‘কবিতা জীবনের জলছাপ’

সৈয়দ শিশিরের জন্ম ১৯৭৭ সালের ২৩ জুলাই। বাবা সৈয়দ মঞ্জুরুল হামিদ, মাতা মরহুমা ফাতেমা বেগম। পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়সূতী গ্রামে। ২০০৮ সালে প্রকাশ হয় তার প্রথম কাব্য ‘আমি তার, যে আমার’। কবিতার পাশাপাশি লিখছেন প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কলাম, সাহিত্য সমালোচনা, গল্প ও ছড়া। সম্পাদনা করতেন ছোটকাগজ ‘অবিশঙ্ক প্রতীতি’, তারপর ‘আড়াইলেন’।  পেশায় সাংবাদিক সৈয়দ শিশির বর্তমানে পাঠকপ্রিয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রবচনগুচ্ছ’। তিনি  কথা বলেন তার লেখালেখি ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা নিয়ে –

আপনার লেখালেখির শুরু কীভাবে?

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় আট-দশ লাইনের একটা কবিতা লিখলাম। কবিতাটি লেখার পরে এর শব্দার্থও লিখলাম। বাড়ির সবাই অবাক হলেন, খুশি হলেন, উৎসাহ দিলেন। দ্বিতীয় পর্বের সূচনা নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। তখন হঠাৎ করেই মনে হলো আমি ইচ্ছা করলে ভালো লিখতে পারব। তখন শুরু হলো কবিতার পাশাপাশি গল্প, সচেতনতামূলক নাটক ও ছড়া লেখা। তৃতীয় পর্বের শুরু এসএসসি পাশের পর, যখন ঢাকা কমার্স কলেজে ভর্তি হই। সেই থেকে যে ছুটে চলা, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকানোর সময় হয়নি। বলা যায়, এভাবেই মূলত আমি সিরিয়াসলি লেখালেখির বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করি এবং শেষ পর্যন্ত কবিতাকেই গ্রহণ করি সিরিয়াসলি।

16299314_1390233787702019_8889806720640739722_nলেখালেখি করেন কেন?

লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। লেখকের ভাবনা ও স্বপ্নবুনন পাঠকের অন্তরকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। আসলে লেখালেখি আমাকে তৃপ্তি দেয়। তাছাড়া লেখকের কলমের সম্মোহনী শক্তির কারণে দিকভ্রান্ত জাতি সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারে- এমন ভাবনা থেকেও লেখালেখি করি। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, না লিখে সময় কাটে না বলেই লিখি। অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে এই কাজটাই কিছুটা শিখেছি, তাই লিখি। ভাষা, ভাবনা, আর সাহিত্যের প্রেমে পড়েছি বলেও লেখালেখি করি। আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে পাঠকমনে ছড়িয়ে দিতে চাই বলেও লেখালেখি করি ।

নিজের লেখা কবিতা সম্বন্ধে মন্তব্য কী?

কবিতা আমাকে যা দিয়েছে এবং আমার কাছ থেকে যা নিয়েছে তা আর কোনো মাধ্যমেই সম্ভব হয় নি। অনেকেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, প্রতারণা করেছে কিন্তু কবিতা আমাকে কখনো ছেড়ে যায় নি, প্রতারণাও করে নি। আমার কবিতা আমার জীবনের জলছাপ; আমার জীবনের ছায়া। আমার কবিতা আমার মতোই।

আপনি মূলত কবি হলেও এবারের বইমেলায় ‘প্রবচনগুচ্ছ’ আনলেন কেন?

কবিতার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া- এসব লিখতে লিখতেই প্রবচন লেখার আগ্রহ জন্মায় মনে। বিশ্বসাহিত্যে খুব সামান্য প্রচলন থাকলেও শুধু প্রবচনের জন্য বাংলা ভাষায় প্রবচন লেখা হয়েছে খুবই কম। অবশ্য প্রবচন লেখা সহজ কোনো কাজ নয়। বলতে হয়, প্রবচন ব্যক্তির প্রগাঢ় জ্ঞান বা অভিজ্ঞতাজাত ব্যক্তিগত সৃষ্টি। এ বিষয়ে প্রচুর মেধা খাটাতে হয়। এ দেশে সম্ভবত হুমায়ুন আজাদই সচেতনভাবে প্রথম প্রবচন লিখেছেন। তার লেখা প্রবচন পাঠের পরই আমার মনে এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল। তাই এ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই কাজ করছিলাম এবং এবারের মেলায় এ নিয়ে একটি বই পাঠকের হাতে তুলে দিলাম। প্রবচনগুলোতে সমাজে বিদ্যমান নানা অসঙ্গতি তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছি। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আক্রমণ করা হয়নি। লৌকিক-অলৌকিকের সীমারেখা পেরিয়ে প্রবচনগুলো অন্য পৃথিবীর সন্ধান দেবে বলেই বিশ্বাস করি।

এবারের বইমেলায় কোনো অব্যবস্থাপনা নজরে পড়েছে কি?

বইমেলা শুরুর আগে এর নান্দনিকতা নিয়ে বাংলা একাডেমি অনেক কথা বললেও ওই কথার সঙ্গে বাস্তবতার খুব বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ কারণে অনেকের মতো আমিও হতাশ। মেলায় মানসম্মত সাজসজ্জা হয়নি। গ্রামবাংলার মেঠোপথ ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেঁটে আসছেন এমন একটি দৃশ্যকল্প বোর্ডের মাধ্যমে তৈরি করা হলেও এর উপস্থাপনার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে বিভিন্ন গাছপালায় নান্দনিক সাজ থাকবে বলা হলেও তেমন কিছুই চোখে পড়েনি। বলা হয়েছিল মেলার নানা স্থানে বসার সুব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কয়েক জায়গায় বসার জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার দেখা গেলেও সেগুলো যে আসলে মেলায় আগতদের বসার জন্য করা হয়েছে, তা-ও বোঝা যায়নি। এদিকে বহেড়াতলার লিটলম্যাগ চত্বরেও হঠাৎ করেই এ বছর স্টলের ব্যানার, কোনোটির ব্যানার সাঁটানোর ফ্রেম ও লাইট সরবরাহ না করা হয়নি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চটি বেশ ছোট। মেলার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, হেঁটে চলার পথটিতে যে ইট বিছানো হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। অনেক প্রকাশকই নিজ খরচে ইট বসিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন বলে শুনেছি। আরেকটা বিষয় বলতেই হচ্ছে, গতবারের অমর একুশে বইমেলার পরেই অদেখা ভুবনে পাড়ি জমিয়েছেন সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী ও রফিক আজাদ। কিন্তু মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে ১২ তারিখ পর্যন্ত কোথাও দেখা যায়নি তাঁদের কোনো প্রতিকৃতি। মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান নির্লিপ্তভাবে বেমালুম ভুলে ছিলেন এই তিন বরেণ্য কবিকে! পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পর ১৩ তারিখে আয়োজক প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। যা সত্যিই দুঃখজনক।

বইমেলা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

সারা বছর লেখকরা অপেক্ষা করে থাকেন অমর একুশে বইমেলার জন্য। বই মেলায় ছুটে যাই তারুণ্যের প্রাণপ্রবাহ খুঁজতে। কারণ বাংলা একাডেমির বইমেলা মানেই এক ধরনের ঘনবদ্ধ শিহরণ। কিন্তু একটা সড়ক যখন সেই একক মেলাটিকে ভাগ করে ফেলে তা ভেবে মনে কষ্ট পাই। পুরো রাস্তাকে জড়িয়ে মাঝখানে কোনো ফাঁকা আর শ্রেণী বিভাজন না রেখে অখণ্ড একটা মেলা করতে পারলে ভালো হয়।

আমি মনে করি, বইমেলা হওয়া দরকার আকর্ষণীয়। ধুলাবালিমুক্ত পরিবেশ, নির্দিষ্ট দূরত্বে ডাস্টবিন, হাঁটা আর বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, টয়লেট ফ্যাসিলিটি থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া বইমেলা থাকা চাই- চা-কফির স্টলে তুমুল আড্ডার সুযোগ। যেখানে রাজনীতি নয়, থাকবে শুধু বইয়ের কথা।

বইমেলায় কেমন বই পেতে চান?

একটি ভালো বই সঠিক পথ চলার বন্ধু। ভালো বই পথ-প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। তাই বইমেলায় ভালো বই পেতে চাই। চাই মানসম্পন্ন বই প্রকাশ। যেহেতু ভালো বই পাঠককে আনন্দ দেয়, দেয় প্রশান্তি। অবশ্য আমাদের দেশে ‘মান’ শব্দটা অনেকটাই আপেক্ষিক। কিন্তু একথা সত্য যে, বইমেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য বই বের হলেও বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এতসংখ্যক বইয়ের মধ্যে মাত্র এক শ থেকে দেড় শ বই মানসম্মত। মান যে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, এটা একটা বড় সমস্যা। প্রসঙ্গত, বিদেশে মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে, প্রকাশকদের সম্পাদনা পরিষদ আছে, ভাষা সম্পাদন করা হয়, পরিমার্জন করা হয়; কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় মান যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।

বইমেলায় নতুন লেখকরা কতটা সুযোগ পাচ্ছেন?

আমাদের দেশে প্রতিবছর সৃজনশীল বইয়ের সিংহভাগ প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করেই। জনপ্রিয় এবং প্রবীন লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখকরাও প্রথাগতভাবে বইমেলাতেই তাদের বইটি প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিচিত লেখকদের পাশাপাশি এই বইমেলায় নতুন বা অপেক্ষাকৃত নতুন লেখকেরা কতটা উঠে আসতে পারছেন?

আসলে, বাংলাদেশের নতুন লেখকদের কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন, প্রকাশকরা তার পেছনেই বেশি ছুটছেন, যাদের বই বেশি কাটতি হয়। নতুনদের বই এবং লেখকের নামের সাথে বই সম্পর্কে কিছুটা তথ্য যদি পাঠকদের জানানো যায় তাহলে হয়তো পাঠকদের নতুন লেখকদের সম্পর্কে আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে নতুন লেখকদের মানহীন বই কিনে অনেক সময় পাঠকেরা প্রতারিত হচ্ছেন এবং নতুন লেখকদের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন বলেও শোনা যায়। প্রকাশকের দায়িত্ব ভালো পাণ্ডুলিপি বেছে বই বের করা। কিন্তু নতুন লেখক, বিশেষ করে প্রবাসী লেখকদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে মানহীন বই প্রকাশের প্রবণতা জাতির জন্য খুব দুঃখজনক।

নবীন লেখকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

দুঃখিত, আমার খুব হাসি পেল। আচ্ছা, আমি কি প্রবীণ হয়ে গেছি? আমি কি এখনও নবীন নই- অন্তত জ্ঞানের সাগরে? তাছাড়া আজকাল কোনো লেখকই পরামর্শের তোয়াক্কা করেন না। তবুও বলছি, প্রচুর পড়তে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে। লিখতে গিয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। লেখা প্রকাশের লোভ সামলে লেখাটিকে পরিণত ও পরিপক্ক হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। বই প্রকাশের জন্য অস্থির হওয়ার কিছু নেই। লেখক হতে না পারলে বই প্রকাশ করে লাভ কী? আজকাল তো অনেকে টাকা দিয়ে লেখা কিনেও নিজের নামে বই প্রকাশ করছে! তাতে কি কেউ প্রকৃতঅর্থে লেখক হতে পারেন?

মেলায় বইয়ের ক্রেতা-বিক্রেতা- সবার প্রতি আপনার আহ্বান কী?

অমর একুশের গ্রন্থমেলাকে সুষ্ঠু ও সুন্দর এবং নান্দনিক ও সংস্কৃতিমনস্ক মেলা হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। এই মেলার মধ্য দিয়ে শুধু বইয়ের বেচা-কেনাই হয় না; বরং সংস্কৃতির একটা অগ্রযাত্রা ও বিশেষ তাৎপর্য তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি।

সাক্ষাৎকার: মাহতাব শফি

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*