জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন

বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলায় প্রায় দুই লাখ অধিবাসী–অধ্যুষিত নগরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই সেই বিরানভূমিতে যে উদ্ভিদ কুঁড়ি ফুটিয়ে পুনরায় জীবনের সূচনা করেছিল, সেটি ছিল পার্সিমন—বর্তমান জাপানের জাতীয় ফল। পার্সিমন বা কাকি পুষ্টিগুণে ভরপুর খুব মিষ্টি এবং রসাল একটি ফল।

পার্সিমন উদ্ভিদের কাণ্ড অনেক শক্ত, একদম আবলুস কাঠের মতো। তাই পারমাণবিক বোমার তীব্রতা সত্ত্বেও জীবন ধরে রাখতে পেরেছিল। আর সে কারণেই জাপানিরা শক্তির প্রতীক হিসেবে পার্সিমন উদ্ভিদকে দেখেছে, উৎসাহ পেয়েছে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়াবার। পার্সিমন বা কাকিকে দিয়েছে জাতীয় ফলের মর্যাদা।
একধরনের গাবের উন্নত সংস্করণ, উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা জাপানি পার্সিমনের নাম দিয়েছেন Diospyros kaki। এ নামের মধ্যেই লেখা হয়ে গেছে ফলটির আসল পরিচয়। গ্রিক থেকে অনুবাদ করলে হয় দৈব বা স্বর্গীয় ফল।

তবে বলে রাখা ভালো, পার্সিমনের দুই হাজারের বেশি প্রকরণ আছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে চীনারা এ গাছের খবর জানে দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। বহু গুণের কারণে একটি প্রাচীন চীনা কিংবদন্তি অনুসারে তাঁরা পার্সিমন গাছের নাম দিয়েছিল ‘প্রাচ্যের পবিত্র অ্যাপল’। তা ছাড়া চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ফলকে দৈব গুণে গুণান্বিত মনে করা হয়। আবার অনেক চীনা এর পাতাকে চায়ের মতো সেদ্ধ করে পান করেন। তাঁরা মনে করেন, এতে অনেক ঔষধি গুণ আছে। তাঁদের ধারণা, এ ফল খেলে মাথা ব্যথা, পিঠ ও পায়ের ব্যথার উপশম হয়। পুষ্টিগুণে ভরপুর একটা পার্সিমন ফলের ওজন ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
গাছে কাঁচা পার্সিমন

সে যা–ই হোক, পার্সিমন চীনের সীমানা ছাড়িয়ে জাপান থেকে ইউরোপ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকাতে। শরৎ আসতেই ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিতে শুরু করে পার্সিমন। ইউরোপের বাজারে জেঁকে বসা এই ফল সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়।

পার্সিমন গাছের উচ্চতা ৪.৫–১৮ মিটার (১৫–৬০ ফুট) হতে পারে। চারা রোপণের সাত বছরের মাথায় ফল দিতে শুরু করে। লিঙ্গভেদে দুই ধরনের গাছ হয়, পুরুষ ও স্ত্রী। অর্থাৎ একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল হয় না। পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফোটে। কাঁচা ফলের রং গাঢ় সবুজ। পাকতে শুরু করলে উজ্জ্বল হলুদ, কমলা, গোলাপি, ডালিম রং, হালকা লাল ও গাঢ় লাল হতে পারে। রং অনেকটাই নির্ভর করে এর প্রজাতির ওপর।

সুযোগ থাকলে সাতটি বিশেষ কারণে এই মজার ফলের স্বাদ আস্বাদন করা উচিত।

১. হৃদয়বান্ধব

শুধু হৃৎপিণ্ড নয়, কিডনি ও ফুসফুসের জন্য অনেক ভালো কম ক্যালরির এই ফল। পর্যাপ্ত আঁশ বা ফাইবার, ভিটামিন সি, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও ক্যালসিয়ামের মতো স্বাস্থ্যকর খনিজ থাকে এতে। আমাদের শরীরের যাবতীয় বিপাকীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এসব খনিজ এবং ইলেকট্রোলাইটের ভূমিকা অপরিসীম।

২. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

পার্সিমন অতিরিক্ত সোডিয়াম অপসারণ করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ কলা খেতে খেতে অরুচি এসে গেলে, স্বাদ বদল করে মন ভরে পার্সিমন খেলেও প্রায় সমপরিমাণ পটাশিয়াম পাওয়া যাবে যা হৃৎপিণ্ডের জন্য ভালো।

৩. রূপ-লাবণ্যের আধার

চেহারায় দীর্ঘদিন রূপ-লাবণ্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা সবারই থাকে। ফুল-ফল, উদ্ভিদেই আছে সে মহৌষধ। মন ফুরফুরে থাকলে চেহারায়ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। খাদ্যপ্রাণে ভরপুর পার্সিমন অনেকেরই খুব প্রিয় ফল। ভিটামিন সির মতো অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ চমৎকার এই ফল আমাদের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে, চেহারার রুক্ষতা দূর করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, দীর্ঘদিন চেহারায় লাবণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। হাড়, রক্তনালি, ত্বকসহ শরীরের সংযোগকারী কোষসমূহের যত্ন নেয়। বার্ধক্য ও চুল পড়া রোধ করে।

৪. হজমে সহায়ক

খাবার ভালো হজম হলে অনেক রোগ থেকে দূরে থাকা যায়। পার্সিমনে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার আছে বলে এটি অন্ত্রে খাদ্যের চলাচল নির্বিঘ্ন করে। একটি মাঝারি আকারের ফলে প্রায় ছয় গ্রাম খাদ্যোপযোগী আঁশ থাকে বলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পাকযন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। লাবণ্য বৃদ্ধি করতে এ ফল এভাবে কাজ করে। এটি প্রদাহ কমাতেও অনেক উপকারী। ক্লান্তি দূর করে এবং শীতকালীন অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে রাখে।

৫. ক্যানসার ও হাঁপানির ঝুঁকি কমায়

পার্সিমনের ভিটামিন ই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এর ভিটামিন বি রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে। অ্যাজমা বা হাঁপানি থেকে রেহাই পেতেও সাহায্য করে এই দৈব ফল।৬. মধুমেহ বা ডায়াবেটিস প্রতিরোধি

যাঁরা মধুমেহ রোগ কিংবা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা যা ইচ্ছা তা–ই খেতে পারেন না। বিশেষ করে যেসব খাবারে চিনির পরিমাণ বেশি। তাঁরা মধুর মতো মিষ্টি পার্সিমন খেতে পারেন। কেননা অন্যান্য মিষ্টি ফলের তুলনায় পার্সিমনে ক্যালরি কম।