লিংকড ইনে বর্তমানে মোট চারজন বাংলাদেশি কাজ করেন: ড: বদরুল

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্ম লিংকড ইনে কাজ করছেন ৪ জন বাংলাদেশি। তাদের একজন হলেন ড: বদরুল মুনির সারওয়ার। তিনি বুয়েটে কম্পিউটার সাইন্সের (সিএসই) প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৪-৯৫ সালে বুয়েটেই তিনি শিক্ষকতা করেছেন। এক বছর পরেই পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর সেখানে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি স্টার্টআপ কোম্পানির হাত ধরে। ২০০৪ সালে শপিং.কম নামের একটি প্রতিষ্ঠানে রিচার্স সাইন্টিস্ট হিসেবে জয়েন করেন। ২০০৬ সালে ইবে শপিং.কমকে কিনে নিলে তিনি একই বছরে ইবেতে সিনিয়র রিচার্স সাইন্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় ১০ বছর সেখানে কাজ করে গত মে মাসে জয়েন করেন লিংকড ইনে। সম্প্রতি বদরুল মুনির সারওয়ার বাংলাদেশ সফরে আসলে কথা বলেন প্রিয়.কমের সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম. মিজানুর রহমান সোহেল

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে জয়েন করলেন কিভাবে? যদি আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কে একটু বলেন।
বদরুল মুনির সারওয়ার: ২০০৪ সালের নভেম্বরে শপিং.কম নামের একটি প্রতিষ্ঠানে রিচার্স সাইন্টিস্ট হিসেবে জয়েন করেছিলাম। এখানে দুই বছর কাজ করেছি। ২০০৬ সালে ইবে এই প্রতিষ্ঠানটিকে কিনে নিলে আমাকেও একই বছরের অক্টোবরে যেতে হয় ইবেতে। তখন সেখানে সিনিয়র রিচার্স সাইন্টিস্ট হিসেবে জয়েন করি। ইবেতে প্রায় ১০ বছর কাজ করার পর গত মে মাসে লিংকড ইনে জয়েন করি।

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে আপনার কাজ কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: এখানে আমার পদটির নাম “মেশিন লার্নিং সাইন্টিস্ট”। মূলত আমাকে মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করতে হয়। আমি সার্চ নেটওয়ার্ক অ্যানালাইটিক-এর কাজ করি। এখানে বড় একটি টিমকে আমার দেখতে হয়। রেলেভেন্স (প্রাসঙ্গিক/সম্পর্কযুক্ত) আমাদের টিমের মেইন টার্গেট। আপনারা দেখবেন, লিংকড ইনে গেলেই আপনাকে অনেক কিছু সাজেস্ট করে। আপনার কমিউনিটির পরিচিত ব্যক্তির সাথে আপনার সম্পর্ক তৈরির জন্য একটি অটোমেটিক সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে হয়। আপনি কি চাচ্ছেন, কোন গ্রুপকে ফলো করতে হবে, কোন কোম্পানিতে জবের জন্য আপনি ইন্টারেস্ট হতে পারেন এসব বিষয় সম্পর্কযুক্ত তথ্যগুলো আমাদের মেম্বারদের সাথে শেয়ার করি। এর জন্য প্রচুর ডাটা নিয়ে কাজ করতে হয়; এবং প্রতিটি ব্যবহারকারীকে আমাদের জানতে হয়। তাকে ঠিক কোন জিনিসটা দেখাতে হবে, তা খুব সঠিকভাবে নির্ণয় করতে আমার টিম কাজ করে।

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে কাজের ক্ষেত্রগুলো কি কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: লিংকড ইনে প্রধান কাজের ক্ষেত্র তিনটি। ১. ট্যালেন্ট, ২. সেলস এবং ৩. মার্কেটিং। ট্যালেন্ট হচ্ছে কোন প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে তাঁরা কিছু লোক নিয়োগ দেবে। এ সময় লিংকড ইনের কাছে যে ক্যাটাগরির লোক খুঁজছে তার তালিকা চাইলে টপ ১০০ তালিকা তাদের কাছে দেওয়া হয়। এটাই হচ্ছে আমাদের সার্ভিস।

এরপর সেলস সার্ভিস। বাংলাদেশে সেলস সার্ভিস চলে টেলিমার্কেটিং স্টাইলে। আমাদের দেশে কেউ ফোনে কোন কিছু বিক্রি বা অফার করলে সাধারণত বিরক্ত হন। তাই আমাদের কনসেপ্ট আলাদা। আপনি ঠিক যা চাচ্ছেন বা যে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে চাচ্ছেন সেখানেই আপনাকে সে সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।

সবশেষে মার্কেটিং। যেটা মূলত বিজ্ঞাপন নির্ভর কাজ করে থাকে। নিয়োগ ছাড়াও ফিডে যেসব অ্যাড আসে সেটাই করে এই মার্কেটিং টিম।

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে ওয়ার্কিং ইনভারমেন্ট কেমন?
বদরুল মুনির সারওয়ার: লিংকড ইনে ওয়ার্কিং ইনভারমেন্ট খুব ইউনিক। শুরুর দিকে লিংকড ইন-এর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রিসার্চ টিমে অনেকেই গুগল থেকে এসে জয়েন করেছিলেন। এছাড়া ফেসবুকসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে লোক এসেছেন। ফলে তাঁরা ভালো একটি পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এখানে তাঁরা খুব অরজানাইজড ভাবেই কাজ করেন। গুগলে যেমন সবচেয়ে বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কাজ হয়; ঠিক একই ভাবে এখানেও সবচেয়ে বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কাজ হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, এটা একটা সোশ্যাল মিডিয়া, তেমন কোনও কাজ নেই। কিন্তু লিংকড ইন একটি কঠিন ইঞ্জিনীয়ারিং প্রতিষ্ঠান। এর পেছনে প্রচন্ড মেধাবি একটি দল প্রতিনিয়ত কাজ করছে।

প্রিয়.কম: লিংকড ইন কেমন লাগছে?
বদরুল মুনির সারওয়ার: দারুন। আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করেছে, এবং মানুষের জীবন যাপনকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে।

তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে এমন সব টেলেন্ট আছেন, তাদের কাছাকাছি থাকাটাও অনেক বড় একটি বিষয়। একটি উদাহরণ দেই। লিংকড ইনে আমার জয়েনিং এর প্রথম দিনেই একজন ডিরেক্টরের সাথে পরিচয় হয়। তিনি স্টিভ জবসের সাথে ‘নেক্সট’-এ কাজ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ‘নেক্সট’ পৃথিবীর সবচেয়ে টেলেন্টেড কোম্পানি। এরপর সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ট্যালেন্ট কোম্পানি হচ্ছে লিংকড ইন। এ থেকেই বুঝতে পারছেন, আমাদের চ্যালেঞ্জ এবং তৃপ্তিটুকু কোথায়।

প্রিয়.কম: সবচেয়ে বড় ট্যালেন্টেড কোম্পানি হওয়ার কারণে কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: কারণ ২০০৫/০৬ সালে যখন লিংকড ইন যাত্রা শুরু করে তখন সারা পৃথিবীতে ইকোনমিক্যাল প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল। তখন এটা ছিল হট স্টার্টআপ কোম্পানি। এখন এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৩৬০ মিলিয়নের বেশি ফ্রি প্রফেশনাল মেম্বার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। শুরু থেকেই লিংকড ইন খুব ভালো ভালো ইঞ্জিনীয়ারদেরকে আকর্ষন করে। পরবর্তিতে অন্যান্য টেলেন্টেড লোকজন এখানে যুক্ত হয়। লিংকড ইন তার মানের ব্যাপারে খুবই কঠিন একটা সীমা দিয়ে রেখেছে।

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে কেউ চাকরি করতে চাইলে তার কি কি কোয়ালিটি থাকতে হবে এবং প্রসেস কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: লিংকড ইনে খুবই পরিকল্পনা মাফিক এবং লম্বা ইন্টারভিউ হয়। আমাকে যেমন ৯ জনের কাছে আলাদা আলাদা ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। তার আগে দুটি টেকনিক্যাল ফোন ইন্টারভিউ করা হয়েছিল। পাশাপাশি, এখানে চাকরি করতে হলে অবশ্যই ভালো কোডিং জানতে হবে। লিংকড ইন সবসময় কোডিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আমাদেরকে সরাসরি প্রোগ্রাম লিখতে হয়।

প্রিয়.কম: সম্প্রতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস লিংকড ইনে গিয়েছিলেন। কারণ কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: ড. মুহাম্মদ ইউনূস লিংকড ইনে গিয়েছিলেন মূলত স্পিকার হিসাবে। এখানে প্রতি মাসেই কোন না কোন বিখ্যাত মানুষ আসেন। বক্তব্য দেন। সম্প্রতি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস লিংকড ইনে এসে প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য দেন। প্রত্যেকটা মানুষ তাঁর বক্তব্য মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন। এ সময় তিনি অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি দেশের নানান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। কিন্তু আমাদের এখানে আসা সকল স্পিকারের বক্তব্য ইউটিউবে থাকলেও প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যটি নেই। তিনি এটি ইউটিউবে দিতে না করেছিলেন। তবে কেন না করেছিলেন তা আমার জানা নেই।

প্রিয়.কম: চীনে গুগল, ফেসবুক সুযোগ না পেলেও লিংকড ইন সে দেশে অনেক জনপ্রিয় একটি কোম্পানি। কিভাবে?
বদরুল মুনির সারওয়ার: লিংকড ইন একদিকে যেমন প্রফেশনাল দিক নিয়ে কাজ করে, একই সাথে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের পারপাসও সার্ভ করে। এটি প্রফেশনাল এবং ইকোনমিক অপরচুনিটি তৈরি করেছে। ফলে চীন সরকার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি এবং সে দেশে এর প্রসারে নানান সুযোগ সুবিধা দিয়েছে।

প্রিয়.কম: লিংকড ইনে বাংলাদেশি আরও কেউ আছেন?
বদরুল মুনির সারওয়ার: আমি ছাড়াও সব মিলে লিংকড ইনে বর্তমানে মোট চারজন বাংলাদেশি লিংকড ইনে কাজ করেন। বাংলাদেশের একটি ছেলে আছে এখানে যিনি প্রথমে গুগল, এরপর ফেসবুকে কাজ করে সব শেষে লিংকড ইনে জয়েন করেছেন।

প্রিয়.কম: বাংলাদেশ থেকে গুগল লোক নিয়ে থাকে। এ দেশ থেকে লিংকড ইনে জয়েন করার কোন সুযোগ আছে কি?
বদরুল মুনির সারওয়ার: বাংলাদেশে তো লিংকড ইনের কোন অফিস নেই। তবে প্রতিবেশি দেশ ভারতে লিংকড ইনের অফিস রয়েছে। সেখান থেকে তারা কোন কোন সময় লোক হায়ার করে।

প্রিয়.কম: বাংলাদেশ বাংলাদেশের প্রোগ্রামারদের জন্য যদি কিছু বলত চান।
বদরুল মুনির সারওয়ার: বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তির সাথে আমার সরাসরি কোনও যোগাযোগ নেই। তাই আমার পক্ষে কোন মন্তব্য করা কঠিন। তবে দূর থেকে শুনতে পাই, অনেক কিছুই হচ্ছে, এবং চেষ্টা চলছে। সবচে বড় যে বিষয়, তাহলো কোয়ালিটি। কোয়ালিটি লোক তৈরী না হলে এই বিশ্বে এই ক্ষেত্রে ভালো কিছু করা অসম্ভব। আমাদের প্রোগ্রামারদেরকে সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রিয়.কম: প্রিয়.কম সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
বদরুল মুনির সারওয়ার: প্রিয়.কম একটি আধুনিক মিডিয়া, যা পশ্চিমা বিশ্বের আদলে করা। এটা আমেরিকাতে অনেক জনপ্রিয় একটি সাইট। এবং এখন দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাংলা ভাষার মানুষ-জন এটা পড়তে শুরু করেছে। এর কনটেন্ট অনেক বেশি ট্রেন্ডি। অনেক পাঠক হয়তো এখনও সেগুলো সহজভাবে নিতে পারবে না। তবে পাঠকদের রুচিও ধীরে ধীরে হয়তো পরিবর্তন হবে। প্রিয়.কম এখন থেকেই বিভিন্ন পাঠককে তার রুচি অনুযায়ী তার পছন্দের মতো কনটেন্ট সার্ভ করতে পারে। যার খেলা পছন্দ সে মূল পাতায় খেলা দেখতে পাবে, আর যার বিনোদন পছন্দ, সে বিনোদনের কনটেন্ট পাবে।

প্রিয়.কম: আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
বদরুল মুনির সারওয়ার: আপনাকে এবং প্রিয়.কম-কেও অনেক ধন্যবাদ।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*