নিউমোনিয়ার প্রাকৃতিক প্রতিষেধক

প্রাচীন গ্রীক শব্দ “নিউমন”থেকে “নিউমোনিয়া” শব্দটি উৎপন্ন হয়েছে যার অর্থ “ফুসফুস”। “নিউমোনিয়া” শব্দের অর্থ দাঁড়ায় “ ফুসফুসঘটিত রোগ”। সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি বৃদ্ধি পায়। যার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে প্রচণ্ড কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্টও হয়। এটা ফুসফুসে সংক্রমণের ফলে ফুসফুসে হওয়া প্রদাহের কারণে হয়ে থাকে যা ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি করে। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসের সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়। যেমন, স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিউমোনিয়া রোগের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া, ছত্রাকঘটিত কারণেও অনেক সময় নিউমোনিয়া হতে পারে।

ঠান্ডা বা শীতে নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকায় উপযুক্ত আবহাওয়া পেয়ে নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সামান্য ঠান্ডা লাগা থেকেও কেউ কেউ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। তবে সকলেই যে সামান্য ঠান্ডা লাগলেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবেন তা নয়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য ঠান্ডা লাগা থেকে নিউমোনিয়া সাধারণত হয় না। তবে যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, বিশেষ করে শিশু কিংবা প্রবীণ মানুষের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশিই।

নিউমোনিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হল জ্বর। তার সঙ্গে কাশি। পাশাপাশি, শ্বাসকষ্টও থাকে। সংক্রমণ যত বাড়ে, শ্বাসকষ্টও বাড়তে থাকে। বুকে ব্যথা হতে পারে। বুকের ব্যথার এই ধরন তবে একটু আলাদা। সাধারণত, গভীর শ্বাস নেওয়ার সময়ে এই বুকের ব্যথা অনুভূত হবে। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে এই ব্যথা হয়। এ ছাড়া, মাথায় যন্ত্রণা, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া, খাওয়ায় অনীহা, সারাক্ষণ বমি বমি ভাবও আনুষঙ্গিক লক্ষণের মধ্যে পড়ে।

নিউমোনিয়ার প্রথম দিকে সাধারণ জ্বর, সর্দি এবং সঙ্গে কাশির উপসর্গই দেখা যায়। তবে কিছু দিন পর থেকেই এই উপসর্গগুলোর প্রকোপ বাড়তে থাকে। দেখা যায়, জ্বর কিছুতেই কমছে না। সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। কাশিও একই ভাবে বাড়ছে। বুকের ব্যথাও থাকছে। সাধারণ সর্দি-কাশি হলে ওষুধ দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসায় সাড়া পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে তেমন হয় না।

যে কোনও বয়সের মানুষই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত দেখা যায়, শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাই বেশি এই রোগে আক্রান্ত হন। চার বছর বা তার কম বয়সের শিশু এবং ষাট বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের ব্যক্তিদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

রোগী কত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন, এটা নির্ভর করে আক্রান্তের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন, তার উপরে। প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসা শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকোপ কিছুটা কমে। রোগ পুরোপুরি সারতে মোটামুটি দু’সপ্তাহ সময় লাগে। কখনও অবশ্য তার বেশিও লেগে যেতে পারে। সবটাই নির্ভর করছে, সংক্রমণ কতটা হয়েছে, তার উপরে। সঙ্গে অবশ্যই রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সব সময় শরীর সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। নিউমোনিয়া রোগের উপসর্গের দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া, কেউ যদি অপুষ্টিতে ভোগেন, কিংবা যদি কোনও ব্যক্তির আগে থেকেই ফুসফুসে কোনও সমস্যা থেকে থাকে, তাদের আরও বেশি সাবধানে থাকা দরকার।

যে কোনও ভাবে ঠান্ডা থেকে দূরে থাকতেই হবে। যাদের নিউমোনিয়া সংক্রমণের অতিরিক্ত সম্ভাবনা রয়েছে, যেমন ফুসফুসের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, হৃদ্‌যন্ত্র, লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এমনকি, যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তারাও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিউমোনিয়া প্রতিরোধক টিকা নিতে পারেন। এ ছাড়া, ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে দূরে থাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সার্বিক ভাবে বাড়ে।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধক টিকা রয়েছে। এই ধরনের টিকা দু’ভাবে নেওয়া যেতে পারে। এক ধরনের টিকা রয়েছে, যেটি বছরে এক বার নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, আর এক ধরনের টিকা রয়েছে, তা পাঁচ বছর অন্তর নেওয়া যেতে পারে। একে ‘বুস্টার ডোজ’ বলা হয়।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার টিকা আগাম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির জন্য দেওয়া হয়। অন্য দিকে, যাঁদের নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদের অন্য ধরনের টিকা দেওয়া হয়। তবে সব ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে টিকা নেওয়া দরকার।

নিউমোনিয়ার ধরণ ও লক্ষণের গভীরতার ওপর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে। বুকে ব্যথা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলে, অনেকদিন ধরে ১০২ ফারেনহাইট বা তার থেকে বেশী জ্বর কিংবা কাশি থাকলে ডাক্তার দেখানো উচিৎ। লক্ষণ গুরুতর না হলে, মূল চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু প্রাকৃতিক নিরাময় নিউমোনিয়া রোগ থেকে দূরে থাকা যায়।

রসুন

রসুনের অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল গুণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের মোকাবিলা করে। এটা শরীরের তাপমাত্রা কমায় এবং বেশী পরিমাণে শ্লেষ্মা বের করে দিয়ে বুক ও ফুসফুস থেকে কফ পরিষ্কার করে দেয়। রসুন থেঁতো করে নিয়ে গরম দুধ ও জলের সাথে মিশিয়ে খান কিংবা দিনে তিনবার লেবুর রস, মধু ও রসুনের মিশ্রণ খেয়ে সমস্যার সমাধান করুন।

তুলসী পাতা ও গোলমরিচ

ফুসফুসের জন্য উভয় উপদানই উপকারী। এইগুলো নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় সাহায্য করে। কয়েকটা তুলসী পাতার নির্যাস বের jকরুন। টাটকা গোলমরিচ গুঁড়া করে একচিমটে মিশিয়ে প্রতি ছয়ঘণ্টা অন্তর খান।

হলুদ

এটা মিউকোলাইট হিসেবে কাজ করে শ্বাসনালি থেকে শ্লেষ্মা বের করে। এর অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য সংক্রমণের মোকাবিলা করে। গরম সরষের তেলের সাথে হলুদ গুঁড়োর পেস্ট বানিয়ে বুকে মালিশ করুণ। আপনি দিনে তিনবার এক গ্লাস গরম দুধের সাথে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়েও খেতে পারেন।

গোলমরিচ

এর মধ্যে অধিক পরিমাণে ক্যাপসাইসিন থাকে, যা শ্বাসনালী ও শ্বসনতন্ত্র থেকে শ্লেষ্মা-কফ বেরোতে সাহায্য করে। গোলমরিচ বিটা-ক্যারোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস এবং এর জন্য মিউকাস মেমব্রেন সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায় ও সুস্থ থাকে। পানির মধ্যে গোলমরিচ ও লেবুর রস মিশিয়ে সারাদিনে বারকয়েক খান। গাজরের রসের সাথেও গোলমরিচ যোগ করতে পারেন। উভয়েই কার্যকারিভাবে নিউমোনিয়ার নিরাময় করে।

মেথির বীজ

মেথির বীজে মিউকোলাইটিক গুণ থাকে যা কফ বের করে দেয়। এর জন্য ঘাম হয়, যা শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয় ও জ্বর কমে। দুইকাপ জলের মধ্যে মেথির বীজ গরম করে নিয়ে সেটা দিয়ে চা বানান। এই মিশ্রণ ছেঁকে নিয়ে খান। মেথির বীজ, আদা, রসুনের কোয়া ও একচিমটে গোলমরিচ দেওয়া হার্বাল চা খেতে পারেন। সমস্যার নিরাময়ের জন্য এটা সারাদিনে কিছুক্ষণ বাদে বাদে খান।