আলোকিত মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখান মানুষকে। দেশে যখন তীব্র হতাশা ও স্থবিরতা, সেই মুহূর্তে তিনি শোনালেন আশা ও সম্ভাবনার কিছু কথা। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আনিসুল হক

পৌষের সকালটা চমৎকার। ঝকঝক করছে রোদ্দুর। বসে আছি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাসভবনে। জানালা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে ঘরে, গ্রিলের ছায়া মেঝে আর দেয়ালে এঁকেছে জাফরিকাটা নকশা। বছরের শেষ দিনটার সক্কালবেলা হাজির হয়েছি তাঁর সন্নিধানে।

এসেছি নতুন বছরের জন্য একটুখানি উদ্দীপনা নিতে। দেশের রাজনৈতিক হানাহানি বড় বেশি দাম নিয়ে নিচ্ছে। সামনে বইমেলা, প্রকাশকেরা যোগাযোগ করছেন, আমার দিক থেকে কোনো সাড়া নেই। বইমেলা কি আদৌ হবে? নিকানোর পাররা, চিলির বর্ষীয়ান কবি, একবার বলেছিলেন, কাকে বলে কবিতা, যদি না বাঁচে দেশ। খুব হতাশ লাগে।

স্যারকে বলি, ‘স্যার, আমাকে আপনি উপদেশ দিয়েছিলেন, আশার কথা লিখবে। কারণ, আশা লাভজনক। আপনার সে অনুরোধ আমি ভুলিনি, জনাব। কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে, এই হানাহানি-সংঘাতের মধ্যে হতাশ না হয়ে উপায় আছে। এবার কী বলবেন, স্যার?’

স্যার বলেন, ‘চসারের ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা কাহিনিকাব্যের শেষ দিকে একটা অংশ আছে। অনেক দ্বন্দ্ব-হানাহানি শেষে স্বর্গে গেছে ট্রয়লাস। সেখানে গিয়ে স্বর্গের অনেক উঁচু থেকে তাকিয়েছে পৃথিবীর দিকে। তাকাতেই তার মনে হলো, সংগ্রাম আর দ্বন্দ্বমুখর মানুষের এই পৃথিবী কত তুচ্ছ, সামান্য। কত ছোট স্বার্থ, লোভ—ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া নিয়ে হানাহানি করে মরছে মানুষ। ট্রয়লাসের মতো আমরা যদি একটু দূরে গিয়ে জীবনের দিকে তাকাই, তবে আজকের এই হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে হয়তো অত বড় মনে হবে না। আমরা যেন না ভুলি, ইতিহাসে আমাদের কোনো দিন নিজেদের রাষ্ট্র ছিল না। আমরা কোনো দিন স্বাধীন ছিলাম না। আমরা পুরোপুরি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাহীন জাতি। এই প্রথম রাষ্ট্র পেয়েছি। সবে বুঝতে শুরু করেছি একটি ন্যায়সম্মত আধুনিক রাষ্ট্র কী। কী করে তা চালাতে হয়। এ নিয়ে গোটা জাতি কম চেষ্টা করছে না। সব দেশই কোনো না কোনো সময় এ রকম সংকটের ভেতর দিয়ে যায়। ইংল্যান্ডে কত দিন যুদ্ধ হয়েছে। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ হয়েছে বছরের পর বছর। ফরাসি বিপ্লবের সময়ও কত মানুষ নিহত হয়েছে। জনজীবন কীভাবে তছনছ হয়ে গেছে। সে তুলনায় আমরা কত দিকে ভালো করছি।

‘শুধু বিপাকে পড়ে গেছে আমাদের রাজনীতি। জাতি আজ দাঁড়াতে চাচ্ছে, বড় হতে চাচ্ছে, জয় করতে চাচ্ছে। কিন্তু সমস্ত স্বপ্ন ও উদ্যমের বুকের ওপর জল্লাদের মতো চেপে বসেছে রাজনীতি। রাজনীতির এই বিপাকে পড়া শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার জন্য হয়নি। এ হয়েছে মূলত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে; এ ধারার ফলে দলে স্বৈরাচারী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে। এই অনুচ্ছেদের জন্য দুই দশক ধরে আমাদের দেশে চলছে “গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার”। সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক জায়গায়। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না। পারে নির্জলা স্বৈরতন্ত্রে। এ করতে গেলে অনেক রক্তে এর দেনা শোধ করতে হয়। আজ এখান থেকে আমাদের বেরোতে হবে। এ একটা সাময়িক ব্যাপার। যখন ঝড় ওঠে, মনে হয় কোনো দিন এ বুঝি থামবে না। কিন্তু দেখা যায়, একসময় থেমে গেছে। তার পরে আসে এক দীর্ঘ সুন্দর দিন। আমাদের এখানেও তা আসবে। এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়েই সমাধানে আসতে হবে, যেমন এসেছে অগ্রসর জাতিগুলোতে। আমি বিশ্বাস করি, সারা জাতির উৎকণ্ঠা ও শুভবুদ্ধি এ থেকে বেরোনোর পথ বের করে নেবেই।’

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আমাদের দেশে দুই রাজনৈতিক পক্ষের সংঘাত কি কেবলই বৈষয়িক? নাকি এর পেছনে আছে দুটো মৌলিক আদর্শের দ্বন্দ্ব—একটা একটু ডান, একটা একটু বাম; বা ধরা যাক বাংলাদেশি বনাম বাঙালি?’

তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন। বলেন, ‘এটা কোন দেশে নেই? সব দেশেই গণতন্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত—প্রগতিশীল ও তুলনামূলকভাবে কম প্রগতিশীল। এই দ্বন্দ্ব আদর্শিক ও সর্বকালীন। সব কালের সব দেশের মধ্যে এ ছিল, আছে। প্রাচীন গ্রিসে গণতন্ত্রী-অভিজাততন্ত্রী, রোমে প্লেবিয়ান-প্যাট্রিসিয়ান, এ যুগের আমেরিকায় ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকান, যুক্তরাষ্ট্রে কনজারভেটিভ-রিপাবলিকান এবং ভারতে কংগ্রেস-বিজেপি তো এই দ্বন্দ্বেরই রাজনৈতিক রূপ। সহিংসতা সব দেশেই আছে। কিন্তু আমাদের মতো সহিংসতা ও সংঘাত আশাপাশের গণতন্ত্রগুলোতে এভাবে নেই। কারণ, ওসব দেশের গণতন্ত্রে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের ক্ষমতা গণতন্ত্রের পরিধির মধ্যে সীমিত। অন্যদিকে, আমাদের নেতৃত্বের ক্ষমতা গণতন্ত্রের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে আছে। আমাদের দলপ্রধানেরা অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। এভাবে গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রী হয়ে ওঠার ফলেই আমাদের রাজনীতি এমন সংঘাতপূর্ণ ও সহিংস হয়ে উঠেছে। সামরিক অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আসতে হয় বলে স্বৈরতন্ত্রী দেশগুলোতে স্বৈরতন্ত্র থাকে একটি। কিন্তু আমাদের “গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রীদের” ক্ষমতায় আসতে হয় জনগণের ভোটে। এই জনগণ আবার এক দলকে দুবার ক্ষমতায় আনে না। তাই স্বৈরতন্ত্র এ দেশে হয়ে পড়েছে দুটি। চিরকাল স্বৈরতন্ত্রের মূল প্রবণতা দেশে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এরাও তা-ই করছে—দুই বৈরী পতাকার নিচে দেশের জনসাধারণকে সংঘবদ্ধ করে পরস্পরকে ধ্বংসের মাধ্যমে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এ কারণে গণতন্ত্র হয়ে উঠছে আরও সংঘাতময়।’

এবার স্যারকে আসল কথাটা বলি, ‘সেদিন কুদ্দুস বয়াতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা মারা যাচ্ছি। দেশের এই পরিস্থিতিতে আমরা কোনো অনুষ্ঠান করতে পারছি না। আমি নিজে লিখতে বসতেই পারছি না। আপনার কাছে এসেছি স্যার পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য। আপনি এই সময়গুলোতে কী করেন?’

স্যার বলেন, ‘পৃথিবীতে দুই রকম প্রাণী আছে—উষ্ণ রক্তের প্রাণী ও শীতল রক্তের প্রাণী। শীতল রক্তের প্রাণীর তাপমাত্রা বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে ওঠানামা করে। গরমকালে সে জেগে ওঠে আর শীতকালে শীতনিদ্রায় যায়। আবার উষ্ণ রক্তের প্রাণী—মানুষ, হরিণ, বাঘ—বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে এদের ভেতরের তাপমাত্রার ওঠানামার কোনো যোগাযোগ নেই। আমার ধারণা, আমি উষ্ণ রক্তের মানুষ। বাইরে কী হলো না হলো সেটা নিয়ে আমি যদি ক্রমাগত আশান্বিত বা বিমর্ষ হতে থাকি, তবে তো কাজ করতে পারব না। তাই বাইরের পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে গেলেও আমি কাজ করে যাই। অন্য পক্ষে বললে এই মন খারাপ করে থাকারও একটা লাভ আছে। উদ্দীপিত অবস্থায় কেউ হয়তো “বিদ্রোহী”র মতো কবিতা লিখে ফেলবে। যা-ই ঘটুক আমার কাজের মধ্যে আমি পরিপূর্ণভাবে নিমগ্ন থাকতে চাই। প্লেটোর রিপাবলিক-এর একটি কথা এ ব্যাপারে অল্প বয়সে আমায় খুবই প্রভাবিত করেছিল। সক্রেটিসকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দেশপ্রেম কী? জবাবে সক্রেটিস বলেছিলেন, নিজের কাজ সর্বোত্তমভাবে করে যাওয়াই সর্বোচ্চ দেশপ্রেম। আমাদের সবাইকে আগে নিজের কাজটা সুন্দরভাবে করতে হবে।’

সায়ীদ স্যারের সঙ্গে এক সকাল কাটিয়ে তাঁর ফ্ল্যাট থেকে নেমে আসি আমরা। স্যারের কথাটা কানে বাজে, শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম হলো সর্বোত্তমভাবে নিজের কাজ করা।

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*