হুমায়ূন স্মরণ

রায়হান উল্লাহ

আজ ১৯ জুলাই ২০১৭, বুধবার কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় এ বাঙালি ক্ষণজন্মা কথাসাহিত্যিক।
অসামান্য সাহিত্যকীর্তি, আশ্চর্যসুন্দর রচনাবলী, ঝরঝরে গদ্য, আর জীবনকে আনন্দময় করে দেখার প্রবণতায় হুমায়ূন আহমেদ চিরায়ত হয়ে আছেন বাঙালি পাঠকের হৃদয়জুড়ে।
গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা, সংগীত রচনা, চিত্রাঙ্কনসহ শিল্প-সাহিত্যের অনেক ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্যের যে ক্ষেত্রে পদচিহ্ন এঁকেছেন, সাফল্যের দেখা পেয়েছেন তার সবকটিতে। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বটে। চার দশকের বেশি সময় ধরে পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রেখেছিলেন তিনি জাদুকরি লেখনীর মাধ্যমে।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র মধ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে যাত্রা শুরু হয় তার। যদিও প্রথম লেখা উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার। সেই যাত্রা ছিল বাংলা সাহিত্যের পালাবদলের তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। একে একে প্রকাশিত হওয়া তার পরবর্তী উপন্যাসগুলো পাঠকপ্রিয়তার উত্তুঙ্গে অবস্থান করে। আমৃত্যু সেই জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভাটার টান পড়েনি।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্যে উৎসাহী বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন তিনি। মা আয়েশা ফয়েজ ছিলেন গৃহিণী।
১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দুই দশক পর তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে পূর্ণাঙ্গ যুক্ত হন।
২০১২ সালের আজকের দিনে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় হুমায়ূন আহমেদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিউইয়র্ক থেকে ২৩ জুলাই দেশে ফিরিয়ে আনা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে লাখো মানুষের অশ্রু-পুষ্পে শেষবারের মতো ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। পরের দিন তিনি সমাহিত হন তার গড়ে তোলা নন্দনকানন নুহাশপল্লীর লিচুতলায়।
১৯৭৩ সালে হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিন খানকে। হুমায়ূন ও গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলেমেয়ে। তিন মেয়ে নোভা, শীলা ও বিপাশা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। ২০০৫ সালে তাদের ৩২ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। এর পর হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে। এ দম্পতির দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাসের সংখ্যা দুই শতাধিক। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, ‘নন্দিত নরকে’, ‘লীলাবতী’, ‘কবি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘দূরে কোথায়’, ‘সৌরভ’, ‘ফেরা’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘সাজঘর’, ‘বাসর’, ‘গৌরীপুর জংশন’, ‘নৃপতি’, ‘অমানুষ’, ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘শুভ্র’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘বৃষ্টি ও মেঘমালা’, ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ প্রভৃতি।
তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালের একুশে বইমেলায়। রচনা ও পরিচালনা করেছেন বহু একক ও ধারাবাহিক নাটক। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ তার ইতিহাস নির্মাণকারী নাটক। পরিচালনা করেছেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও।
পরিচালিত চলচ্চিত্র, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’ ও ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ এবং সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র জন্য তিনি লাভ করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। দীর্ঘ চার দশকের সাহিত্যজীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার অন্যতম।
দেশের বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। জাপানের এনএইচকে টেলিভিশন তাকে নিয়ে ‘হু ইজ হু ইন এশিয়া’ শিরোনামে ১৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র প্রচার করে।
মৃত্যুর পরও হুমায়ূন আহমেদ চিরকালীন হয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যজগতে। ৩৬০টি গ্রন্থ আর নুহাশপল্লীর অবারিত সবুজের মাঝে হুমায়ূন আহমেদ সবার প্রিয় হিসেবেই বেঁচে থাকবেন।
আজকের দিনে স্মরণ করছি প্রিয় এ সাহিত্যিককে। এমন দিনে তাকে মনে পড়া সহজাত। বাংলা ভাষাভাষির অনেকেই তাকে স্মরণ করছে নানা আঙ্গিকে। তিনি বেঁচে আছেন নানা বৈচিত্রে, তার সৃষ্টিতে। তিনি দেখেছেন মধ্যবিত্তের নানা রূপ। করেছেন জীবন সংগ্রাম। জুতোর শুকতলা খুইয়েছেন প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে। পরে সেই তিনিই প্রকাশককে বাধ্য করেছেন অনেক কিছু করতে। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরে যা ছেড়েও দেন। যা ইচ্ছা করার মতো ক্ষমতাবান ছিলেন তিনি। জোছনায় ভেসেছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন। হয়েছেন পাগল, সত্যিকারের। দেখেছেন দারিদ্র, পরে কামিয়েছেন অঢেল। দেদারসে খরচ করেছেন অর্থ। দলবেধে চলতেন, কিন্তু নিজের ভুবনে ছিলেন একা, বড় একা!
দেখেছেন বাবাকে পাকিস্তানিরা মেরে ফেলতে। চরম কষ্টে মাকে সংসার যাপন করতেও দেখেছেন। পারিবারিক প্রয়োজনে অনেক কিছুই হয়েছেন যা তিনি চাননি। এর মাঝে রসায়নে ডক্টরেটও করেছেন।
মধ্যবিত্ত জীবনকে তিনি যেভাবে সাহিত্যে ধরেছেন তা অতুলনীয়। যদিও অনেক সমালোচকের কাছে তার এসব কর্ম সাহিত্য হয়নি। এ কথা তার গুটিকয়েক সাহিত্যের জন্য প্রযোজ্য। এটাও শেষ ও এর কিয়ৎ পূর্বে। এটা তিনিও জানতেন। কিন্তু যে কোনো কর্মের প্রভাবক প্রয়োজন। আর এ ভুল কর্মের জন্য প্রকাশকরাই দায়ি। আরও বেশি দায়ি কিছু পাঠক। আরও বেশি দায়ি টাকার লোভ। হুমায়ূনও মানুষ, ভুল হবেই। এখানে ভুলটা না দেখে তার অসংখ্য আলো দেখা যায়। যা সমালোচক বা অন্যরা দেখেন না। এ ভুলের মাশুলও গুনেছেন তিনি। শুধু এ ভুলের নয় এমন অনেক ভুলের মাশুল গুনেছেন হুমায়ূন। অন্য সময়ে এসব বলা যাবে।
হুমায়ূন দেখিয়েছেন ঝরঝরে গদ্য কাকে বলে। ভিন্ন বাঁকে কথা যেভাবে যায় যাক; বলে কয়ে আবার ফিরে আসা চাই। এটা প্রকৃষ্ট দেখিয়েছেন হুমায়ূন।
যারা বলেন তার দ্বারা সাহিত্য হয়নি বা সস্তা লেখক তিনি। তারা ঠিক তার অনেক লেখা পড়েননি। বিশেষ করে প্রথম ও মাঝামাঝি সময়ের লেখা। প্রকৃতই যা মহান হয়ে উঠেছে এমন কতক লেখা-নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমনি, এইসব দিনরাত্রি, সৌরভ, বাসর, অন্যদিন, ১৯৭১, ফেরা, অচিনপুর, নির্বাসন, জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহৃ, মাতাল হাওয়া, বাদশাহ নামদার ও দেয়াল।
বাংলা সাহিত্যে শরতের পর হুমায়ূন এমনি এমনি জনপ্রিয় হননি। হুমায়ূন যদি সাহিত্য না সৃষ্টি করে থাকেন তবে শরৎ কী করেছেন? বাদ থাকুক এ প্রসঙ্গ।
হুমায়ূন বাস্তব জীবনের অনেক রূপ দেখেছেন। ভালোবাসার হাহাকার দেখেছেন। নিজেও কম দেখাননি। তাই বলা যায় সব রহস্য। সর্বশেষ মৃত্যুর পরে কবর দেয়া নিয়ে টানাহেচরাও এ রহস্যের অংশ। তার জীবনে ভুল ছিল। আর ভুল ছিল বলেই আমরা এমন হুমায়ূনকে পেয়েছি।
তার জীবনের অনেক অংশ নিজ সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে যায় না। তা ভালোই বুঝেছিলেন হুমায়ূন। শেষ সময়ে বেশি করে বুঝেছেন। এসব পাওয়া যায় সর্বশেষ কিছু লেখায়। ভালোবাসায় কাতর হয়েছেন, কিন্তু একান্ত অনেক হাত; হাতের পরশে পাননি। এও কি একটা শাস্তি নয়!
আজ এ গুণীর মৃত্যুদিন। মনে পড়ে ২০১২ সালের এ দিনে এক কাছের জন ফোন করে এ খবর জানায়। তার লাশ যখন বাংলাদেশে আনা হয় এবং সর্বস্তরের শ্রদ্ধার জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়, তখন এক মেয়ে সুহৃদের ফোন-‘আসবেন না দেখতে?’ বললাম ‘না’। জীবিত হুমায়ূনের পরশে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। অনেক সুযোগের পরও যায়নি। ইচ্ছা ছিল ভিন্নভাবে তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার। সেটা হয়নি, মৃত হুমায়ূনকে দেখে কী লাভ?
পরে দেখেছি তার একান্ত আপনজনের একী কান্না! সর্বশেষ হুমায়ূন তো জয়ী। দোষ ও গুণ মিলিয়েই। গুণের পাল্লা ভারি বলেই। কজনের এমন হয়!
আজ তার মৃত্যুদিনে মনে পড়ছে সে যেমন নেই, হিমু, মিসির আলী, শুভ্ররাও নেই। জোছনায় নতুন কোনো কাহিনীতে দিগম্বর হয়ে গর্তে ঢুকবেন না হিমু। কঠিন কোনো রহস্যের দ্বার খুলে দিয়ে হাজির হবেন না মিসির আলী। রাতে বিরাতে ঢাকার রাস্তায় উদ্ভট আচরণ করবেন না হিমু। শুভ্র সুন্দর কোনো কাহিনী মিলবে না কানা বাবাকে নিয়ে।
জীবন থেকে বলছি। আর কোনো বাবাও চাবেন না হুমায়ূনকে গুলি করে মারতে। কেউ হিমু হয়ে ঘুরে বেরাবে না পথে পথে। জীবনের বিস্তর ভাবনা ভিন্ন বাঁকে দেখাবে না কেউ। মানব-মানবীর প্রেমকেও খুব সহজ করে দেখতে পাব না কারো লেখায়। অপেক্ষা করব না আর নতুন কোনো কাহিনীর। পেটে ক্ষুধা নিয়ে কেনা হবে না হুমায়ূন সমগ্র। জমা টাকায় কেনা হবে না হিমু সমগ্র। পরিবারে অনেক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঝেড়ে মুছে সাজিয়ে রাখা হবে না হুমায়ূনের বই। এও কি একটা শাস্তি নয়!
এখন হবে হুমায়ূন বেচাকেনা, বন্দনাও হবে, হচ্ছে। আরও হবে হুমায়ূনকে নিয়ে মায়াকান্না। আমরা এমনই। দেখাব হিমুর বাহ্যিক রূপ, বাস্তবে এবং পর্দায়। কেউ বলবে হুমায়ূন মহান। কারণ তাকে দিয়ে উপরি আসছে। কেউ বলবে হুমায়ূন কিছুই না। এটাও নিজের কর্মের প্রচারহীনতায়। সব মিলিয়ে হুমায়ূনকে নিয়ে অনেক কিছুই হবে, হচ্ছে। কী আর করা যায়! হুমায়ূন তো কবর থেকে এসে এর বিপক্ষে আর কলম ধরবেন না। কোনো সহজ কথায় এর জবাব দিবেন না! হয়ত দূর বা খুব নিকটে বসে এসব দেখে চমকিত হবেন!
ভালো থাকুন হুমায়ূন আহমেদ। অতি প্রিয় একজন মানুষ। আপনি পাঠককে দিয়েছেন অনেক। কেড়েও নিয়েছেন অনেক। কোনটা যে বেশি জানি না। শুধু জানি আপনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েই একটা জীবন পার করে দিয়েছেন অনেক পাঠক। এর জন্য খেদও আছে, আনন্দও আছে। আপনি এক অজানা হাহাকার তুলেন পাঠকের জগতে! একি আপনি জানেন! এ আপনি কীভাবে করেছেন? বলা যায় কি?
থাক এসব। জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছেন আপনি? কেমন আছেন আপনার হিমু, মিসির আলী ও শুভ্ররা? বড়ই জানতে ইচ্ছে করে!

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

raihanullah12@gmail.com

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*