এরও টিকা ওরও টিকা

ডেস্ক : প্রতি চার সেকেন্ডে এখনও নাকি একটা করে ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর বই বিক্রি হয়! ব্রিটিশ প্রকাশনী সংস্থার ভাঁড়ার থেকেই বেরিয়েছে এই বিরাট তথ্য! ১০০ বছর পরেও কেন এমন জনপ্রিয়তা? যেখানে অনেকেই মনে করেন, ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর মতো ‘সেক্সিস্ট’ লেখা আর হয় না!

নিরেট রোম্যান্স
কথিত আছে, মহিলাদের জন্যই ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ প্রকাশিত হয়। কেন? কারণ বইগুলোর প্লট। মূলত প্রেম-কেন্দ্রিক গল্প বলে সেগুলো। আর প্রেমের মতো নরম-সরম ব্যাপার তো মহিলাদের জন্যই হবে (তবু মহিলারা মহিলাদের প্রেমে পড়লে বেশিরভাগের চোখ কপালে ওঠে কেন, কে জানে)! গল্পের নায়িকারা প্রথাগত ফিকশন’এ যেমন হয় তেমনটাই! তার ধনী পুরুষের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স চাই (নিজের রোজগার থাকলেও বিয়ের পর সে তো চুলোয়)! সেক্স গডের মতো চেহারা চাই (‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর দুনিয়ায় সব ছেলেই যেহেতু জর্জ ক্লুনি, সেটা খুব একটা সমস্যার নয়)। বিরাট বাড়ি চাই (যাতে তার প্রতিটা ঘরে অবাধ সেক্স সম্ভব হয়)! ক্যাডিলাক গাড়ি চাই (না হলে বর্ষার রাতে কে আর লিফ্‌ট দিয়ে নিয়ে যাবে নিজের যৌন-গুহায়)! আর পুরুষটি যদি মনে করে, এই বস্তু-সর্বস্ব মেয়েটিকেই তার চাই, তাহলে সোহাগে সোনারই ফলন শুধু! তারপর যথারীতি বিয়ে এবং সুখ-সমাপ্তি (সুখেরও সমাপ্তি কি না, জানার উপায় নেই)। বাস্তব জীবনটা যেহেতু এ রকম নয়, ফলে কাল্পনিক বিলাসিতাই সই! গল্পের বইয়ে তো অন্তত ‘হার্টব্রেক’এর সম্ভাবনা নেই (কর্ণ জোহরের অনুপ্রেরণা)! সুতরাং বইয়ের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে।

নিষিদ্ধ সুখ
মুশকিল হল, বাস্তবে একজন পুরুষের মধ্যে সমস্ত গুণ পাওয়ার সম্ভাবনা আর শ্যামবাজারে ঘনশ্যাম’কে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় এক। কিন্তু ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ ওসব বাস্তব-টাস্তব অত মানে না। সে জানে, কীভাবে পাঠককে খোরাক দিতে হয়। অমন উত্তুঙ্গ জবরদস্ত পুরুষ পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেয়ে ‘আমাকে নাও’ বলে হেঁচকি তুললে নায়িকার ইগোতে পালিশ পড়বে না? আবার কালে কালে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কও ঢুকে পড়েছে প্রকাশনী সংস্থার স্ট্র্যাটেজি’তে। অথচ সত্তর দশক পর্যন্ত এক্সট্রা ম্যারিটাল’কে জাস্ট পাত্তা দেননি প্রকাশকেরা। তাঁদের কাছে, আদর্শ বিয়ে এবং আদর্শ নারী-চরিত্রের সমীকরণটা জরুরি ছিল সেই সময়ে। কিন্তু সময়ের দাবি মানতে হবেই। মহিলারা বিয়ের পরে আর প্রেমে পড়বে না কেন— এমন প্রশ্ন স্লোগানের মতো ধেয়ে এলে প্লটে পরিবর্তন আনতেই হয়। ফলে বন্ডেজ, বডিস-রিপার, বেড-হপার— এসব ‘কয়েনেজ’ও ঢুকে পড়তে লাগল রোম্যান্সের কারখানায়। বিয়ের পর যে নারী প্রেমে পড়ে, তার তো নীতিবোধ ফক্কা! তাই ‘যৌনদাসী’ হতে বাধা কোথায়— এমন সুবিধেবাদী যুক্তিও আসতে লাগল! বইয়ের নামকরণেও কিন্তু সুবিধেবাদ দেখতে পাবেন— যেমন ধরুন ‘হিজ কনভিনিয়েন্ট ব্রাইড’! যাই হোক, কালোর আলোয় তাই মহিলারাই— কিন্তু কে আর কবে মাথা ঘামিয়েছে তাতে! দু’মলাটে নিষিদ্ধ সুখের খোঁজ পেতে পিলপিল করে ভিড়ও বাড়তেই থাকে অতএব!

বিবর্তন-বাদ
ঘটনাচক্রে আলফা হিরো আর থরথর নায়িকার গল্প পড়ে আধুনিক পাঠকের মেজাজ বিগড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাই নায়ক’কে ‘পুরুষোত্তম’ ইমেজেই আটকে রেখে ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ পাল্টে দিল নায়িকাকে। সে আপাতত বেশ ‘বোল্ড’। নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকছে না আর! সে এখন
যৌন-স্বাবলম্বী। নিজেই ‘সিডিউস’ করতে পারে। প্রেমিক, থুড়ি বরের জন্য ‘ভার্জিন’ হয়ে থাকার সতীপনায় সে আর নেই। গল্পে এখন নায়িকারা এমনকী, ডিভোর্সি (যা আগে কল্পনাও করা যেত না। বিচ্ছিন্না মহিলা মানেই যে অযাচিত। এক পুরুষ যাকে ছেড়ে গিয়েছে, সেই ‘বাতিল’ মহিলাকে কি না প্রেম দেবে আরেক আলফা মেল)! সিঙ্গল মাদার’রাও এখন চরিত্র হচ্ছে বটে, ‘মিঙ্গল মাদার’ হিসেবে! উপরি, ‘সিক্রেট মিসট্রেস’! এরা অবশ্য কোনওদিনই ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর জগৎ থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট পায়নি! প্রকাশনী সংস্থার দাবি, এই চরিত্রেরা বইয়ের দুনিয়ায় সামিল হচ্ছে সমসময়ের সঙ্গে সংগতি রেখেই। দাবি যে অকাট্য, তা প্রমাণ করছে সংস্থার বাজারি পরিসংখ্যান!

হরেকরকম্বা
‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর আরেক দাবি, তারা সব মহিলার জন্যই কিছু না কিছু মাল ও মশলা তৈরি রেখেছে। রোম্যান্সই গল্পগুলোর কেন্দ্রে। কিন্তু কখনও তা কমেডি, কখনও সাসপেন্স বা থ্রিলার, কখনও ইতিহাস কিংবা মেডিক্যাল ড্রামা। মায় সাই-ফাই অবধি আছে! আবার মিলিওনেয়ার’রা ধীরে ধীরে বিলিওনেয়ার হচ্ছে (ডলারের দাম তুঙ্গে ওঠায়)— সে সবও ঢুকে পড়ছে প্লটে। কে বলে বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই? যদিও গল্পের মেয়েরা এখনও প্রেম ছাড়া অসম্পূর্ণ! তবে এরও যুক্তি আছে— প্রেম ব্যাপারটাই যে চিরন্তন! তাই মাঝবয়েসি প্রেমিক আর তার তরুণি ভার্যার বদলে, কর্পোরেট তরুণ আর সমবয়েসি নারীর প্রেমটাই এখন বিক্রয়যোগ্য। সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা, দম্পতিদের দত্তক নেওয়া নিয়ে সমস্যা, টিনএজারের প্রেম— মাত্রা এখন অনেক! ফলে পাঠকদের সঙ্গে কানেক্ট’টাও সিধেসাপটা! ‘চিক লিট’এর কদর এখন ভারী সাহিত্যের চেয়ে এমনিতেও (বাজার দরের) ওজনে বেশি! সুতরাং প্রায় সাড়ে পঞ্চাশ লক্ষ কপি প্রতি বছরে বিকোবে, তাতে সন্দেহ না-ই বা থাকল।

ক্রমে বদল
১। ‘হ্যাপি এন্ডিং’এই শেষ নয়। এখন ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর অনেক গল্পই শুরু হচ্ছে একটি ডিভোর্স কিংবা একটি প্রেমের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর থেকে। যেমন ‘দি আনএক্সপেক্টেড ওয়েডিং গেস্ট’, ‘মেড অফ ডিজঅনার’, ‘লাস্ট গ্রুম স্ট্যান্ডিং’।
২। সব গল্পের নায়িকাই যে প্রেমকাতর এক্সট্রা-ভার্জিন সেক্রেটারি, এমনটা আর নয়! তাদের এখন ভোটাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে গালভরা কেরিয়ারও দিচ্ছেন প্রকাশকেরা। যেমন, ‘হিচ্‌ড’ বইয়ের নায়িকা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শিপইয়ার্ডের মালকিনও রয়েছে, ‘আ লেডি ডেয়ার্স’ বইয়ে।
৩। প্রত্যেক নায়িকাই নিখুঁত বার্বি ডল নয় আর এখন। ‘হিজ এল এ সিন্ডারেলা’র নায়িকা নিজেকে সাদামাঠা চেহারার এবং একটু মোটার দিকে বলেই বর্ণনা করে। ‘দ্য হায়েস্ট প্রাইস টু পে’র নায়িকা শরীরে চিরস্থায়ী পোড়া দাগের
বিবরণ দেয়।
৪। শুধুই শ্বেতাঙ্গরা ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’এর গল্প লেখেন, এমনটা আর সত্যি নয়। আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকেরাও ইদানীং কলম ধরছেন বটে!
৫। পাঠকেরাও এখন জানেন,  গল্পে পলায়ন-প্রবণতা থাকবেই। ফলে যে ধারণা ছিল, অবাস্তব প্রেমের সন্ধান ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ পড়েই শেখে মেয়েরা— সেটা এখন বদলেছে। পাঠকেরাই বলছেন, এ রকম ভাবার মানে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির অপমান!
তথ্য ও কথ্য
১। ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ও এখন ইরোটিকা’র দিকে এগোচ্ছে, সে আর নতুন নয়। কিন্তু তারা সব সময় নিরাপদ যৌনতার প্রচার করে। সব গল্পে কন্ডোমের উল্লেখ থাকবেই।
২। প্রকাশনী সংস্থার বইগুলো অন্তত ২৬টি ভাষায় এখনও পর্যন্ত অনূদিত হয়েছে। ১০৯টি দেশে তার বিক্রি। এবং এ যাবৎ সব গল্প মিলে প্রায় ৩৫০০০ বার প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরেছে। ৩০,০০০ বার চুমু খেয়েছে এবং ১০,০০০ বার ‘আই ডু’ বলেছে।
৩। ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ বহুদিনই হল ব্রিটেনের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে আমেরিকায়। ‘হার্লেকুইন এন্টারপ্রাইজ’এর বদান্যতায়। ‘হার্লেকুইন’এর রিচার্ড বনিকাস্‌ল লন্ডনে গিয়ে লাঞ্চ খেতে খেতেই সংস্থার  অ্যালান বুন’এর সঙ্গে পার্টনারশিপ করে ফেলেন।
৪। যে মহিলারা গল্পগুলো লেখেন, তাঁদের অনেকেই পেশায় শিক্ষক। কিন্তু সেই পেশাদার মহিলারা লেখেন ছদ্মনামে। পাছে তাঁদের সেক্স-সম্পর্কিত গল্প লেখার পারদর্শিতা দেখে ছাত্ররা তাঁদের আর না মানে, তাই!
৫। এক সময় ‘মিল্‌স অ্যান্ড বুন’ পি জি উডহাউস, জ্যাক লন্ডনদের বইও ছাপত। তারপর চার্লস বুন একদিন বুঝলেন, রোমান্টিক ফিকশনের বিক্রির ধারেকাছে আর কিস্যু নেই! ব্যস, সাহিত্যের প্রকাশ পরের দিন থেকেই বন্ধ!

সূত্র: এবেলা