অন্য কিছু পারি না, তাই লিখি : স্বকৃত নোমান

সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক স্বকৃত নোমান। বিষয়বৈচিত্র্য, স্বতন্ত্র ভাষা ও প্রকরণের কারণে তাঁর উপন্যাস দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে সমাদৃত হচ্ছে। অনূদিত হচ্ছে অন্য ভাষায়ও। জন্ম ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর, ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায়। জ্ঞানার্জন ও লেখালেখিকে জীবনের প্রধান কাজ বলে মনে করেন। এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার, এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কারসহ ভূষিত হয়েছেন নানা সম্মাননায়। দেশ ও জাতির যে কোনো সংকটে কথা বলেন নিঃসঙ্কোচে। স্বপ্ন দেখেন একটি প্রাণবিক পৃথিবীর। বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে কর্মরত। তার লেখালেখি, নতুন বই ও অন্যান্য প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন তারুণ্যলোকের প্রতিবেদক তাহনিয়া ইয়াসমিন

তাহনিয়া ইয়াসমিন : সাহিত্যে এলেন কেন এবং কীভাবে?
স্বকৃত নোমান : সাহিত্যে কেন এলাম―যেদিন থেকে উপন্যাস লিখতে শুরু করি সেদিন থেকে উত্তরটি খুঁজে বেড়াচ্ছি। এখনো পাইনি। কোনো একদিন হয়ত পেয়ে যাব। তবে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আন্দাজ করে কিছু উত্তর দেওয়া যায়। যেমন ধরেন, আমি গভীর সমুদ্রের জেলে হতে চেয়েছিলাম, সুন্দরবনের প্রহরী হতে চেয়েছিলাম, মৌয়াল-বাওয়ালি হতে চেয়েছিলাম। হতে চেয়েছিলাম একজন কৃষক, দু-হাতে ফলাতে চেয়েছিলাম শস্য। হতে চেয়েছিলাম স্কুল-মাস্টার কিংবা কলেজ-শিক্ষক। পারিনি, এসবের কিছুই হতে পারিনি। পারিনি বলেই সাহিত্য করতে এলাম। উপন্যাস লিখতে এলাম। কারণ এ-কাজটা আমি খানিকটা পারি। কিংবা ধারেন, আমি বিস্তর কথা বলতে চাই। আমার কথার পরিমাণ এত বেশি যে, কবিতা, গল্প, নাটক, গান―শিল্পের এ মাধ্যমগুলোতে ধরা সম্ভব নয়, তাই উপন্যাস লিখি। কিংবা এমনও হতে পারে, উপন্যাসে কথা বলতে যতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি, শিল্পের অন্য কোনো মাধ্যমে ততটা করি না, তাই উপন্যাস লিখি। কিংবা এমনও হতে পারে, গল্প শোনার প্রবণতা মানবসভ্যতার আদিম কাল থেকে বর্তমান কাল অবধি চলে আসছে। আমার রক্তনালিতে সম্ভবত সেই গল্পকারের রক্ত প্রবাহিত, আদিকালে যে গল্প শুনিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করত। আমি সম্ভবত তারই উত্তরাধিকারী। এগুলো কিন্তু আন্দাজি উত্তর, ঠিক উত্তরটি নয়।
আর কীভাবে এলাম, তাও পুরোপুরি মনে নেই। এক বৈশাখের খাঁ খাঁ দুপুরে পুকুরপাড়ের আমতলায় বসে ছিলাম। খুব গরম পড়ছিল। হাওয়া বইছিল। টের পেলাম, মাথার করোটিতে শব্দরা ঘুরছে। কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি ঘর থেকে কাগজ-কলম নিয়ে এলাম। একটা মোড়ায় বসে লিখতে শুরু করলাম। কী লিখেছিলাম বলব না। সেই থেকে লেখালেখি শুরু। সেইভাবেই সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলাম।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : মেলায় এবার কী বই এসেছিল?
স্বকৃত নোমান : একটা উপন্যাস। উজানবাঁশি। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : বইটি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন…।
স্বকৃত নোমান : বাস্তবতা ও কুহকের মিশেলে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সমাজ ও রাজনীতি, রক্ষণশীলতা ও উদারপন্থা, জ্ঞান ও নির্জ্ঞান এবং বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত উপন্যাস এটি। এর বাইরে আমার আসলে কিছু বলার নেই, পাঠকরা ভালো বলতে পারবেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে। দেড় মাসের মধ্যে প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়। বইমেলায় আসে দ্বিতীয় মুদ্রণ। পাঠকদের ভালো-মন্দ প্রতিক্রিয়া জানার অপেক্ষায় আছি।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : আপনার উপন্যাসের পাঠক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
স্বকৃত নোমান : কোনো মূল্যায়ন নেই। প্রশ্নটিও ঠিকঠাক বুঝিনি।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন?
স্বকৃত নোমান : আমি গত বছরের নভেম্বরে পান্ডুলিপি দিয়েছি প্রকাশককে। কেন তিনি তখন প্রকাশ না করে মেলায় করলেন, এটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। প্রশ্নটি তার কাছে করা যেতে পারে।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : সামগ্রিকভাবে এবারের মেলা সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
স্বকৃত নোমান : প্রতি বছর তো ফেব্রুয়ারি মাসেই মেলা হয়। কোভিড পরিস্থিতির কারণে এবার শুরু হলো মার্চের আঠারো তারিখ। শুরুর দিকে কিন্তু বেশ জমেছিল। পাঠক-দর্শকরা আসছিল। কিন্তু কোভিড পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মানুষজনের আসা কমে যায়। বই বিক্রিতেও ভাটা পড়ে। প্রতি বছর বইমেলায় লেখক-পাঠক-প্রকাশক-সাংবাদিকরা মিলে আমরা যে আড্ডা দিই, এবার তা ঠিক হয়ে ওঠেনি। আনন্দ-বিষাদের বইমেলা ছিল এটি।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কীভাবে?
স্বকৃত নোমান : প্রকৃতির কাছে থেকে। নারীরূপী প্রকৃতির কাছ থেকে। প্রকৃতি তো সৃষ্টিশীল। আমিও তার মতো সৃষ্টিশীল হতে চাই। প্রকৃতি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আর করে বোধ বা চেতনা। চেতনা আমাকে লিখতে বলে, তাই আমি লিখি।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : আমাদের দেশে করোনাকালেও বইমেলার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যদি বলেন।
স্বকৃত নোমান : করোনাকালে মার্কেটে গিয়ে কাপড়-চোপড় কেনার দরকার কী ছিল? আগের বছরে কেনা কাপড়-চোপড় দিয়েই তো চালিয়ে নেওয়া যেত। দেশের মার্কেটগুলোতে মানুষের ভিড় দেখেছেন? খুব ভিড়। পরিবহণ স্টেশনগুলোতেও খুব ভিড় ছিল লকডাউনের আগে। সর্বত্রই ভিড়। কোথাও কোনো কিছু থেমে নেই, সবই চলছে। বইমেলা থেমে থাকবে কেন? করোনা সহসাই আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে না। এর সঙ্গে লড়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। সাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা হয়েছে, তাতে তো কোনো অসুবিধা দেখিনি। বইমেলা তো করোনার হটস্পটও হয়ে ওঠেনি।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : প্রকাশকদের নিয়ে আপনার অভিমত কী?
স্বকৃত নোমান : বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রকাশক পেশাদরিত্ব অর্জন করতে পারেনি। অধিকাংশ প্রকাশক সাপ্লাই নির্ভর। তবে এখন অনেক প্রকাশক পেশাদারী হয়ে উঠছেন। যদিও সেই সংখ্যা কম। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরো বাড়বে।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : কোন কোন ব্যাপারে মনঃক্ষুন্নতা আছে আপনার?
স্বকৃত নোমান : আছে। টাকার অভাবে দেশের বাইরে ভ্রমণে যেতে পারি না। ভ্রমণ ছাড়া অভিজ্ঞতা হয় না। অভিজ্ঞতা না হলে অভিজ্ঞান তৈরি হয় না। অভিজ্ঞান ছাড়া লেখা হয় না।

তাহনিয়া ইয়াসমিন : লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
স্বকৃত নোমান : লিখব, লিখেই যাব। আমৃত্যু। এটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।