রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: বঞ্চিত বিজ্ঞানীর কথা

ডিএনএ, জীবের সকল বৈশিষ্ট্যের নীল নকশা। দুটি প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়েই তৈরি খুদে অঙ্গাণুটি। প্যাঁচানো এই নকশাটা আবিষ্কার হয় ১৯৫৩ সালে। সবাই জানি ও মানি, মার্কিন বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স নকশার মূল কারিগর। এ স্বীকৃতিস্বরুপ ওয়াটসন, ক্রিক এবং উইলকিনসকে নোবেল দেওয়া হয় ১৯৬৩ সালে। তবে, এই গল্পের একজন নেপথ্য কারিগর ছিলেন- রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। তাঁর অবদান ছাড়া এই গবেষণা নিশ্চিত অনেক দেরি হয়ে যেত।

১৯২০ সালের ২৫শে জুলাই লন্ডনের নটিং হিলে জন্ম ফ্রাংকলিনে। ১৯২০ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পৃথিবীকে দিয়ে গেছেন অসংখ্য সৃজনশীল কাজ।

ছোটবেলা থেকেই ফ্রাঙ্কলিন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার অমত ছিল এতে। তিনি চেয়েছিলেন, মেয়ে সমাজকর্মী বা স্বেচ্ছাসেবক হোক। সম্পূর্ণ নিজ প্রচেষ্টায় ১৯৩৮ সালে নিউম্যান কলেজ ও ১৯৪১ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন ফ্রাঙ্কলিন।

১৯৪২ সালে ব্রিটিশ কোল ইউটিলাইজেশন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের ফেলোশিপ লাভ করেন। শুরু হয় তাঁর গবেষণা জীবন। একইসঙ্গে ১৯৪৫ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্যাল রসায়নে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি জে.ডি. বারনাল ও মরিস উইলকিনসের সঙ্গে গবেষণা শুরু করেন। ডিএনএ প্রোজেক্ট নিয়েই ছিল তাঁর কাজ। সে সময় তিনি এক্স-রের সাহায্যে ডিএনএর ছবি তুলতে সক্ষম হন। ১৯৫১-৫৩ সালের মধ্যে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ নকশা ও কাঠামো তৈরির পথে অনেকখানিই এগিয়ে গিয়েছিলেন। একই সময় জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকও ডিএনএর গঠন নিয়ে কাজ করছিলেন। তখনই উইলকিন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ফ্রাঙ্কলিনের তোলা ছবিটা দেখার সুযোগ পান ওয়াটসন। তিনি ক্রিকের সঙ্গে যৌথভাবে একটি মডেল দাঁড় করিয়েছিলেন। তারপর লিখেছিলেন একটি গবেষণাপত্র। সেটা ছাপা হয় নেচার জার্নালে।

এর কিছুদিন পর নেচার পত্রিকায় ফ্রাঙ্কলিনের গবেষণাপত্রটিও পাঠানো হয়। বিষয়বস্তু এক বলে নেচারের সম্পাদকমণ্ডলী সেটা ছাপতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ফ্র‍্যাঙ্কলিনের মতোই লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায় তাঁর কাজ। বহুদিন পরে ওয়াটসন স্বীকার করেন, তারা ফ্রাঙ্কলিনের ছবিটা বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করেছিলেন।

ফ্রাঙ্কলিন এমন একজন গবেষক ছিলেন, যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলিয়েছেন। শেষ কয়েকটি বছর আরএনএর গঠন নিয়ে কাজ করেছেন, গবেষণা চালিয়ে গেছেন টোবাকো মোজাইক ভাইরাস (টিএমভি) ও পোলিপ ভাইরাসের গঠন নিয়ে। সারাজীবন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা মানুষটি মাত্র ৩৮ বছর বয়সে দূরারোগ্য ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মৃত্যুর পর তার সমাধিফলকের লেখা হয়, ‘ভাইরাস নিয়ে তাঁর কাজ মানবজাতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী আশীর্বাদ।’