টমাস ট্রান্সট্রয়মারের হাইকু

আনিসুর রহমান |

 

টমাস ট্রান্সট্রয়মার সুইডেনের কবি| তিনি ২০১১ সালে কবিতার জন্যে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন| তাঁর আগেই জগৎ জুড়ে তাঁর কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে| এ বছরের ২৬ মার্চ তিনি পরলোকে চলে গেলন| তারঁ বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর|

সব মিলিয়ে তাঁর কবিতার বইয়ের সংখ্যা ১০, একটি পত্রগুচ্ছ, একটি হাইকু সংগ্রহ এবং কয়েক পাতার একটি ছেলেবেলার কথা|

টমাস সহজ সরল ভাষায় তারঁ কবিতায় চিত্রকল্প নির্মাণ করেছিলেন, কবিতায় অনুভূতির গভীরে যেতে পেরেছিলেন| তিনি সুইডেনে তো বটে, একই সাথে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক কবিতার কিংবদন্তী প্রতিভা| তিনি কবিতার বিবিধ কাঠামোয় কলম ধরেছিলেন| কিন্তু প্রকাশের ব্যাপারে ছিলেন অতিশয় লাজুক| তাঁর প্রকাশিত রচনাবলীর চেয়ে অপ্রকাশিত লেখা ঢের বেশি| একবার কথা প্রসঙ্গে এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম |তিনি হেসেছিলেন আমার প্রশ্নের জবাবে| তাঁর স্ত্রী মনিকা যোগ করে বলেছিলেন বাক্সবন্দী কবিতাগুলো টমাসের মনের মতো হয়নি| কবিতার সাথে বাক্সবন্দী রয়েছে টমাসের আঁকিবুকি করা অনেক স্কেচ|

টমাসের কবিতার সাথে যোগাযোগ ২০০৬ সালে আমার প্রথম সুইডেন ভ্রমণের আগেই| আর টমাসের সাথে যোগাযোগ আমার দ্বিতীয় এবং বিলম্বিত যাত্রার সময়| আমি তাঁর বন্ধুত্ব লাভ করতে পেরেছিলাম| তিনি এরকমই অমায়িক এক মানুষ ছিলেন|

তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথ, এলিয়ট, বদলেয়ারসহ নানা বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকবার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল| তাঁর সায় পেয়ে তাঁর কবিতা অনুবাদে হাত দিয়েছিলাম| কিন্তু প্রকাশের ব্যাপারে টমাসের লাজুকতা আমাকে পেয়ে বসেছিল| তাঁর কবিতা বাংলা, ইংরেজি এবং সুইডিশ–এই তিন ভাষায় পড়েছি| তিনি কবিতায় জীবন ও সময়কে জয় করতে পেরেছিলেন|

তাঁর কবিতার অনুবাদ নিয়ে আমাদের আলাপ করার দরকার ছিল| শেষবার যেদিন তাঁর স্ত্রী মনিকার সাথে কথা হয়, মনিকা জানালো টমাসের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না| এর পরের ঘটনা আকস্মিক দুঃখবহ, ২৭শে মার্চ এক সাংবাদিক ফোনে জানালেন টমাস ট্রান্সট্রয়মার আর নেই|

আবার দেখা হবে তো টমাস?

এখানে টমাসের নয়টি হাইকু সুইডিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলাম| টমাস ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালে সুইডেনের হিলেবি শহরের কিশোর বন্দীশালায় মনোবিদ হিসেবে কাজ করার সময়ে হাইকুগুলো লেখা| এর ৮ টি হাইকু তাঁর সমসাময়িক কবিবন্ধু অকে লুন্দিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা হিসেবে দিয়েছিলেন| পরবর্তী সময়ে এই ৮ টি সহ মোট ৯ টি হাইকু বন্দীশালা (প্রিজন)নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়|

বল খেলছে তারা

হঠাৎ গোলমাল, বল টপকায়

দেয়ালের ওপার|

#

কর্কশ রব প্রায়ই

তাদের সময় চমকিয়ে

দ্রুতলয় করতে|

#

ভুল বানান জীবন

সুন্দরেরা বাঁচে আরো

উল্কি আঁকার ন্যায়|

#

গড়ানো ঠেকল

যখন, পকেট ভরা তার

হলুদ মাশরুমে|

#

যন্ত্র ঠিকঠাকের,

টহলমিনারে ’পরে ভারী রব

বনগুলো বিমূঢ়|

#

গেট কিঞ্চিত খোলা

জেল-উঠোন, দাঁড়াই আমরা

নতুন ঋতুতে|

#

দেয়ালের বাতিদের

রাতের জোনাক দেখে তালি

এক মিছে আলোর|

#

রাত – এক ট্রাক্টরের

পথচিহ্ন পেছন ফেলে

বন্দীর স্বপ্ন-তূন|

#

বালক দুধ খায়

জেলসেলে ঘুমিয়ে যায়

সুখে; উপল মা|

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*