মারজিয়া মন্টি’র একগুচ্ছ কবিতা

প্রিয় অখিলেশ

অখিলেশ মনে আছে তোমার?
হঠাৎ আমি আকাশ দেখবো বলে
বাচ্চা মেয়ের মতো বায়না করেছিলাম..
তুমি বলেছিলে সুস্থ হও আগে
আমরা একসাথে আকাশ দেখবো
শুনে আমি খুব করে হেসেছিলাম।

আমার হাসির শব্দে তুমি চমকে উঠেছিলে
‘অমন করে হাসছো যে?’
জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করলে…
বললাম আমি, কেন?
তুমি তো আমার হাসিকেই ভালবাসতে।
নাকি তখন আমায় মিথ্যে বোঝাতে…?

আরো কঠিন করে বুকের মাঝে
চেপে ধরে বললে
সমস্ত তোমাকেই তো ভালবাসি এখন
তবুও এমন বিকট জোরে হাসলে…

আরে হাসতে দাও, হাসতে দাও
যদি হঠাৎ আমায় হাসিতে না পাও
বলতেই এবার বাহু থেকে সরিয়ে দিলে
মনে আছে তোমার অখিলেশ??
সেদিন সারাটা দিন তুমি চুপ ছিলে
আমার দিকে সমস্ত খেয়াল ছিল ঠিকই
অথচ আমার উপর রাগটা ধরে রেখেছিলে..
ক্যান্সার হওয়ার পর ওই প্রথম তুমি রাগ দেখালে…

অখিলেশ আমি সেদিন রাগাতে চাইনি তোমায়
বাস্তব সত্যটাকে বেশি করে বুঝতে চেয়েছি
কথাটা বলে কি আমি নিজেও সেদিন কম কষ্ট পেয়েছি!

আমি তোমায় দেখি অখিলেশ, অনুভব করি তোমার একাকীত্ব
আমি হীন একদিন তোমায় থাকতে হবে
মেনে নিতে যদি সেদিন এ বাস্তব সত্য!

 

পাতার মৃত্যু

একটা দীর্ঘ সময় ধরে আমার অপেক্ষারা
বয়ে চলেছে,
আমি সবুজ পাতাকে ধীরে ধীরে
হলুদ হতে দেখেছি,অতঃপর
শুষ্ক জীবনকে অবলম্বন করে
দেখেছি ঝরে যেতে৷

আমার দেখা ফুরোচ্ছে না,
সময় চলে যায়
তবুও আমি দেখেই চলেছি
একটা একটা পাতার মৃত্যু
কেউ আমার চোখ দুটো আগলে রাখুক
আড়াল করুক এই মৃত্যু দেখা থেকে
আমার ঠিক সহ্য হচ্ছেনা তবুও
আমার চোখ যেন সরছে না।

আমি দীর্ঘ সময় থেকে অপেক্ষা করছি
শুকনো ঝরা পাতাগুলো আবার সজীব হবে
সতেজ হয়ে আবার আশ্রয় নিবে গাছের শাখায়৷
কেউ আমাকে বোঝাও,কেউ আমাকে
নিয়ে যাও এই গাছের ছায়াতল হতে
কেউ আমাকে সত্যি জানাও এটা বাস্তব না
আমার অপেক্ষা কখনো শেষ হবার না৷
গাছেরা আর সবুজ হবে না সবুজ পাতায়…
তাই সত্যি করে আজ যেন আমার অপেক্ষার
মৃত্যু হয় শুকনো শাখায়,শুকনো পাতায়।

 

পথ মিলেছে অবশেষে

-কেমন আছো? কেমন রেখেছে সে?
-ভালই তো আছি৷ তোমার কেমন কাটছে?

-এইতো চলে যাচ্ছে ৷ কই বললে না তো?
-কি বলো তো?

-কেমন রেখেছে তোমার সে জন?
-কে?কোনজন?

-যার জন্য মুখ ফেরালে..
-মুখ ফেরালাম?না তুমিই ঘুরে দাঁড়ালে?

-অযথা দোষ দেওয়া স্বভাব টা আছে এখনো!!
-কি করবো বলো?শাসন করার মানুষ নেই যে কোনো.

-সে ছেড়েছে নাকি তুমি?
-ছাড়াছাড়ি? কারোর সঙ্গে তো যাই নি আমি

-তাহলে সেদিন ছিলোটা কে?
-কে ছিল, তা বলার সুযোগ দিয়েছিলে?

-আমি তো ভেবেছিলাম…..।
-তোমার এই ভেবে নেওয়ার জন্যই ৯ টি বছর পেরিয়ে এলাম

-আগের মতো মজা করছো নাকি?
-মজা করার সময় টা আর আদৌ আছে কি?

-পরে কেন বলোনি বুঝিয়ে?
-এসেছিলাম,পাইনি তোমাকে খুঁজে

-ওহ!! রাগে ক্ষোভে দুঃখে অন্ধ হয়ে বাসাই ছেড়েছিলাম
-আর সেই আগুনে ৫ টা বছর আমিও পুড়েছিলাম

-৫ বছর!!আর বাকি বছর চার?
-অনুভূতিহীন হয়ে গেছি,কাজের মাঝেই করছি ভালই পাড়..

-আর স্বামী সংসার বিয়ে??
-তুমি তো নেই,সংসার আর করবো কাকে নিয়ে?

-একটু বলবে সেদিন আসলে কি ঘটেছিল?
-সেদিন তো শুনতে চাওনি,আমার ভাইকে নিয়েই ভুলটা বুঝেছিলে৷

-তোমার ভাই!কই শুনিনি তো তোমার ভাই ছিল!!
-সে বছর দশ বয়সে হারিয়ে যেয়ে সেদিন মিলেছিল..

-তারপর?
-হঠাৎ দেখি তাকে চৌরাস্তার মোড়…

-তোমাকে চিনল?
-ওমা চিনবেনা!ভাই যে,সেও কিভাবে যেন ঠিকানা পেয়েছিল

-আহ! কি ধৃষ্টতা আমার..!
-থাক না এখন আক্ষেপে কি কাজ আর?

-সেদিন অন্য পুরুষ জড়িয়ে দেখে তোমার বাড়ি,ঠিক ছিলাম না আমি
-একটু যদি সময় দিতে,একটু কথায় বুঝিয়ে দিতাম আমি।

-ক্ষমা করো আমায়,পায়ে পড়ি
-অপরাধ ধরিনি তো..কিভাবে ক্ষমা করি?

-নতুন করে যায় না করা শুরু?
-আর কি যায়? ৯ টা বছর কম গেল না গুরু..

-উফ! সিরিয়াস মোমেন্টে মজা করার স্বভাব তোমার আর গেল না!
-পুরনো তোমাকে পেলাম ফিরে,পুরোনো আমিকে আনতে হবে না?

-এই ধরলাম হাত,আর কিন্তু ছাড়ছিনা..
-ছাড়লে আবার, হাড্ডি চামড়া এক থাকবেনা…..

হাসতে হাসতে চলল তারা
ভবিষ্যতের দিকে
সত্য গুলো ভাল থাকুক
মিথ্যে গুলো হোক ফিকে…

 

কেউ তো আমায় ভাবেনা

আমার জন্য সারাটা রাত
কেউ তো জেগে থাকেনা
সমস্ত দিন কেউ কখনোই
আমায় নিয়ে ভাবেনা।

মধ্যরাতে কাব্য পড়ে
প্রহর কাটে কলম নেড়ে
কেউ তো নিজের ঘুম ভাঙিয়ে
আমার জন্য জাগে না।

নোটবুকেরই বুকের উপর
আঁকিবুঁকি, কালির আঁচড়
স্বপ্ন,চাওয়া,ইচ্ছে থলে
কেউতো ঢেলে দেখেনা।

হালকা জ্বর আর মাথা ধরা
দাঁতের ব্যথায় কাতর সারা
“কমেছে ব্যথা?এখন কেমন?”
একবারও কেউ শুধায় না।

তাইতো আমার একলা পথে
একলা হাসি নিজের সাথে
সারাটা রাত শব্দ খুঁজি
কাউকে মনে পড়ে না।

মানুষ আমি একটু রাগী
হয়তো খানিক বদমেজাজি
রাগী হলেও ভালবাসি
কেউ কখনো বলে না।

বৃষ্টি গুলো স্বপ্ন হয়ে
চোখ গুলোকে যায় যে ছুঁয়ে,
তবুও কেউ আমার জন্য
স্বপ্নগুলো সাজে না।

তাই তো আমি বলি এখন
সময় এলেই দেখব তখন
সঠিক মানুষ মিলবে যখন,
আচ্ছা,সত্যি কেন মেলে না?

রাত কাটে তাই দিনের খোঁজে
দিন কেটে যায় কাজের ভাঁজে
অপেক্ষারা ভাবে না যে
সময় তো আর কাটেনা।

আমার জন্য সারাটা রাত
কেউ তো জেগে থাকেনা।

 

স্থির তুমি চাই

এক পশলা বৃষ্টি তুমি
হঠাৎ ছুঁয়ে আড়াল হও,
এক ঝলক বিদ্যুৎ হয়ে
দেখা দাও,অঝোর বৃষ্টি নামাও..

তুমি ঘূর্ণি হাওয়াতে উড়াও
সুনামির বেগে ধাও,
কখনো বাঁধ ভেঙে দিয়ে
বন্যার স্রোতে কাঁদাও..

আমি স্থির তোমাকে শুধু চাই
ধ্বংস না হয়ে যে তুমি,
দুঃস্বপ্নকে উড়িয়ে আবার
নতুন করে বাঁচাবে আমায়…

ভাল থাকো,ভাল হোক বার বার
ভাল যতো কিছু আছে
সবটা হোক তোমার
আমি হতে চাই শুধু একটু অংশীদার..

 

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*