‘স্বাভাবিক জীবনে’ হয়তো আর কখনো ফেরা হবে না, অভিমত বিশেষজ্ঞদের

এই মহামারির কালে একটি কথা বেশ প্রচলিত, ‘ছয় মাসে পাঁচ বছরেরও বেশিকালের পরিবর্তন চলে এসেছে।’ অনেকেই হারিয়েছেন চাকরি। কারও খুব নিকটজন হয়তো মরে গেছেন একা একা; তাকে শেষ বিদায় বলাও হয়নি সম্ভব।

করোনাভাইরাসের দাপটে অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতোই কাটছে ২০২০ সাল। অনেকেই প্রত্যাশা করছেন, আগামি বছর হয়তো ‘সুদিন’ ফিরে পাবে মানুষ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ‘স্বাভাবিক জীবনে’ মানবজাতির আর কখনো ফেরা হবে না।

নতুন বছরে নতুন করে জীবনকে গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন অনেকেই। তাদের কাছে প্রতিটি জানুয়ারি মাস হয়ে আসে নতুন বার্তার প্রতীক হিসেবে। মানসিকভাবে তাই অনেকেই এ মাসের অপেক্ষায় থাকেন। আগামি জানুয়ারিতে তেমনটা বোধহয় হচ্ছে না!

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখছি আমরা। যাদের ভাগ্য ভালো, তারা বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারছি। মোদির দোকানে কম গেলেও, একবার গেলে হয়তো একটু বেশি সময় কাটিয়ে আসছি। আগামি জানুয়ারিতেও এ প্রবণতা দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

দেখা যাবে, গণপরিবহনে মাস্ক মুখে চলাচল সবার কাছে ‘স্বাভাবিক’ বলেই গণ্য হবে। অন্যদিকে, পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে হাত না মেলানোটাই হয়ে ওঠবে রেওয়াজ। আর, সামনা-সামনি সভা কিংবা আড্ডাবাজির বদলে ভিডিও কনফারেন্সের আমরা হয়ে ওঠব অভ্যস্ত।

এই মহামারির কালে একটি কথা বেশ প্রচলিত, ‘ছয় মাসে পাঁচ বছরেরও বেশিকালের পরিবর্তন চলে এসেছে।’ অনেকেই হারিয়েছেন চাকরি। কারও খুব নিকটজন হয়তো মরে গেছেন একা একা; তাকে শেষ বিদায় বলাও হয়নি সম্ভব।

তবু জানুয়ারির সঙ্গে মানুষের যে মানসিক সম্পর্ক, সেটির ভবিষ্যৎকে নেতিবাচকভাবে দেখতে নারাজ মনোবিদরা। শুধু ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা’র তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে একটু বদলে নেওয়ার পরামর্শ তাদের।

“যে রাজনীতিকরা ভাব ধরছেন, ‘স্বাভাবিকত্ব’ স্রেফ টেবিলের এক কোণায় পড়ে রয়েছে, ওকে টেনে সামনে নিয়ে আসা কোনো ব্যাপারই না, তারা নিজেদের নয়তো নিজ সমর্থকদের, অথবা উভয় পক্ষকেই ধোকা দিচ্ছেন,’ বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ব্যাবসন কলেজের ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক থমাস ডেভেনপোর্ট।

‘ট্রাজেডির শিকার হওয়া মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের আগের হাসিখুশি জীবনে ফিরে আসবেন,’ ই-মেইল বার্তায় বলেন ডেভেনপোর্ট। ‘কিন্তু আমার ধারণা, কোভিড-১৯ খানিকটা পার্থক্য গড়ে দিয়েছে; কেননা, সহসাই এ পরিস্থিতির অবসান হবে, এমন আশা করতে শুরু করেছি আমরা। তাই এ ব্যাপারে আপনার মনোভাব চিরতরে পরিবর্তনের কোনো দরকার নেই।’

পরিবর্তনের ওপর মানুষের আস্থা রাখার প্রবণতাটি ক্ষণস্থায়ী। তাই আমরা যাকে ‘স্বাভাবিকত্ব’ বলে জানতাম, ভবিষ্যৎ সেই অবস্থায় ফিরে আসবে, মানুষ এমন ধারণা করতেই পারে।

‘স্বাভাবিক অবস্থা’ ফিরে আসবে- এমনটা ধরে নিয়ে যারা পরিবর্তনকে মেনে এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেবেন না, তাদের জন্য দুঃসংবাদ রয়েছে। যারা মাস্ক পরতে রাজি হবেন না, ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ না ফেরার জন্য তারা দায়ি থাকবেন বলে জানিয়েছেন ডেভেনপোর্ট।
মানিয়ে নেওয়ার কসরত

মানুষের মস্তিষ্ক বরাবরই টিকে থাকার প্রতি সায় দেয়। আমাদের মনের কোনো অংশ যদি পরিবর্তন মেনে না নিতে প্রলুব্ধ করে, আরেক অংশ নতুন বাস্তবতাকে স্বাগত জানাতে থাকে প্রস্তুত।

বেঁচেবর্তে থাকার জন্য নতুন বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নেওয়া জরুরি। ‘যখন ভালো ও মন্দ- উভয় ধরনের ঘটনা ঘটে, আপনি প্রথমেই গুরুত্ব দেন আবেগকে,’ বলেন রিভারসাইডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক সোনিয়া লিবোমিরস্কি। ‘এরপর ভারসাম্য সামলিয়ে, বিচার-বিবেচনাকে সামনে আনেন। ইতিবাচক ঘটনার ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি জোরাল ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, নিজ জীবনের নেতিবাচক পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে মানুষ কখনোই পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারে না।’

অধ্যাপক সোনিয়া আরও মনে করেন, স্বল্পকালীন পরিবর্তনগুলোকে সহজের পাশ কাটানো যায়। এ প্রসঙ্গে এই গ্রীষ্মে মন্টানায় এক ওপেন-এয়ার সভায় অংশ নেওয়ার স্মৃতিচারণ করেন তিনি, যেখানে অংশ নিতে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করানো এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছিল বাধ্যতামূলক।

এইসব ‘যক্কি’ পেরিয়ে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই অংশগ্রহণকারীদের আচরণ হয়ে উঠেছিল করোনাভাইরাস-পূর্ববর্তীকালীন ‘স্বাভাবিক সময়ে’র মতো।

‘ব্যাপারটা এমন, যেন মহামারিটি কোনোদিনই আসেনি,’ বলেন সোনিয়া। ‘সবাই ভীষণ উল্লসিত হয়ে ওঠলেন।’

তাই জীবনের উচ্ছলতাকে উপভোগ করার পক্ষে মত সোনিয়ার। তবে ভবিষ্যতে ‘চিরচেনা স্বাভাবিক জীবন’ ফিরবে কি না, নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, ভবিষ্যতের ‘স্বাভাবিকত্ব’ যে একটু ভিন্ন হবে, সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি নিশ্চিত।

সূত্র: সিএনএন