বিরাট কাহিনি

ডেস্ক : নিজেকে নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথাটা বেশ অভিনব। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশাও তো সামলাতে হয় আপনাকে। আর রোজই সেই প্রত্যাশার স্তরটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ক্রিকেট মাঠে গর্জনটাই তো এখন বিরাট কোহলিকে নিয়ে। আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?কীভাবে দেখছেন এই কোহলি-ম্যানিয়াকে?
কোহলি: ব্যাপারটা খুব সহজ, বলব না। বিশেষ করে আমাদের দেশে প্রচুর লোকে ক্রিকেট খেলাটা নিয়ে ডুবে থাকে। প্রচুর লোকে মাঠে আসে খেলা দেখতে বা ক্রিকেটারদের মন দিয়ে ফলো করে। তাদের পারফরম্যান্সের ওপর অনেক মানুষের আবেগ আর প্রতিক্রিয়া জড়িয়ে থাকে। আমি এটা নিয়েও পজিটিভ দিকটা দেখার চেষ্টা করছি। দেখুন, কেউ আপনাকে ভালবাসবে, কেউ ভালবাসবে না। কেউ পছন্দ করবে, কেউ করবে না। সেটাই জগতের নিয়ম। কিছু লোক থাকবে যাদের সঙ্গে আমি খুব সহজেই কানেক্ট করতে পারব। তেমনই কিছু লোকের সঙ্গে আমার মিলবে না। আমি ক্রিকেট খেলার মধ্যে দিয়ে মানুষের যে ভালবাসাটা পাচ্ছি, সেটাকে সম্মান করার চেষ্টা করি। আমার কেরিয়ারের শেষে যখন ক্রিকেট থাকবে না তখন এই ভালবাসা বা প্রশংসাটা আর আমি পাব না। তখন আমিও এই আনন্দটা দিতে পারব না। তাই ক্রিকেট থাকতে থাকতে যদি দেখি কিছু সংখ্যক মানুষকে হলেও আনন্দ দিতে পারছি, তাঁদের কোনওভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারছি, তাহলে আমার ভাল লাগবে।

কিন্তু এই প্রত্যাশা তো একটা চাপও তৈরি করে। সেটাকে কীভাবে সামলাচ্ছেন?
কোহলি: প্রত্যাশা…আহ্! প্রত্যাশা সামলানোর সেরা উপায় হচ্ছে সেটা নিয়ে না ভাবা। যদি মাঠে নামার আগে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে ভাবি যে, পঞ্চাশ হাজার লোক আমার সাফল্য দেখতে এসেছে, তাহলে সেটা মাথার ওপর বোঝা হয়ে চাপবে। আমার পলিসি তাই অন্যরকম। আমার মত হচ্ছে, পঞ্চাশ হাজার মানুষকে নিয়ে তক্ষুনি ভেবো না। বরং ভাবো পনেরোজনকে নিয়ে। সেই পনেরোজন যারা তোমার ড্রেসিংরুম-সঙ্গী। যারা তোমার মতোই কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে প্রত্যেকদিন বিজয়ীর অনুভূতিটা পাওয়ার জন্য। আমার মনে হয়, টিম স্পোর্টে এর চেয়ে বড় মোটিভেশন আর কিছু হয় না। সতীর্থের জন্য খেলো, একে অন্যের জন্য খেলো, জেতার জন্য খেলো— এটাই আমার সর্বসেরা ক্রিকেট মন্ত্র মনে হয়েছে। আমার মনে হয় এই মন্ত্র অনুসরণ করতে পারলে টিমম্যান হিসাবে যেমন সফল হওয়া যায়, তেমন ব্যক্তিগত স্তরেও সাফল্য আসে।

বাঁহাতের ওরকম গুরুতর চোট নিয়ে কী করে আপনি খেলে গেলেন, সেটা এখনও অনেকের কাছে বিস্ময়। ইডেনে যেদিন আপনি চিরে যাওয়া হাতে টেপ লাগিয়ে খেলে টিমকে জিতিয়ে দিলেন, অনেকে বুঝতেই পারেনি, চোট কতটা গুরুতর। এতটাই স্বাভাবিক ব্যাটিং করছেন বলে মনে হচ্ছিল বাইরে থেকে। আইপিএলের হয়তো সেরা দৃশ্যই হয়ে থাকল সেঞ্চুরি করে ডাগআউটের দিকে তাকিয়ে চোট পাওয়া বাঁহাতের দিকে বারবার ইঙ্গিত করা। কীভাবে যন্ত্রণা উপেক্ষা করে খেললেন, সেঞ্চুরি করে গেলেন, এটা শুধু আমার নয়, ভারতীয় জনতারই প্রশ্ন।
কোহলি: সত্যি কথা বলতে কী, আমি এই চোটের ব্যাপারটা একদম হাইলাইটই করতে চাইনি। জানি না কীভাবে অত রাতেও হাসপাতালে লোকে পৌঁছে গিয়েছিল। নিজের কীর্তি ফলাও করে দেখিয়ে তো লাভ নেই। যদি সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকি যে, চোট নিয়েই খেলবে, তাহলে যাও মাঠে নেমে খেলো। এত ঢাক পেটানোর তো কিছু নেই। আমার চোটটা কতটা গভীর তা বারবার বলার দরকার নেই।

কিন্তু বিরাট, যদি আর একটু চাপাচাপি করতে পারি জানার জন্য যে, হাতের চোটটা প্রথম যখন দেখলেন, কী মনে হয়েছিল? আপনারই টিমের কারও কারও থেকে শুনছি, ভয়াবহ অবস্থা ছিল।
কোহলি: প্রথম যখন হাতের কাটা জায়গাটা দেখেছিলাম, খারাপ অবস্থা ছিল। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল দেখে। টিমের আমাকে দরকার ছিল। কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোরটা তাড়া করার জন্য আমার ব্যাট করার দরকার ছিল। আমার টিম আমার দিকে তাকিয়ে। আর তখনই কি না এরকম চোট লাগল! ক্ষণিকের জন্য মুষড়ে পড়েছিলাম। আমি জানতাম, ওদের স্পিনাররা কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করবে। আমি ব্যাট করতে পারলে স্পিনারদের খেলে দিতে পারব। এরকম একটা প্রয়োজনের মুহূর্তে আমার টিমকে ছেড়ে চলে যেতে চাইনি। তাই সিদ্ধান্ত নিই, ম্যাচের পর যা হবে দেখা যাবে। ব্যাট করতে নামব।

কীভাবে নামলেন? বাঁহাতে চোট মানে ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ঢাল, তরোয়াল সব।
কোহলি: ফিজিওকে আমি জিজ্ঞেস করি, চোটের জায়গাটা টেপ করে আমি ব্যাট করতে নামতে পারি কি না? ফিজিওকে ধন্যবাদ, উনি বলেছিলেন হ্যাঁ, চেষ্টা করা যেতে পারে। টেপিংটা করার পর আমিও স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলাম। একটা ভাল ব্যাপার ছিল যে, খুব বেশি রক্ত বেরোচ্ছিল না। টেপ লাগিয়ে তাই ম্যানেজ করা গেল। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, টেপ লাগিয়ে মাঠে যখন নামলাম ব্যাট করতে, খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল না। তাতে উপকার হয়েছিল। বহির্বিশ্বের কাছে হয়তো মনে হচ্ছিল, আমি সাংঘাতিক কোনও ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলছি। আমার কাছে কিন্তু বিশাল কোনও সিদ্ধান্ত ছিল না এটা।

কেন? বিশাল সিদ্ধান্ত নয় কেন? এরকম চোট নিয়ে খেলাটা তো নিশ্চয়ই নর্ম্যাল ব্যাপার নয়?
কোহলি: আর কোনও অপশনও তো নেই, তাই না? হাতে যদি যন্ত্রণাও হতো তাহলেও আমি মাঠে নেমে আমার সেরা চেষ্টাটা করতাম। হয়তো তখন ফলটা অন্যরকম হতে পারত। মারতে গিয়ে আমি আউট হয়ে যেতে পারতাম। তবুও ডাগআউটে বসে থাকতাম না। মাঠে নেমে দলের কাজে আসার চেষ্টা করতাম।

বিরাট কোহলির কাছে এটাই কি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়? টিমের প্রয়োজন অর্থাৎ বাকি সব ভুলে যাও। ঝাঁপিয়ে পড়ো টিমকে সুরক্ষিত করার জন্য?
কোহলি: আমার কাছে টিমের প্রয়োজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই। টিমের সময় যখন খারাপ যায়, তখন হাল ছেড়ে দেওয়াটা খুব সহজ। কেউ তো এটা ধরে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেই পারে যে, ধুর, আর কিছু হবে না। আমরা ছিটকেই গিয়েছি। কিন্তু আমি কঠিন পরিস্থিতিতে হার মেনে নেওয়া, হাল ছেড়ে দেওয়া স্পোর্টসম্যান হতে চাইনি কখনও। ভিজুয়্যালাইজ করেছি যে, আমি উদাহরণ হব। কঠিন মুহূর্ত থেকে আমার টিমকে টেনে তুলব। অন্ধকারে পড়লে সেটা থেকে বার করে এনে আলোয় ফেরাব। যদি স্পোর্টসম্যান হিসাবে আপনার চোখে স্বপ্ন থাকে, তাহলে এই জিনিসগুলো আপনি করতে চাইবেন। আর আমি সবসময় মেনে এসেছি যে, অন্যদের বলার চেয়ে উদাহরণটা নিজে রাখো। আমি কাকে গিয়ে বলব যে, অ্যাই মাঠে নেমে কাজটা করে এসো। কেনই বা বলব সেটা? তার চেয়ে আমি নিজে মাঠে নেমে কাজটা করে আসার চেষ্টা করব। তাতেই তো সবচেয়ে ভাল উদাহরণ তৈরি করা যেতে পারে। ইডেনের সেই ম্যাচে আমার মনে হয়েছিল, যদি আমি নেমে একটা অর্থপূর্ণ অবদান রাখতে পারি টিমের জন্য আর যদি আমরা এখানে জিততে পারি, তাহলে কে বলতে পারে এখান থেকেই আরসিবি দারুণভাবে আইপিএলের দৌড়ে ফিরে আসবে না? আমি জানতাম, ইডেনে যদি জিতি টিমটা আবার গতি পেয়ে যাবে। আবার ছুটতে শুরু করবে। ব্যাট করতে নামার সিদ্ধান্তটা নিতে তাই বিশেষ ভাবতেই হয়নি।

আইপিএলে যেভাবে নক-আউট হয়ে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে আরসিবি প্রত্যেকটা ম্যাচ নক-আউটের মতো খেলে ফিরে এসেছিল, সেটা দেখে ক্যাপ্টেন হিসাবে কতটা তৃপ্তি পাচ্ছিলেন?
কোহলি: অবশ্যই খুবই তৃপ্তিদায়ক। আইপিএল এমন একটা টুর্নামেন্ট যেখানে খুব তাড়াতাড়ি একটা টিম গতি হারিয়ে ফেলতে পারে। আর একবার গতিটা হারিয়ে ফেললে ফিরে পাওয়া কঠিন। ওই কারণে আইপিএলে ‘মোমেন্টাম’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইপিএলে সবাই ভাল টিম। তারা বিশেষ কোনও সুযোগই দেবে না ভুল করেও ছাড় পেয়ে যাওয়ার। এরকম পরিস্থিতিতে অন্যরকম কিছু ভাবতে হবে। আউট অফ দ্য বক্স কিছু করতে হবে। আমরা সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটা ব্যাপার চেষ্টা করেছিলাম। আমরা যেমন কঠিন সময়টা পেরনোর জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য রেখেছিলাম। খুব দূরের বা খুব বড় লক্ষ্য রাখিনি। তাতে আরও চাপ বেড়ে যেতে পারত। অন্য টিম বা অন্য টিমের ভাল ক্রিকেটারদের নিয়ে বেশি না ভেবে নিজেরা কী করতে পারি, সেটার ওপর জোর দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, এটা আইপিএলের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় অনেকে প্রতিপক্ষকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তায় ডুবে থাকে। ওদের টিমের অমুককে কীভাবে আউট করব বা সেই টিমের তমুক বোলারকে কীভাবে খেলব। সেটা করতে গিয়ে নিজেদের টিম নিয়ে যে প্রক্রিয়াটা, সেটা সম্পূর্ণ গুলিয়ে যায়। আর তত একটা টিম তার ফোকাস থেকে সরে যেতে থাকে। ভাবুন তো নিজের টিমের মধ্যে কতকিছু ঘটতে পারে? দুই তরুণ ক্রিকেটারের মধ্যে হয়তো লড়াই চলছে প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়ার জন্য। আরও কত কিছু ব্যাপার থাকতে পারে। সে সব নিয়ে না ভেবে যদি কেউ অন্য টিমকে নিয়ে ভেবে সময় কাটিয়ে, তাহলে নিজের টিম অবহেলিত হবে। আমার মত হচ্ছে, তার চেয়ে আগে নিজের টিমের ওপর ফোকাস করো। ভাবনাটা যদি নিজের টিম-কেন্দ্রিক হয়, তাহলে যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভাল করার সিস্টেমটা তৈরি হবে। টিমের একজন সদস্য হিসাবে যে কারও প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে খুঁজে বার করা যে, টিম আমার থেকে কী চায়। আরসিবি’তে এবারের আইপিএলে যখন আমাদের খারাপ সময় যাচ্ছিল, হারতে হারতে যখন প্রায় ছিটকেই গিয়েছিলাম আমরা, তখন এই দর্শন মেনে চলতে চেয়েছি। সৌভাগ্যবশত, গোটা টিম একইভাবে ভাবছিল। সকলে ইতিবাচক ছিল যে, পরিস্থিতি ঘুরবেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। এটুকু আমি বুঝেছি যে, যদি গোটা টিম এককাট্টা হয়ে একটা লক্ষ্যে পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখে, তাহলে বেশিবার সফল হয়েই ফিরবে। সূত্র: এবেলা/সুমিত ঘোষ