শেখ মোরশেদ আহমেদ আলোকিত আত্মার নান্দনিক মানুষ

আলী প্রয়াস

জীবনের খুব কাছ থেকে দেখা এক প্রজ্ঞাময় মানুষের নাম শেখ মোরশেদ আহমেদ। অসাধারণ ক্ষণজন্মা প্রতিভার নিয়ে তিনি এসেছিলেন এ পৃথিবীতে।  ২০১৪ সালের ৩জুন তিনি স্ট্রোকে মারা যান। তাঁর আচমকা মৃত্যু চট্টগ্রাম শহরের সাহিত্য ও সংগীত পাড়ায় এনে দিয়েছিল শোকের ছায়া। কারণ শেখ রেমোরশেদ নিদারুন আড্ডাবাজ, অসাধারণ বন্ধুবৎসল ও মানবপ্রেমি আন্তরিক মানুষ ছিলেন।কক্সবাজার জেলার দ্বীপকন্যা কুতুবদিয়া উপজেলার আলি আকবর ডেইল ইউনিয়নে শেখ মোরশেদ আহমেদ এর জন্ম। তাঁর পিতার নাম শেখ মকবুল আহমেদ, আর মাতা ফরিদা খানম। পেশাগত জীবনে তিনি আইনজীবী হলেও অনেকগুলো গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। বহুমাত্রিক এ প্রতিভাবান একাধারে কবি,  গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। ছোট বেলা থেকেই সংগীতে মনযোগী এ মানুষটি পরবর্তীতে রেডিও টিভিতে গীতিকার,  সুরকার ও সংগীত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। কেননা গানের প্রতি তার অন্যরকম নৈবেদ্যই তাঁকে এ প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল।

13349191_1277341738961975_234878775_n13384875_1277341828961966_1974880414_nশেখ মোরশেদ ১৯৯৭ সালে প্রথম বেতাররের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৭ সালে বেতারে ও ২০০৮ সালে টেলিভিশনে তালিকাভূক্ত গীতিকার হন এবং তৎপরবর্তী সময়ে বেতারের সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। শেখ মোরশেদ জীবদ্দশায় প্রায় দুই শতাধিক গান লিখেন, শতাধিক গানে কণ্ঠ দেন এবং অসংখ্য গানের সুর করেন। বেতার ও টেলিভিশনে অসংখ্যবার একক সংগীতানুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। ২০১২ সালে বেসরকারি চ্যানেল মোহনা ১ঘন্টার সরাসরি সংগীত অনুষ্ঠানে আয়োজন করে। সর্বশেষ গত ২৬ অক্টোবর ২০১৩ সংগীতজ্ঞ মান্না দে মৃত্যুর পরদিন চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনিষ্টিটিউটে তাঁর একক সংগীত আয়োজন ‘সুর ঝরা সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে দর্শক-শ্রোতা নন্দিত হয়েছিল।

ছোটবেলা থেকেই শেখ মোরশেদ আহমেদ সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। মাধ্যমিক স্কুলে থাকতেই গান ও কবিতা লিখতে শুরু করেন। মাধ্যমিক পেরিয়ে তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গান নিয়মিত ভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মজ ময়ূখ’ এর প্রথম খণ্ড, ২০১১ সালে বের হয় দ্বিতীয় খণ্ড। শেখ মোরশেদের সাহিত্য কর্ম সংক্ষিপÍ হলেও এর সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মজ ময়ূখ’ বাংলাদেশের সাহিত্যে অনন্য সংযোজন। লেখকের আত্মজাত আলোকস্নাত আধ্যাত্মিক যৌনতার এ উপন্যাস বিশ্বের আদিতম রসের উৎসার, নর-নারীর যৌনানুভূতি ও চিরনানন্দের এমন এক প্রতীকধর্মী কাহিনী, যার তুলনা বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত কিনা জানিনা তবে বিরল বৈকি!

উত্তম পুরুষের জবানীতে লেখা এ বইটিতে কাহিনীর চেয়ে লেখকের অর্ন্তনিহিত নিজস্ব ভাবদর্শনের নৈয়ায়িক সতততার শক্তিমান প্রকাশ লক্ষণীয়। এখানে ধমর্, দর্শন ও বাস্তবতার অতুল প্রশংসনীয় সমন্বয় প্রাজ্ঞ পাঠকজনের ঐকান্তিক মনোযোগিতার দাবী করে। কাহিনী ও বক্তব্যে, শব্দচয়ন ও বাক্যগঠন রীতিতে লেখকের নিগূঢ় চিন্তনের সাবলীল প্রবাহে একটি ভিন্ন ও নতুন কাব্যিক শৈলীর চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন। উপন্যাসে ‘ঘটনার ঘনঘটা’ না থাকলেও ‘বর্ণনার ছটা’ রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণেই। তবে এ বর্ণনা যটতা বস্তু জগতের তার চেয়ে বেশি নির্বস্তু মনোজগতের। অনেকটা ‘স্ট্রীম অব কনশাসনেস’ বা চৈতন্যপ্রবাহ অনুসারী ভাষা শৈলীই এ গ্রন্থের প্রধান ভাব সম্পদ। লেখক সত্যই যেন তার আত্মাকে নিংড়ে অনুপম রসধারায় সম্মৃদ্ধ এ ভাষা নির্মাণ করেছেন যার গুণে পুরো উপন্যাসটাই হয়ে ওঠেছে যেন এক পাঠ ও শ্রুতিসুখকর গদ্য কবিতা।

সর্বশেষ তাঁর লেখা ‘ভালোবাসার তিন পেয়ালা’ উপন্যাসের আংশিক প্রকাশিত হয় দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার ২০১৩ সালের ঈদসংখ্যায়। তিনি যত বড় প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন তত পরিমাণ সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেননি। জাগতিক নানা কর্ম ব্যস্ততার কারণে সাহিত্যের প্রতি খুব বেশি মনোযোগী হতে না পারার কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেকগুলো গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেন নি। তার অসমাপ্ত উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-‘উরুসন্ধির মোহনা’, ‘কাকতাড়–য়ার গল্প’ ‘মুক্তিনামা’ ইত্যাদি।

শেখ মোরশেদ আহমেদ উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ ও পরিবেশ রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক ও আলি আকবর ডেইল নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে উপকূলবাসীর জীবন সংগ্রামের একজন সহযোদ্ধা ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও চট্টগ্রাম গীতিকবি সংসদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া চট্টগ্রাম আইনজীবি সাংস্কৃতিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকও  ছিলেন। সারাজীবন মানুষের সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত শেখ মোরশেদ আহমেদ বিভিন্ন সংগঠনের পুরষ্কার ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে  সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করলেও নিজে এসবের প্রতি ছিলেন উদাসিন। তবু মৃত্যুর আগে  তিনি ‘আনন্দ সাংস্কৃতিক অঙ্গন পুরষ্কার ২০১০’ ও ‘মূল্যায়ন  সাহিত্য ও সংগীত সম্মাননা ২০১১’ এ ভূষিত হন।

একজন মানুষ শেখ মোরশেদ প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও স্রষ্টার অনুধ্যানী প্রত্যয়দীপ্ত যুবক ছিলেন। জীবনে চিরায়ত, যাপনে স্বকীয় ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বে ধ্রুপদী ও ডায়ানামিক পুরুষ ছিলেন। অত্যন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর, উদ্যোমী, কর্মচঞ্চল এবং দ্রোহী মানসের অধিকারী শেখ মোরশেদ অত্যধিক সৌখিন, ব্যক্তিত্ববান, স্বপ্নবাদী মানুষ হিসেবে সর্বদা থাকতেন প্রাণোচ্ছ্বল। তাঁর চলনে বলনে নিজস্ব ঢং ও সুরুচিবোধ, পরিচ্ছদের আধুনিক স্টাইল সহজেই মানুষের নজর কাড়তো। স্বনির্মিত জীবনদর্শনের যৌক্তিক পথের চিন্তাশীল পদক্ষেপে শেখ মোরশেদ নিজেকে চিনিয়ে দিতেন যে তিনি অপেক্ষাকৃত ধীশক্তি সম্পন্ন, বিচক্ষণ ও মৌলিক। তাঁর চোখে-মুখে ও কথার জাদুতে এমনই এক সম্মোহনী শক্তি ছিল যাতে মানুষ সহজেই তাঁর অনুরক্ত হয়ে যেতেন। প্রাণবন্ত হাসির সরসতা লেগে থাকত সর্বক্ষণ। জীবন ও জগতের প্রতি শেখ মোরশেদ নিয়মানুবর্তী থাকলেও তিনি নিজের প্রতি ছিলেন প্রচ- খামখেয়ালি, উদাসিন লেখক ছিলেন বলেই হয়তো তিনি অতি আবেগি ও প্রাণচঞ্চল। তাঁর মনোদৈহিক সংবেদনশীলতার কারণেই তিনি ছিলেন আমৃত্যু প্রেমিকমানুষ।

আমাদের আবেগে তুমুল ধাক্কা দিয়ে বহুরৈখিক সময়যাপনে নিমগ্ন থাকা এ মানুষটির চলে যাওয়া আমাকে বার বার পীড়া দেয়। দিনটি এলেই মর্মন্তুদ কষ্ট অনুভব করি, রক্তক্ষরণে জর্জরিত হয়। আপনি নেই তবু আমার স্মৃতিকাশে আপনি আপন আলোয় অবিনশ্বর।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*