মান্দি সাহিত্যের রাজপুত্র মিঠুন রাকসাম

এই সময়ে যারা লিখছেন তাদের মধ্যে বিশেষ করে মান্দি সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম তরুণ তুর্কির নাম মিঠুন রাকসাম। শুধু গারো না বাংলা সাহিত্যেও সমান তালে এগিয়ে চলেছেন লিখে যাচ্ছেন বাঙালি লেখক কবিদের সাথে পাল্লা দিয়ে। ফলে বাঙালি কবিদেরও ঈর্শার এক নাম মিঠুন রাকসাম। মিঠুন রাকসাম সাহিত্য চর্চা, প্রকাশনা, ছোট কাগজ সম্পাদনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন কায়মনোবাক্যে। এরই মধ্যে সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদচ্ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। কবিতা লেখার পাশাপাশি ছোটগল্প লেখা, গবেষণামূলক লেখায় নিজের হাত পাকিয়েছেন । সম্পাদনা করেন ছোট কাগজ থকবিরিম। ছোট কাগজ থকবিরিম থেকেই প্রকাশ করে থাকেন মান্দি লেখক-সাহিত্যিকদের মানসম্মত লেখা।

Image result for মিঠুন রাকসাম

মিঠুন রাকসামের জন্ম শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী থানার ভাটপাড়া গ্রামে ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর। মিঠুন রাকসাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

মিঠুন রাকসামের ছোটবেলা কেটেছে অবাধ দূরন্তপনা দিয়ে। পুরো মান্দিগ্রাম দাপিয়ে বেড়িয়েছেন । হেন কাজ নেই যা করেননি। গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছেন বন্ধুদের সাথে। বলা যায় মায়ের হাত ধরেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসা কারণ মা ছিলেন নাটক-যাত্রা পাগল এক নারী। রাত বিরাতে ছেলেকে নিয়ে নাটক দেখতে যেতেন, চাদের আলোয় গান বাজনা করতেন। অন্যদিকে মিঠুন রাকসামের মা ছিলে এক প্রতিবাদী নারী। মিঠুন রাকসামের কথা-মহিয়ষী নারী, দ্রোহের প্রতীক হচ্ছে রেজিনা রাকসাম। যখন তাদের জমি মহর আলীর দল দখল নিয়ে যাচ্ছে তখন রেজিনা রাকসাম একাই বটি হাতে দাড়িয়ে যান মহরালরির সামনে। নিজের ভিটা ভূমি রক্ষার জন্য আজীবন লড়াই করে গেছেন। সেই রেজিনা রাকসামের ছেলে মিঠুন রাকসাম তাই লিখেন দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম কিংবা গন্ধচোর’র মত কবিতা। যেখানে মান্দিদের ভিটা হারানো , ধর্ম হারোনো, সংস্কৃতি হারানোর কথা নিদীধায় বলেন কবিতার মাধ্যমে, উচ্চারণ করেন অসীম সাহসে।

তাদের গ্রামে সাময়িকী প্রকাশ হতো নিয়মিত। সেখানে লেখা পড়ে মনে মনে ভাবতেন আমিও এমন লিখতে পারবো। কিন্তু সে সময় তার মতন তরুণদের লেখা ছাপাতে বেগ পেতে হতো সেই সাময়িকীতে। স্কুলে পড়ার সময় থেকে মিসেস রবেতা ম্রংয়ের হাত ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আবৃত্তি, নাচ, একক অভিনয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিলো তার। শেরপুরের আলহাজ্ব শফিউদ্দীন আহমদ কলেজে পড়ার সময় দেয়াল পত্রিকায় লেখা দিয়ে তার সাহিত্য চর্চার শুরু হল বলা যায়। কলেজের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ক্ষমা চক্রবর্তী এবং সুহৃদ জাহাঙ্গীর প্রতিনিয়ত তাকে উৎসাহিত করে গেছেন লেখার ক্ষেত্রে। মিঠুন রাকসামের ভাষ্যমতে ক্ষমা চক্রবর্তীর উৎসাহ, রেজিনা রাকসামের দ্রোহী চরিত্র, তাকে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে অনেক বেশি।

তার প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ হলো মন্ত্রধ্বনি। ২০০৭ সালে শালুক প্রকাশনী থেকে তার এই কবিতার বই প্রকাশ পায়। এই বইয়ের মাধ্যমেই মিঠুন রাকসাম ঢাকার লেখক মহলের নজর কাড়তে সক্ষম হন। বিশিষ্ট কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, সরকার আমি, শাহনাজ মুন্নী ওবায়েদ আকাশের মত নামি কবিদের স্নেহতলে বেড়ে ওঠতে থাকেন। পরবর্তীতে একে একে তার কবিতা ও গল্পের বই প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। এখন পর্যন্ত কবিতার বই বেরিয়েছে ৬ টি, গল্পের বই একটি আর গবেষণাধর্মী একটি। তার প্রকাশিত বইগুলো হল- কাব্যগ্রন্থ –মন্ত্রধ্বনি, শিঙালাগানী মেয়ে, যমজ স্তনের ঘ্রাণে বালকের জীবন, দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম, মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা, গন্ধচোর।

গল্পগ্রন্থ- শিকড়ে খড়া
গবেষণা গ্রন্থ- মান্দি জাতির পানীয় ও খাদ্য বৈচিত্র্য ।
এর পাশাপাশি থকবিরিম নামে ছোট কাগজ সম্পাদনা করেন তিনি। এখান থেকেই বিভিন্ন বই প্রকাশের কাজও করে থাকেন।
একটা সময় বিটিভির শিশুদের অনুষ্ঠান সিসিমপুর১২৩ এ সিনিয়র স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করেছেন। বছর দেড়েক একটা সাপ্তাহিকেও কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সব ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে তার নিজের প্রকাশনী থকবিরিমের প্রকাশনার কাজেই পুরো মনোযোগ দিয়েছেন। বর্তমানে গারো মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাতকার নিয়ে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে মান্দি সাহিত্যিকদের নিয়ে সাহিত্য আড্ডা, লেখক কর্মশালার মতন নানান কাজে হাত দেয়ার পরিকল্পনা আছে। যাতে করে মান্দি লেখকরা সমসাময়িক কালের সাহিত্যের সাথে নিজেদের পরিচিতি ঘটাতে পারেন। এই কাজে হাত দেবার আরেক কারণ তিনি আমাদের জানালেন। মান্দি সাহিত্যিকদের মধ্যে সমসাময়িক সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি চোখে পড়ার মতন। এর কারন হয়তো পর্যাপ্ত পড়াশুনা না করা। দেখা যায় যে কবিতা যারা লিখছেন তারা অধিকাংশ সময় রাবিন্দ্রীক সাহিত্যের যে ভাষার প্রয়োগ তার থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে বর্তমান সময়ে ভাষার যে প্রয়োগ, যে চিত্রকল্পের নির্মাণ তা করতে মান্দি সাহিত্যিকরা সফল হচ্ছেন না। মিঠুন রাকসাম তার কাজের উদ্দেশ্য এভাবেই আমাদের কাছে প্রকাশ করলেন।

মিঠুন রাকসামের সাহিত্যে জড়িয়ে থাকে মান্দি জাতিগোষ্ঠীর জীবন যাপনের নানান চিত্রকল্প। মান্দি জাতিগোষ্ঠীর শত বছরের লাঞ্ছনার ইতিহাস, তাদের সংস্কৃতি, জীবনবোধ তার সাহিত্যের উপাদান। প্রবলজীবনবোধ কখনো কখনো তার সাহিত্যে দ্রোহের সঞ্চার ঘটায়। ধর্মান্তরিত মান্দি জাতিগোষ্ঠী তার সব ঐতিহ্য, কৃষ্টি হারিয়ে যখন দিশেহারা তখন তরুণ কবি মিঠুন রাকসাম তার যাপনে, তার কবিতায়, গল্পে জাগিয়ে তোলেন অন্য এক সত্তা। যে সত্তা আদিম প্রকৃতিপূজারী মান্দি জাতিগোষ্ঠীর অনবদ্য এক আলেখ্য বয়ান করে। কখনো কখনো স্বপ্ন দেখায় ফের নকমার উঠোন জুড়ে বসবে ওয়ানগালা। যেনোবা প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড় বেয়ে চলেছেন নিজের শিকরকে ফিরে পাবার এক ব্যকুলতম আশায়, বলা যায় ক্ষুধারথ নাবিক এক মিঠুন রাকসাম।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*