থমকে

শাফিনূর শাফিন

না, এটি সেই রাজার প্রাসাদে বন্দী কোন রঞ্জন নন্দিনীর গল্প নয়। এটি শুধুই রঞ্জনের গল্প। জাগতিক সকল আকাঙ্ক্ষা, উন্নাসিকতা, অদেখা নিত্য হরেকরকম মৃত্যু নিয়ে যে ডুবে থাকে কাগজের ফসিলের ভেতর! রঞ্জন আমাকে কিংবা আমি রঞ্জনকে দেখেছি সে-ই ছোট্ট বেলায়। না, সে আমার বাল্যসখা ছিলনা। সে ছিল আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু। সে বাসায় আসতো বিকেলে। আর ঠিক ঐ সময়টাতেই আমিও যেতাম পাড়ার পিচ্চিদের সাথে খেলতে। এই আসা-যাওয়ার পথে দুজনের দেখা হত। এবং সেই দেখা না দেখার মতোই ছিল। সে দেখেনি ফ্রকপরা উড়ে যাওয়া ছোট্ট মেয়েটাকে আর আমি দেখিনি ভাল্লুকের মতো, হেলে দুলে হেঁটে আসা ভারি কাঁচের চশমা চোখে মানুষটাকে!

চুপসানো স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল আর শ্যাওলা পড়া কালো সিঁড়িটা যেন অন্ধকার কানাগলির কথাই মনে করিয়ে দেয়। মিষ্টির দোকানের ভেতরে শেষ মাথায় নানা কিসিমের চোখ আর চিনির বাসি সিরার গন্ধ উপেক্ষা করে কালো সিঁড়ি বেঁয়ে আর ঐ চুপসানো দেয়াল ধরে সোজা দোতলায় রঞ্জনের ঘর। পুরনো কাঠের মেঝেওয়ালা ঘরটা যেন সিনবাদের জাহাজ,ঝড়ের সাথে লড়ছে। সেই জাহাজের মেঝে-জুড়ে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে আছে শত শত বই আর পত্রিকা। কাঠের মেঝেতে কান না পাতলেও শোনা যায় হরেক মানুষের কথা বলা, কাঠের সন্ধির ফাঁকে চোখ রাখলে দেখা যায় মানুষের ভঙ্গির হাজারো গল্প! ঠিক এখানে রঞ্জন থমকে ছিল তিন বছর। তিন বছরের মধ্যে রঞ্জনরা সেই কাঠের মেঝের ঘর ছেড়ে দিয়েছে, এর মধ্যে দুবার বাসা বদল, এরই মধ্যে শিবদাসের সব তত্ত্ব ভুল এই তর্কে পার্টির ভাঙন, প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ। এরমধ্যে এক দেবশিশুর মৃত্যু রঞ্জনকে তার স্বপ্নের জগত থেকে একটানে মাটিতে নামিয়ে আনে- আর ধীর পায়ে পাথরঘাটার গির্জায় শুয়ে থাকা কবরের ফলকগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে যায়, দেওয়ান হাটের এক টিনের ঘরে কলাপাতা রঙের শাড়ি পড়া মেয়েটি বলেছিল, “ভাই,আপনি কিছু না করেন কিন্তু দশটা মিনিট এখানে বসে যান। নইলে আমি টাকা পাব না!” সেইসময় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো পাশের রুমে কার যেন অনবরত চায়ের কাপে টুং টাং চামচ নাড়ার শব্দের আড়ালে মেয়েটির শান্ত, পরিত্যাক্ত মুখে রঞ্জন এক তেজালো আলো দেখেছিলো! তার মনে পড়ে যায় জীবনের যত নিরুপায় ব্যথাতুর মুখ, পড়ে থাকা কান্নার দলের গলায় উঠে আসা। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একদিন তিন বছর পর রঞ্জন হাতের বইটিকে একদিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নেমে আসে রাস্তায়। সে হারিয়ে যেতে থাকে এক অলীক রাস্তা ধরে…

Untitled-1