সফল ব্যবসায়ী নারী হেলেনা জাহাঙ্গীর

হেলেনা জাহাঙ্গীর। একজন সফল নারী উদ্যোক্তার নাম। তিনি একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন গৃহীনি। এই সবকিছুই একজন নারীর স্বাভাবিক গতানুগতিক উপাধিমাত্র। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি ১৮ হাজার শ্রমিকের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন। তিনি যেমন করে তার সন্তানের কথা ভাবেন, ঠিক তেমন করেই ভাবেন তার কারখানার শ্রমিকদের কথা। তাদের স্বামী-স্ত্রী সন্তানদের কথা। সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে করতেই দেখেছেন সফলতার মুখ। নিজের মেধা, মননশীলতা ও কর্মনিষ্ঠায় এবং একাগ্র প্রচেষ্টার কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে তিনি একটি আলোচিত এবং আলোকিত মুখ। তৈরি পোশাক শিল্পের পৃথক খাতে তিনি একাধারে চারটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কিশোর বয়স থেকেই যার স্বপ্ন ছিল কিছু একটা করবেন। কিন্তু তা আর হল না। বসতে হলো বিয়ের পিড়িতে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। বর্তমানে তিনি এক ছেলে এবং দু’টি কন্যা সন্তানের জননী। বড় ছেলে জাহেদুল আলম জয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছেন। আর দুই কন্যার মধ্যে জাফরিনা আলম জেসি ‘ও’ লেভেল এবং হোমায়রা আলম জেনি কেজি টু’তে পড়ছেন। তিনি বিয়ের পর থেকে সংসারের সব কাজ করার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এমনকি নিজের স্বামীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও চাকরি করার সিদ্বান্ত নেন। পরে অবশ্য মত পাল্টে ছোট্ট পরিসরে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসায় পা রাখেন। সেই থেকে শুরু করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সফল নারী উদ্যোক্তা।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হক শরীফ সমাজের একজন উচ্চশ্রেণীর মানুষ। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। আর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম শুরু থেকেই ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণের পথে যাত্রা করেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। সেই যাত্রা থেকে আজ অবধি তিনি এ ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। তাইতো স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে তাদের এখনকার পোষাক ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর মূলত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেকে সফল করেছেন বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে। তিনি একাধারে নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড ও জে সি এ অ্যামব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বললেন, ৪৪ বছরের লাল সবুজের বাংলাদেশ ছেড়ে আমার কোঁথাও যেতে ইচ্ছা করে না। পেশাগত, পারিবারিক কিংবা অভিজ্ঞতার পুঁজি সমৃদ্ধগত কারণে হয়তো দেশ- বিদেশ ঘুরেছি। কিন্তু কখনো মনে হয় নাই যে বাংলাদেশ ছেড়ে অন্যত্র স্থায়ীভাবে বসবাস করি। মন পড়ে থাকে এই বাংলায়। হয়তো নানা সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় আমরা হয়তো উচ্চ মানের দেশ হতে পারি নাই। কিন্তু দেশ এগুচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে উন্নত দেশ হবে। তার জন্য দরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা শাসক শ্রেণীর উন্নত ভিশন ও মিশন। আমরা তো রয়েছিই। সরকার ও বেসরকারী সমন্বয়ে আমরা যে কোথায় যেতে পারি তা মাঝে মাঝে আমি ভাবি। আমি বিশ্বাস করি, সু শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত হলে আমরাই বদলে দিতে পারি এই দেশটাকে।

গার্মেন্টস ব্যবসার ক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ এবং নানা প্রতিকূলতার বিষয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার ব্যবস্থাপনায় পরিচালনাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই ব্যতিক্রম। আমাদের ফ্যাক্টরি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ‘এইচ অ্যান্ড এম’ বায়ারের নোমিনেটেড ফ্যাক্টরি। সেহেতু আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো কমপ্লায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টাবলিসমেন্ট। আমাদের প্রত্যেক ইন্ডাস্ট্রিই পরিবেশ সম্মত এবং শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি। আমরা নারী শ্রমিকদের জন্য ম্যাটারনিটি সুবিধা দিয়ে থাকি। শিশু জন্মের আগে ও পরে চার মাসের বেতন ও ছুটি দেওয়া হয়। এর পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার টাকা। যারা নিয়মিত অফিস করেন তাদের মাসিক বোনাস দেওয়া হয়। বছরে দুই ঈদে বোনাস প্রদান করা হয়। শ্রমিকদের অসুস্থতায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুখে-দুঃখে সব সময় শ্রমিক কর্মচারীদের পাশে থাকার কারণে শ্রমিক অসন্তোষের বাইরে থাকে নিট কনসার্ন গ্রুপের প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠান।’

সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজের কল্যাণে কাজের প্রসঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যে কোনো সচেতন মানুষেরই উচিত দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু কাজ করা। আল্লাহ আমাকে সামর্থ্য দিয়েছেন, অর্থ-বিত্ত দিয়েছেন। সুতরাং আমি মনে করি, আমার চারপাশের অসচ্ছল অনগ্রসর মানুষদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। নিজের মনের প্রশান্তির জন্যই আমি সমাজসেবা করি। যখন দেখি, আমার কিংবা আমাদের কোনো সহযোগিতার জন্য দুস্থ মানুষটির মুখে হাসি ফুটে উঠছে তখন যে কি সুখ পাই- তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। মানুষ হিসেবে আমি কতটা সামাজিক, সমাজ-বান্ধব সেটাই আমার পরিচয় নিশ্চিত করে।’

এক নজরে হেলেনা জাহাঙ্গীর

পিতাঃ ক্যাপ্টেন(অবঃ)আবদুল হক শরীফ।
মাতাঃ বেগম সুফিয়া শরীফ।
স্বামীঃ মো: জাহাঙ্গীর আলম।
জন্মঃ ২৯ আগস্ট, ১৯৭৪।
শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ স্নাতকোত্তর।
পেশাঃ ব্যবসা।
শখঃ মানব সেবা, গান গাওয়া।
সন্তানঃ এক পুত্র ও দুই কন্যা। পুত্র জাহেদুল আলম জয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছেন। আর দুই কন্যার মধ্যে জাফরিনা আলম জেসি ‘ও’ লেভেল আর হোমায়রা আলম জেনি কেজি টু’ তে অধ্যায়নরত।
ব্যবসা শুরুঃ  ১৯৯৪ সাল। গার্মেন্টস, নিটিংয়ের কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু।
প্রতিষ্ঠানঃ ম্যানেজিং ডিরেক্টর – ১.নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট ২.জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড ৩. জে.সি এমব্রয়ডারি এন্ড প্রিন্টিং
দেশের বাইরে ভ্রমণঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত অন্যতম।
গুনঃ একজন সমাজ কর্মী।
সদস্যঃ বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ, গুলশান সোসাইটি, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব , গুলশান হেলথ ক্লাব , বারিধারা ক্লাব ছাড়াও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্লাবের সদস্য হিসাবে তিনি আদৃত।
ভক্তঃ  মাদার তেরেসা, প্রিন্সেস ডায়ানা ও বাংলাদেশ রোটারির প্রথম নারী গভর্নর সাফিনা রহমান।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*