মার্জেনা চৌধুরীর একগুচ্ছ কবিতা

333

দেখা হবে

 

দেখা হবে তোমার আমার

কাঁশবনের উদাসী বাতায়নে

রাত জাগা চোখে হাসনাহেনার প্রহরে

ধ্রুবতারার গভীর মনে !

 

দেখা হবে তোমার আমার

জল তরঙ্গে মোহনার দেশে,

আউলা কেঁশে দখিণার মরু

ক্লান্ত হবে বিবর্ণ পরশে !

 

দেখা হবে তোমার আমার

পদ্ম পুকুরে স্বর্ণালী রোদ্দুরে,

ভাবাবেগে আবেগ উদাসীন

ঘাটের স্বর্গ শ্যামল প্রান্তরে !

 

দেখা হবে তোমার আমার

চাঁদের তেরাকাটা সিঁথিতে ,

শঙ্খ বলাকার শুভ্রতায়

ঊষার পায়ে পুজার ঢালিতে !

 

 

birds-meeting

আমার পৃথিবী তুমি

 

নীল আকাশের মেঘের পাশে

আমার জীর্ণ কুটিরের হাসি,

হিমালয় কাঁদে শ্বেত পাথরে

বিবর্ণ ভালবাসা স্বপ্ন বিলাসী !

 

কাজল চোখে হরিনী চোখ

ডুব দেয় গহীন সাগরে,

নদীর স্রোত থমকে দাড়ায়

পিছু ডাকার অভিসারে !

 

স্তব্ধ নিশীথে জোনাকির আলোয়

কামিনী হাসে হাসনাহেনার সুবাসে,

মন আমার হারিয়ে গেলো

নিবিড় দোলায় চৈত্রমাসে !

 

দিঘির জলে চাঁদের কাঁপন

নক্ষত্র ইশারায় ডাকে,

আমি সন্ন্যাসী উদাসী মন

রেখেছি চন্দ্রিমার পালঙ্কে !

 

সোনালী রোদ্দুর মাধবীর ডালে

টুনটুনির প্রলাপ যায় শুনে ,

কচি ধানের ক্ষেতে তোমারে দেখি

উড়ছে চুল বইছে বাতাস আনমনে !

 

প্রভাতের পুষ্প লুটে নেয়

ঠোঁটের মহিমা সুর তোলে,

অধরের তিলে কঠিন পিপাসা

নিজের পরিচয় নিজেই যাই ভুলে !

 

শতাব্দী প্রহরে সাজের দীপ জ্বালি

মঙ্গল গ্রহের আর্শীবাদ বন্ধ কপাটে ,

চরণ ধূলি তোমার

আমার আঁচলে পদ্ম ফোটে !

 

 

দুই মিনিট

 

যারে আমি জীবনের বিন্দু বিন্দু সাধনায়

আমার শৈশব কৈশোর সব সুন্দর এক করে

মনের মাঝে একান্ত নিজের করে রেখেছিলাম

গোপনে হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসায় ,

পৃথিবীর সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুজেছি

জীবনের ষোলটি বছর !

কোথায় না খুঁজেছি আমি তোমাকে !

তোমাকে যখন  পেলাম

আমার মনে হয়েছিল সেই তুমি

যাকে আমি খুঁজেছি এতকাল !

 

চব্বিশ ঘন্টায় মাত্র দুই মিনিট কথা হলো

আমাদের

আমরা প্রথম বাক্যেই বুঝে গেলাম

তুমিও আমাকে খুঁজেছ যুগ যুগ ধরে !

অথচ দেখো আমরা কেউ কাউকে চিনিনা !

অথচ একই আকাশের নীচে থাকি

একই হৃদয়ের ভালবাসায় !

 

একদিন সন্ধ্যা বেলা

সন্ধ্যা প্রদীপের পাশের অন্ধকারে

নিজেকে আবিষ্কার করলাম

সেই থেকে আজ অবধি

আমি অন্ধকারেই ছিলাম !

ভাবছো হয়ত অন্ধকারে

আলোর প্রদীপ জ্বেলে দেবে !

তবে একটি কথা না বলে পারছিনা

আমাদের অনেক দেরী হয়ে গেছে

একে অন্যকে খুঁজে পেতে !

 

খুঁজে খুঁজে না পেতে পেতে আমরা

অনেক দূরত্বের সীমায় চলে এসেছি

যা আমাদের কাম্য ছিলো না !

তোমার মাঝে আমিও যে বেঁচে ছিলাম

এভাবে বুঝতে পারিনি !

 

মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দিতাম

যাকে আমি খুঁজি তাকে পাবোনা কোনকালে !

আজ পেলাম তবে জীবনের শেষ প্রহরে !

 

আমি চিরকুমারী জানো কেন ?

শুধু তোমারে ভালবাসি বলে !

কাউকে জীবনের পাশে ভাবতে পারিনি বলেই

আজও আমি তোমারই !

 

মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়েছি

এ কেমন ভালবাসা !

কেউ কাউকে দেখিনি

অথচ আমরা চিরচেনা

কেমন করে হলাম ?

 

সেই দুমিনিটের তুমি আবারও

হারিয়ে গেলে কোন এক অদৃশ্য মায়ায় !

তবে সেই ভাল ছিল

না পেয়ে হারানোর চেয়ে

পেয়ে হারানোর ব্যথা যে অনেক বড় !

 

 

আমার ভালবাসা

 

তুমি আমার কতখানি হৃদয় জুড়ে আছ

তা কি তুমি বুঝো ?

নিশী হয় ভোর পাপীয়ার প্রাণে

চাতকীর চোখে ,

তপ্ত মরু বালি আষাঢ়ে ভাসে চক্ষু জলে

বিষন্নে হারায় মাধবী প্রভাত

ঊষা জানে তার সবটুকু !

 

নিলীমার নীলে ভাসাই

মেঘের বুকে দেখি সাগরের চড়াই উৎরাই ,

চাঁদের বুকে রচনা করি

অস্তিত্ব তোমার শিউলীর সুবাসে ,

নক্ষত্র কুড়িয়ে মালা করি

তোমার পায়ে প্রণাম পরে রাখবো ভেবে !

 

জোনাকির পেটের আলোয়

রাখালের বাঁশি দখিণা হাওয়ায়

সাঁঝের প্রদীপ গোধূলী বেলায়

শরতের মেঘ নদীর তীরে কাঁশফুল

শ্যামল ছায়ায়  পড়ন্ত বিকেল

নীড়ে ফেরা পাখির কোলাহল

বৈশাখী ঝড় আম কুড়ানো সুখ

দূর্বাঘাসে শিশির ভেজা সকাল

কার্তিকের বিকেলে ভরা রোদ্দুর

পদ্ম পুকুর সান বাঁধানো ঘাট

সরষে ফুলের পড়ন্ত রোদ্দুর ——

 

এই সব কিছুই তোমার দৃষ্টিতে

আমার হৃদয়ে ভালবাসার পরশ মাখি

তোমার হৃদয়ের সবটুকু মাধুরীতে !

 

প্রণাম

 

বুকের ভিতরে মন রক্তে ভাসে সারাক্ষণ

চৈত্রের খর রোদ্দুরে নঁকশী কাঁথা বুনে,

ঝিঙের মাঁচায় জোনাকি প্রদীপ

প্রবাল দ্বীপের শামুক ঝিমায় শালবনে !

 

চোখের কোণে নদীর ধারা

ধ্রুবতারার বুকে সন্ন্যাসীর প্রলেপ আঁকে ,

গোয়াল ঘরের সুবাসে হরিণী মায়া

হাসনাহেনার হাত ধরে নিজেকে আগলে রাখে !

 

কাজল কালো অন্ধকারে

পথের দেখা পথের ধারে অচিন কেন লাগে ?

বাতাসে অধরা বটতলার প্রেয়সী

সিন্ধুর ঘরে বিন্দুর মাসি মরে কঠিন আবেগে !

 

বিজন স্তব্ধ রাতে গোধূলীর বাঁশি

সুর তুলে একাকী জ্যোৎস্নার বুকে রুদ্ধ দ্বারে,

কোহেলী কুয়াশা ধোপশিখা জ্বালে

প্রলয় অবসরে প্রান্তিক ঝড়ে রিক্তের হাহাকারে !

 

এলো কেশে অস্ত রবি

ভোরের স্বপ্ন দেখায় বৃন্দাবনে তুলসি জলে,

ব্যকুল প্রহর মাধবীর পায়ে

প্রণাম জানাতে হিমালয় তোমারই জন্যে ঝর্ণা গলে !

 

 

খেয়াঘাটে

 

আমি জেগে আছি

যেন সবার ঘুম কেঁড়ে নিয়ে ,

কেউ বলছে ঘুমাতে যান

নইলে পুলিশ ডাকবো ,

কেউ বলছে অসুস্থ হবেন

হাজার ভক্তের দুঃখ হবো !

 

কেউ বলছে যুদ্ধ হবে

না ঘুমাতে গেলে ,

গুলি করে মারবো তোমায়

আমাদের কথা না শুনলে !

 

কেউ বলছে আর কত

রাত তো পোহায় গেলো ,

কেউ বলছে আপুমনি

একটু কথা বলো !

 

কেউ বলছে কিসের দুঃখ

আমায় তুমি বলো ,

সাত রাজার ধন পায়ে দেবো

আমার সাথে চলো !

 

কেউ বলছে ভাগ্যবতী হলে তুমি

অনন্যা প্রারম্ভে ভাগ্য বিধাতার,

এবার ঘুমাও প্লিজ

কালকে না হয় হবে আবার কবিতার !

 

সত্যিই আমি ধন্য হলাম

প্রসারিত স্নেহে বরন্যে আজ,

সময়  যে হাতে নেই

তাই দিবানিশী করি কাজ !

 

রাতের স্তব্ধতায় খুলে মন

উত্তরী শ্বাসে পলাশের মাঠে,

ক্ষমা করো আমায়

এগুতে দাও একা আমার খেয়াঘাটে !!!

 

 

ভাল থেকো

 

যাবার বেলা একবারও কি পড়লো না মনে ?

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কথা ?

প্রভাত শিউলীর হলুদ বোটার ক্রন্দনে

বকুলের শ্যামলা গায়ে ধূলা মেখে

শিশিরের কোলে ঊষার ঈর্ষা ঝরে পড়ে !

আর তুমি যুদ্ধের ময়দানে একা ফেলে

চলে গেলে নীরবে নিজেকে ফেলে !

 

আমি যদি বলি

তুমি চলে যাবার জন্যে এসেছিলে

শুধু প্রান্তিক রোদ্দুরে একফোঁটা উষ্ণতায়

অনুভূতির শিঁকলে নিজেকে আবদ্ধ করে !

 

ব্যঞ্জন বর্ণের খেলাপী যন্ত্রণা বহন করে

আমি দাড়িয়ে আছি মেরুদণ্ডহীন

অদ্ভূত খেয়ালে !

 

প্রদীপের ঝলমলে আলোর নীচের অন্ধকারে

আমার ঠিকানা আছড়ে মরে বিভৎস্য বিষানে !

তোমার হাতদুটি একবার ছোঁয়ে দেখার অভিসারে

উদিত সূর্য্যের প্রহরের প্রসব যন্ত্রণায়

অসহায় আমাকে গ্রাস করে নিয়তির পরিহাসে

নির্ভিক সাধনার মূল্যে !

 

চলে গেলে ?

যেতে পারলে তুমি ?

যাও যাবে যদি যাবার বেলার অভিধানে

এই নগন্য জীবনের আমাকে আর

মনে পড়বেনা হাজার বান্ধবী ভিড়ে!

সুখে থেকো তুমি ভাল থেকো

আকাশে বুকে !

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*