সবাই কিন্তু টিচার নয়…

না বাবু।কার নামে প্রতিবছর মাস্টারদের দিন পালন করা হয় জানি না।তবে রবিঠাকুরকে চিনি। ইশকুলে পড়ার সময় ওনার লেখা পড়েছি কত। সে সব কতদিনের কথা…।এক নিশ্বাসে কথাগুলি বলে
কেমন একটা ভাবুক হয়ে গেলেন সত্য-বাবু। সত্যপদ দে।বাড়ি দেগঙ্গা। দুই ছেলে আর বউ মিলে সংসার। উপার্জন বলতে একটা বাড়ি লাগোয়া সাইকেলের দোকান। সেখানে সকাল থেকে রাত অবধি
কাজ করেন সত্য-বাবু এবং তার বড়ো ছেলে নিমাই। না একটু ভুল বললাম। সকালবেলা প্রায় এক ঘণ্টা সত্য-বাবুর সাইকেলের দোকানে একাই বসতে হয় নিমাইকে।কারণ সত্য-বাবুর তখন ‘অন্য’
কাজ। সত্য-বাবুর কাছ থেকেই জানতে পারলাম নিমাই পড়াশুনা ছেড়েছে আজ প্রায় এক বছর হতে চলল। এখন বাবার সাথে সে জীবন সংগ্রামের যুদ্ধেই নিজেকে সমর্পণ করেছে। ‘বিশ্বাস করুন বাবু
অনেক কষ্টে নিমাইটাকে পড়াচ্ছিলাম মন দিয়ে। পড়াশুনাতেও তেমন খারাপ ছিল না। এদিকে বউ এর একটা জটিল অসুখ করল (তবে সেটা কি তা একবারও বললেন না তিনি, আমিও জোর করলাম
না) আর সব টাকা চিকিৎসায় চলে গেলো। কি করবো বলুন বাবু, ছেলেকে পড়ানোর জন্য টাকা জমিয়ে রেখে বউটাকে তো আর মরতে দিতে পারি না। তবে সেই থেকেই বড় আক্ষেপ বাবু, সেই
থেকেই বড় আক্ষেপ।’।

 

এবার বিষয়টা খুলেই বলা যাক। পেশায় সাইকেল সারাই করবার মিস্ত্রি সত্য-বাবু একজন শিক্ষকও বটে। না কোনও স্কুলের দশটা পাঁচটা ডিউটি করা, মাসের শেষে মোটা মাইনে পাওয়া স্কুল শিক্ষক নয়।
সত্য-বাবু গোটা গ্রামের কাছে পরিচিত মাস্টারমশাই নামে, কারণ প্রতিদিন ভোরবেলা কাজ শুরুর আগে গ্রামের একাধিক পরিবারের ছোট্ট ছেলে মেয়েদের পড়ান মাধ্যমিক পাশ সত্য-বাবু। শুধু কি তাই
সরকারি মিড ডে মিল এর অনুকরণে তাদের জন্য প্রতিদিনই বরাদ্দ থাকে কিছু না কিছু খাবার। তাও একেবারেই বিনা বেতনে।এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা মা যদি খুশি হয়ে তাদের সত্যদাকে কোনও
উপহার দিতে চান তবু সত্যদার নামঞ্জুর।‘মাইনে নেন না কেন? মাইনে পেলে তো ছেলেটাকে পরাতে পারতেন’। এক বিষণ্ণ হাসি হেসে সত্য-বাবু বললেন-‘না বাবু।ওটা করতে পারব না। পড়াশুনা স্বয়ং
সরস্বতীর দান। তাই বেচে খাব বাবু?’ জিভ কাটলেন তিনি।‘টাকার অভাবে নিজে পড়াশুনা ছেড়েছি। স্বপ্ন ছিল একদিন ইশকুল মাস্টার হব। ছেলেটাকেও পড়াতে পারলাম না। এই ছোট্ট ছোট্ট ছেলে
মেয়েগুলিকে পড়াই। এতেই আমার সারাদিনের জোর পেয়ে যাই ।গরিবের এই জোরটুকু খুব দরকার বুঝলেন তো?

সত্য-বাবুর হাসিতে বিষণ্ণতার ছোঁয়াটুকুই নেই। হয়ত এদের নিয়ে খুব ভালো আছেন সত্য-বাবু। ভালো আছে সত্য-বাবুর পরিবার। তবে তো দারিদ্র ফাঁকি দেয় না। বার বার চোখে পড়ে যায় একটা যেমন
তেমন ভাবে তোলা ঘর। একটা ছেঁড়া মাদুর (তবে পরিষ্কার) আর কিছু না বললেই নয় বাসন ও আসবাবপত্র। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই যেন এক অপরূপ শান্তি, এক অপরূপ স্নেহ, ভালোবাসা আর
সর্বোপরি ‘সত্য’ বিরাজ করছে প্রতিটি আনাচকানাচে। নাহলে একজন সাইকেলের দোকানের মিস্ত্রির কাছে সকাল হতে না হতেই বাবা মায়েরা তাদের ছোট্ট প্রাণের টুকরোগুলিকে সমর্পণ করে যায়
জীবনের প্রথম পাঠগুলি পাওয়ার জন্য?
সত্য-বাবু বলেন-‘জানেন তো বাবু, মাস্টার হতে গেলে বড়ো বড়ো ডিগ্রি লাগে না। লাগে ভালোবাসা, ধৈর্য। যেমন ভাবে সাইকেলের টায়ারে লিক হলে খুঁজে খুঁজে বের করতে হয় আসল ফুটোটা
কোথায়, তেমনি ছোট্টগুলিকে কোলে বসিয়ে শেখাতে হয়।ভুলগুলি শুধরে দিতে হয়। বকে ঝকে মেরে হয় না। মারাটা তো আসুরের কাজ। মানুষের কাজ হল ভালোবাসা। আমাদের মায়েদের কি অনেক
ডিগ্রি আছে বাবু? কিন্তু দেখুন তাদের কাছ থেকেই শিখি আমরা সবথেকে বড়ো শিক্ষা-মাতৃভাষা।
বিকেল হয়ে এলো।সত্য-বাবু শুধু খাওয়ালেন না। এমন আতিথেয়তা করলেন যা বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের কাছ থেকে পাইনি। স্টেশনে যাওয়ার জন্য নিজেই রিকশা ডাকলেন।বিদায় জানানোর আগে
বললেন দুটি কথা যা ভুলবার নয়।‘আজ মাস্টারদের দিন? তাহলে বাবু নিশ্চয়ই আজ আমারও দিন? ছোটবেলায় একজন মাস্টার আমাকে একটা কথা বলেছিল জানেন? বলেছিল-‘সত্য,সবাই কিন্তু
টিচার হয় না। কেউ কেউ কিন্তু চিটার ও হয়’… বাকিটা রাস্তা এই কথাটি ভেবে হাসতে হাসতে ভাবলাম- কেউ কেউ ‘সত্যও’ হয় বটে।

ব্লগের কোনও লেখার দায় এই সময়-এর নয়। প্রতিটি ব্লগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*