রাস্তার ছেলে থেকে বিখ্যাত আলোকচিত্রী

১৪ বছর বয়সের বালক মারিও ম্যাকিলাও বাস করতেন মোজাম্বিকের রাজধানী মাপুতুর রাস্তায়। অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে মারিওর হাতে একদিন একটি ক্যামেরা চলে আসে। সময়ের চেষ্টায় সে একদিন সেই ক্যামেরাটি চালাতেও শিখে যান। এরপর কেটে যায় প্রায় ১২ বছর। আর এই দীর্ঘসময় পর মারিওর তোলা ছবি নিয়ে লিসবনে হয় এক বিশাল একক আলোকচিত্র প্রদশর্নী। মারিওর সেই একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি হবার পর তার জীবনে কি কি ঘটলো, তা আমরা মারিওর জবানিতেই শুনতে পাবো।

শৈশবে আমার স্বপ্ন ছিল একজন সাংবাদিক হবার। কিন্তু জীবনের নিত্যদিনের টানাপোড়েন লেগেই ছিল। প্রতিদিন আমাকে জীবনের সমস্যাগুলো নিয়েই লড়াই করতে হতো। যখন আপনার জীবন সমস্যায় পরিপূর্ণ থাকবে তখন কিন্তু ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে যায়। আমার সাত বছর বয়সে বাবা বাড়ি ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যান জীবিকার সন্ধানে। আমার বোনের চেয়ে আমি কিছুটা বড় ছিলাম বিধায় অর্থ উপার্জনের জন্য রাস্তায় নামতে হলো আমাকে। এরপর আমি শহরের বাজারে বিস্কুট বিক্রি করার কাজ শুরু করি।

মানুষের গাড়ি ধোয়া থেকে শুরু করে ব্যাগ টানার মতো কাজও আমি করেছি। বাসায় যাওয়ার পরিবর্তে প্রায়ই বাজারের বন্ধুদের সঙ্গে বাজারেই থাকতে হতো। এখন যতটা মনে হচ্ছে, ততটা নিরাপদ ছিল না জায়গাটা। আমাদেরতো নিজেদের বস্তু কোথাও রাখায় জায়গা ছিল না, তাই প্রায়ই একে অন্যের জিনিস চুরি করতো। আমারও ততদিনে কিছু বাজে অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু সেটা ছিল আমার অস্তিত্বের লড়াই, যেখানে কুকুর কুকুরের মাংস খাচ্ছে।

মা যে আমাকে স্কুলে পাঠাতে চায়নি, ব্যাপারটা সেরকম নয়। উল্টো, স্কুলের মাইনে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হতো না। কিন্তু এনজিও’র সহায়তায় আমি কিছু বই পড়েছি এবং ইংরেজিটাও রপ্ত করি। আমার যখন ১৪ বছর বয়স তখন এক বন্ধুর কাছ থেকে তার ক্যামেরাটা ধারে নেই। ওই ক্যামেরা দিয়েই আমার চারপাশের ছবি তুলতে শুরু করি এবং যেসকল মানুষ শহরে পণ্য বিক্রি করতে আসতো তাদের প্রতিদিনকার চালচিত্র তুলতে থাকি। সেই ছবিগুলো সবই ছিল সাদাকালো। মজার বিষয় হলো, আমার মায়ের বাসায় বসেই আমি ওই ছবিগুলো ডেভলপ করি। যেভাবে পারছিলাম ছবির বাদবাকী কাজগুলো শিখছিলাম কিন্তু আমার জন্য অর্থ ব্যয় করে একটা ফিল্ম এবং কেমিক্যাল কেনা সহজ ছিল না।

আমার সবচেয়ে প্রিয় ছবিটি তোলা হয়েছিল এই শহরেরই কাছে এক জায়গায়। এক নারী কাসাভা বিক্রি করতে শহরে এসেছিল। ক্যামেরার পেছন ফিরে ছিল সে এবং বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই ছবিটা এখন আর নেই। আমার শুরুর দিককার তোলা কোনো ছবিই এখন আর নেই। কারণ ওগুলো আসলে যতটা ছবি ছিল তার চেয়েও বেশি আমার আনন্দের উপাদান ছিল। আলোকচিত্র নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার কোনো ইচ্ছেই ছিল না আমার।

২০০৭ সাল, তখন আমার ২৩ বছর বয়স। পরিচিত এক ভদ্রলোক আমাকে একটি ক্যামেরা দিলেন, সেটা ছিল নিকন এফএম২। যে পর্তুগিজ পরিবারের তিনি কাজ করতেন, সেই পরিবার থেকে তাকে এই ক্যামেরাটি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা দিয়ে কি করা যায় তা তার মাথায় ছিল না বলে আমার কাছে সেটা বিক্রি করে দেন। আমার কাছে তখন কোনো টাকা ছিল না, কিন্তু মায়ের মোবাইলটি আমার কাছে ছিল। আমি ওই মোবাইলটির বদলে ক্যামেরাটি নিয়ে নেই। যদিও মাকে মোবাইলের ব্যাপারে সত্যি কথাটা বলতে পারিনি সেদিন।

একটা সময় আমার কয়েকজন বন্ধুর আগ্রহে এবং উৎসাহের নিজের তোলা ছবিগুলো প্রচারের চিন্তা করি। সেই চিন্তা থেকে বেছে নেই ইন্টারনেট এবং ব্লগকে। নিজের একটা ব্লগ তৈরি করি এবং আমার তোলা ছবিগুলো পোস্ট করতে শুরু করি। এভাবে কিছুদিনের মধ্যেই একটি আলোকচিত্রী প্রদর্শনীতে আমার ছবি দেয়ার জন্য বলা হয়। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের কিছু তরুণের আয়োজিত ওই প্রদর্শনীতে যাওয়া হয় আমার এবং সেখানে অনেকের সঙ্গে আলাপও হয়। এই কানাডাতেই আমার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। ওই প্রদর্শনীটি অত বড় কিছু না হলেও আমার জীবনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল ওটা।

কোনো পেশাদার আলোকচিত্রীর সঙ্গে আমার কাজ করা হয়নি। কিন্তু তাদের থেকে আমি অনেক কিছুই শিখেছি। এখনও আমি অনেককেই আমার কাজের প্রেরণা হিসেবে নেই। এখন আমি অবশ্য একটি ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করি, তবে ফিল্মে ছবি তোলা বন্ধ করিনি। কিসের ছবি তুলছি সেটার উপর নির্ভর করে, আমি ডিজিটাল নাকি ফিল্ম ক্যামেরা ব্যবহার করবো। আমার কাজগুলোর মাঝে মোজাম্বিকের সাধারণ মানুষগুলোকেই খুঁজে পাওয়া যাবে। মোজাম্বিকের সিমেন্ট শ্রমিক, নাইজেরিয়ার অবৈধ কাঠশিল্প এবং বাংলাদেশের পাথর শ্রমিকদের নিয়েও আমি কাজ করেছি। কখনোই প্রজেক্ট নির্ধারণ করে কাজ করা হয়নি আমার। স্রেফ বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর যা ঘটে তাই আমার মূল উপজীব্য।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*