শেখ হাসিনা আমার রিয়েল হিরো : আদম তমিজি হক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে বেশ আগে থেকেই। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং এ টি হক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম তমিজি হক। তিনি ডিএনসিসি নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।

তমিজি হক ইউরোপে উচ্চতর রাজনীতি বিষয়ে পড়াশুনা শেষে দেশসেবায় মনোনিবেশ করতে ফিরে এসেছেন স্বভূমে। বিশ্বের একশটিরও বেশি রাষ্ট্রে ভ্রমণ করা আদম তমিজি হকের ঢাকা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন পরিকল্পনা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগামী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে স্মার্ট সিটি করার পক্ষে তিনি। কিন্তু তা কীভাবে? সেসব কথাই তুলে এনেছেন আলী আদনান। পাঠকের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হল-

তারুণ্যলোক : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

আদম তমিজি হক : মেয়র আনিসুল হক সাহেবের মৃত্যু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এটার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। আমি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করছি। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক মাত্র দুই বছরে যা করে গেছেন তা রেকর্ড। সততা, নিষ্ঠা ও সাহসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। তার এসব কাজের ধারাবাহিকতা যদি থাকে তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকার নগর জীবনে একটা বড় পরিবর্তন আসবে। আমি আদম তমিজি হককে যদি আল্লাহ সেই সুযোগ দেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যেভাবে নির্দেশ করবেন আমি সেভাবে কাজ করব।

তারুণ্যলোক : যদি মনোনয়ন না পান সেক্ষেত্রে কী করবেন?

আদম তমিজি হক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দেবেন তার জন্য কাজ করব। আমি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক, কর্মী ভাইসহ সবাইকে বলেছি, নেত্রীর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেব।

তারুণ্যলোক : আপনার দৃষ্টিতে ঢাকার প্রধান প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

আদম তমিজি হক : ঢাকার অনেক সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা রাজধানী। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, মাঝখানে অল্প কিছু সময় বাদ দিয়ে ঢাকা এ অঞ্চলের রাজধানী ছিল। কিন্তু ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় সংস্থাগুলোর জরিপে দেখা যায়, বাস অযোগ্য নগরীগুলোর তালিকায় ঢাকার নাম প্রথম দিকে আছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। এখানে পরিকল্পিত নগরায়ন হয়নি। নগরবিদরা বলছেন, আমাদের অধিকাংশ স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের পার্কগুলো এখন অর্ধমৃত। নদী ও খালগুলো প্রায় মৃত। আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা খুবই নাজুক। একটি আদর্শ নগরীর জন্য ২৫ শতাংশ রাস্তা, ১০ শতাংশ খোলা জায়গা, ১৫ শতাংশ বৃক্ষ থাকা আবশ্যক। কিন্তু আমাদের এখানে তা মানা হয়নি। একদিনে নয়, দীর্ঘদিন ধরে এটা ধীরে ধীরে হয়েছে। আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থা খুব খারাপ। যানজট এখানে নিত্যনৈমত্তিক একটি সমস্যা। এসব সমস্যার ফলাফল স্বরূপ ঢাকা হয়ে উঠছে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নগরী।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৭ মাত্রার বড় ভূ-কম্পনে নগরীর ৮৫ শতাংশ ভবন ধসে যাবে। অর্থাৎ বলার অপেক্ষা রাখে না আমরা কী ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। আর দৈনন্দিন জীবনে তো সমস্যা লেগেই আছে। পানির সমস্যা, বিদ্যুতের সমস্যা, স্যানিটেশন সমস্যা।

ঢাকার অন্যতম সমস্যা বস্তি। এগুলোতে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি কোনো সুবিধা নেই। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা। উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু সেই উন্নয়ন সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তারুণ্যলোক : আপনি সিটি মেয়র নির্বাচিত হলে কি এসব সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন?

আদম তমিজি হক : না, একজন সিটি মেয়র ইচ্ছা করলেই রাতারাতি নগর পাল্টে ফেলতে পারে না। সম্ভবও নয়। সিটি মেয়র যেটা করতে পারে সেটা হল একটা দীর্ঘমেয়াদী মাষ্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেটা দশ-পনের-বিশ বছর মেয়াদী মাষ্টারপ্ল্যান হতে হবে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সাহেবের কাজে সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দেখা গিয়েছিল। কম বেশি উন্নয়ন সব সেক্টরেই হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই উন্নয়নটা পরিকল্পিত কি না? বা কতটা ফলপ্রসূ?

তারুণ্যলোক : আজকের বাস্তবতায় সেই রূপকাঠামো কেমন হতে পারে?

আদম তমিজি হক : দীর্ঘমেয়াদী একটা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীর বাইরে স্থানান্তর করা যেতে পারে। অফিস, আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে নেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিভাগীয় শহরগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।

শিল্পাঞ্চলগুলোকে অবশ্যই রাজধানীর বাইরে স্থানান্তর করতে হবে। রেসিডেন্সিয়াল এলাকা ও কমার্শিয়াল এলাকা একসঙ্গে থাকা যাবে না। এতে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন জীবনের মান নষ্ট করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিন্তু তাই করছে। বাস টার্মিনালগুলোকে নগরের ভেতরে না রেখে বাইরে নিয়ে যেতে হবে।

তারুণ্যলোক : অনেকে বলে থাকেন বহুতল ভবন ঘিঞ্জিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এনিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আদম তমিজি হক : আমি বহুতল ভবনের পক্ষে। তবে সেটা পরিকল্পিত। আমাদের এখানে পরিকল্পনাহীনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যা বিশ্বের উন্নত কোনো রাষ্ট্রে হয় না। শহরের নির্দিষ্ট একটা এরিয়ায় একসঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী একশটি একশতলা ভবন নির্মিত হোক। তাহলে বাকি শহরটা ফাঁকা থাকবে। যেখানে রেসিডেন্সিয়াল এলাকা হতে পারে। তাহলে অন্তত আপনি নিঃশ্বাস নিতে পারবে মানুষ।

তারুণ্যলোক : আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাও কিন্তু অপরিকল্পিত। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

আদম তমিজি হক : অবশ্যই। ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়ে পাবলিক পরিবহনের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমলে রাস্তা ফাঁকা হবে। পাবলিক পরিবহন তখন দ্রুত যাবে। অর্থ ও সময় দুটোই সাশ্রয়ী হবে। তা ছাড়া পরিকল্পিত নগরায়ন হলে মানুষ হাঁটতে চাইবে। কিন্তু আমাদের এখানে আমরা হাঁটার পরিবেশ দিতে পারিনি। ফুটপাত-ওভারব্রিজ সব দখলে। বেশিরভাগ মানুষ স্যানিটেশন সচেতন নয়। ফুটপাতে যেখানে সেখানে প্রসাব করা, কফ-থুথু ফেলা এখানে স্বাভাবিক বিষয়। অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ ছিনতাইকারী ও মাদকাসক্তদের দখলে। আসলে সাধারণ মানুষের দোষ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা অনুকূল পরিবেশ চায়। আমরা দিতে পারছি না। সেটা আমাদের দোষ বা অক্ষমতা।

তারুণ্যলোক : আপনি মেয়র নির্বাচিত হলে কোন পাঁচটি প্রধান সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন?

আদম তমিজি হক : আমি আশ্বাস দেওয়ার পক্ষে নই। আবার ভোট বাড়ানোর জন্য কথার ফুলঝুড়ি ঝরাতেও পছন্দ করি না। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যদি একটা বাসযোগ্য নগরী দিতে হয়, তাহলে তার উদ্যোগ আজকে এখনই নেওয়া উচিত। শুধু নির্বাচিত মেয়র উদ্যোগ নেবেন তা না। প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থানে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসা উচিত। কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে মেয়র কাজগুলো সমন্বয় করবেন। জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। যারা শত কোটি হাজার কোটি টাকার মালিক, তারা না হয় তাদের সন্তানদের জন্য বিদেশে নিরাপদ ভূমি নিশ্চিত করবেন। কিন্তু যারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তারা যাবে কোথায়?

তারুণ্যলোক : অনেক নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা দাবি করছেন, রাজধানী স্থানান্তর করার প্রয়োজন হতে পারে। আপনি কী মনে করছেন?

আদম তমিজি হক : প্রয়োজন হতে পারে নয়, বরং বলি প্রয়োজন। এটা এখন সময়ের দাবি। রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় করা প্রয়োজন।

ঢাকায় যত মানুষ বাস করে, কাজের প্রয়োজনে আরো সেই পরিমাণ বা তার কাছাকাছি সংখ্যার মানুষ ভাসমান অবস্থায় ঢাকায় নিয়মিত আসে। যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা যায় তাহলে সেই চাপ কমবে। ঢাকা কিন্তু জনসংখ্যার চাপ আর নিতে পারছে না।

তারুণ্যলোক : ঢাকার সম্ভাবনাময় দিকগুলো কী কী?

আদম তমিজি হক : এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় নগরী ঢাকা। আমাদের এখানে সব আছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সব। আমাদের এখানে যত সহজে শ্রম পাওয়া যায় বিশ্বের অন্য কোথাও তা পাওয়া যায় না।

ঢাকা পর্যটনের নগরী। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র পর্যটন খাত কাজে লাগিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু দীর্ঘ বিশ ত্রিশ বছর ঢাকায় বাস করে ও লালবাগের কেল্লা বা আহসান মঞ্জিল চিনেন না বা দেখার আগ্রহ হয়নি এমন লোকের সংখ্যাও কিন্তু আমাদের এখানে কম নয়। কারণ, আমরা আমাদের পর্যটনখাতগুলোকে সেভাবে উন্নত করতে পারিনি। সেগুলোর যত্ন বা বিকাশে কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি। একটা নগরীতে পার্ক বা খোলা জায়গা খুব বেশি দরকার। কিন্তু আমাদের এখানে দেখবেন পার্কগুলো মারা যাচ্ছে। মানুষ পার্কে যেতে ভয় পায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন ভাসমান মানুষ ও মাদকাসক্তদের দখলে। মাথা বালির মধ্যে রেখে সমস্যা থেকে পার পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীতে যে কোনো সভ্যতা গড়ে উঠে নদীর তীরে। অথচ আমাদের সেই নদী বুড়িগঙ্গা এখন অর্ধমৃত। খালগুলো সব শুকিয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখবেন, হাতিরঝিল প্রজেক্টে ওয়াটার বাস সার্ভিস একদিকে যেমন সড়কে যাত্রীদের চাপ কমিয়েছে তেমনি অন্যদিকে পানি থেকে টাকা আয় হচ্ছে। এতে রাষ্ট্র লাভবান হচ্ছে। সেখানে আমরা আমাদের সব খালকে মেরে ফেলেছি। খালগুলো একইভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

আমরা যদি ঢাকাকে বাসযোগ্য নিরাপদ নগরী করতে চাই, তাহলে প্রশাসনের অনেকগুলো সেক্টর ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করতে হবে। শিল্প-কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক এলাকা আলাদা করতে হবে। বাস টার্মিনালগুলো শহরের একপ্রান্তে নিতে হবে। নয়তো আগামী দশবছরের মধ্যে ঢাকা অচল হয়ে যাবে।

তারুণ্যলোক : বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আদম তমিজি হক : প্রথম জীবনে আমার হিরো ছিলেন বাবা ব্যারিস্টার তমিজুল হক। আর বর্তমানে আমার রিয়েল হিরো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেখুন, এ জাতি গর্ব করার মতো খুব বেশি কিছু পায়নি। আমি চারদিকে অন্ধকার দেখি। কিন্তু একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে আলো দেখি। এই হতভাগা জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এত অল্প সময়ে এত বেশি কাজ পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্রও করতে পারেনি। ঘরে বাইরে সব জায়গায় শত্রু। তিনি (শেখ হাসিনা) ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য, সর্বোপরি বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সরকার বারবার ক্ষমতায় আসা যুগের সন্ধিক্ষণে আজ সবচেয়ে বড় দাবি।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*