ঘরে তার শাশুড়ি আছেন বলে কিছু বলতে পারে না। সারাক্ষণ মনে মনে গজগজ করতে থাকে।  কিন্তু সোহাগ ও আবীর এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। মেয়েদের সবকিছু কেয়ার করতে নেই, এরা অকারণে বিরক্ত হয়।

ছেলে যে আগের মত কেয়ারিং নেই সেটা নাজমা বেগম প্রতিদিন নতুন নতুন করে টের পাচ্ছেন। এখনো তাঁর মনে পড়ে- ক্লাস এইটে পড়ার সময় একবার কলিমের পেট ব্যাথা শুরু হয়েছিল, সোহাগের বাবা তখন বাড়ি ছিল না, সোহাগ নিজেই তার কলিম চাচাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা দ্রুত শহরের হাসপাতালে ট্রান্সফার করেছিল এপেনডিসাইটিস অপারেশন করার জন্য। সেই সোহাগগতকাল সামনের ফ্ল্যাটের মেয়েটি প্রচন্ড জ্বরে কষ্ট পাচ্ছে শুনে শুধু মুখ থেকে একটা আপসোসের শব্দ করল, গিয়ে একটু দেখেও আসল না। নাজমা বেগম সেখানে গিয়েছে শুনে উল্টো দিনার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল, ‘আপনি কেন ওখানে গেলেন, আমরা কি যাইনাকি ওরা আসে আমাদের কাছে ?’

‘বৌমা, ছোট্ট একটি মেয়ে, আমাদের আবীরের বয়সী, তোমাদের প্রতিবেশী, প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়, সে অসুস্থ হলে দেখতে যাব না!’

‘সে অসুস্থ হয়েছে তো আমরা কি করতে পারি মা। ওর বাবা মা নিশ্চয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন। তাছাড়া কোথাকার কে, তার ফ্ল্যাটে আমাকে যেতে হবে কেন, দেখেছেন কখনো তারা আমাদের ফ্ল্যাটে আসতে , আর প্রতিবেশী কিসের, প্রতিবেশী সব গ্রামে, এখানে যার যার তার তার।’ একটানে কথা গুলো বলে গেল সোহাগ।

দিনার পর সোহাগের কথা শুনে শব্দহীন হয়ে গেলেন নাজমা বেগম । বুকের ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেলেন, কাউকে বুঝতে দিলেন না। কিন্তু পরিবর্তিত দৃশ্যটা তিনি ভালো করেই বুঝলেন- এটা তাঁর গ্রামের মাতৃস্নেহপরিবেষ্টিত সোহাগ নয়, মেট্রোপলিটনের অঞ্চলপ্রভাবিত সোহাগ।

নাজমা বেগমের মনটা হঠাৎ বাড়ি যাওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। এবার অনেকদিন পুত্র-পুত্রবধু-নাতির সাথে সুন্দর ছিমছাম ফ্ল্যাটের নিস্তরঙ্গ সৌর্ন্দযে  আমোদে থেকেছেন। সাধারণত এতদিন তিনি কোথাও থাকেন না,গৃহস্থ্য মানুষ, বেশিদিন বাড়ির বাইরে মন বসে না।

পরের শুক্রবার সকালে নাজমা বেগম বিদায় নিলে আবীর অনেকক্ষণ কাঁদল, সোহাগ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল এবং দিনা অনতিবিলম্বে অ্যাকোয়ারিয়ামটাকে কৈ মাছমুক্ত করল।