আমরা প্রবাসীরা অবশ্যই নবাবজাদা : সোহরাব আমিন

সোহরাব আমিন। একজন প্রবাসী। নিজেকে পরিচয় দেন রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে। দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। বর্তমানে বসবাস করছেন পর্তুগালে। প্রবাস জীবন নিয়ে রয়েছে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা কখনো কখনো আনন্দের হলেও বেশীরভাগই কষ্টের, তিক্ততার। বাংলাদেশী একজন যুবক ইউরোপের কোন দেশে বৈধভাবে যাওয়া কতোটা সংগ্রামের তা উঠে এসেছে তারুণ্যলোক-কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে। পাশাপাশি লন্ডনে বসবাসরত বাঙালীদের জীবনযাত্রা, সেখানকার সুযোগ সুবিধা ও তার অপব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন তারুণ্যলোকের সাথে। (আজ প্রকাশিত হচ্ছে সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব।) সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : পান্থ শাহরিয়ার

তারুণ্যলোক: সম্প্রতি একজন মন্ত্রী প্রবাসীদের ‘নবাবজাদা’ উল্লেখ করে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে তর্ক চলছে। একজন প্রবাসী হিসেবে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

সোহরাব আমিন: বর্তমান অর্থবছরের প্রথম তিনমাসেই সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের বেশী রেমিটেন্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান অর্থবছরে প্রবাসী আয় দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার হয়ে যেতে পারে। ২০১৮ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশী প্রবাসী আয় অর্জনকারী দশটি দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।

দেশীয় অর্থনীতির এই যে কৃতিত্ব এর পেছনে ভূমিকা রাখছে প্রবাসীরা। যারা বিদেশে আসে তারা জানে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম কাকে বলে। নিজের দেশ, নিজের স্বজন ছেড়ে, হাজার হাজার মাইল দূরে এসে অপরিচিত, অনভ্যস্ত দেশে আমরা কষ্ট সহ্য করি। এতে আমরা নিজেরা যতোটা লাভবান হই তারচেয়ে বেশী লাভবান হয় পরিবার, রাষ্ট্র। কিন্তু সে তুলনায় প্রবাসীদের কোন সম্মান নেই, কোন স্বীকৃতি নেই।

প্রবাস জীবনে তো আমরা কোন ধরনের সম্মান পাই না বরং নিজ দেশে হয়রানী হতে হয় আরো বেশী। চোর বা অপরাধীর সাথে মানুষ যেমন আচরণ করে আমাদের সাথে আমাদের দেশের এয়ারপোর্টে একই আচরণ করা হয়। বিমান থেকে যখন নামি তখন কর্তৃপক্ষের আচরণ দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় কোন অপরাধ করে আসছি।

বিদেশী জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে আমরা নিরাপত্তাগত কোন নীতিতে এখনও পৌঁছতে পারিনি। দালালদের দৌরাত্ম, ভুঁয়া এজেন্সীগুলোর প্রতারণা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের নামে হয়রানি- সবসময় লেগেই আছে। বিদেশের মাটিতে নিজ দেশের দূতাবাসগুলোতেই আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। আমি দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলাম। সেখানকার দূতাবাস বাংলাদেশীদের মানুষই মনে করে না। তারা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করে, সাধারনত চাকরকেও কেউ এতোটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে না। আমরা আমাদের জীবন যৌবন দেশের জন্য বিদেশের মাটিতে শেষ করি। বিনিময়ে পাই লাঞ্ছনা। প্রবাসীদের সব আছে, কিন্তু প্রবাসীদের কিছুই নাই।

আমি দাবি করছি, দেশের মাটিতে প্রবাসীরা নবাবজাদা’র সম্মান পাওয়া উচিত। বিমানবন্দরসহ সব জায়গায় আমাদের অবস্থান সম্মানের সাথে থাকবে এটাই প্রত্যাশিত।

তারুণ্যলোক: আপনি প্রথম কবে বিদেশ গেলেন? আপনার বিদেশ যাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সোহরাব আমিন: আমি প্রথম বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই ২০০৭ সালে। তখন আমি আমার নিজ এলাকা সীতাকুণ্ডের একজনের মাধ্যমে ঢাকার এক এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করি। সেই এজেন্ট আমাকে জানায়, তারা আমাকে লন্ডন যাওযার ব্যবস্থা করে দিবে। সেখানকার ভিসার জন্য লন্ডনে অবস্থিত যে কোন কলেজের অফার লেটার লাগবে। তা তারা এনে দিবে। সব মিলিয়ে সাত লক্ষ টাকা লাগবে। আমি সেই এজেন্টের কথা মতো ঐ কলেজে আবেদন করি। কিন্তু কলেজ আমাকে রিফিউজ করে। রিফিউজ হওয়ার পর এজেন্ট আমাকে জানায়, আমি আপিল করলে আমাকে ভিসা দিয়ে দিবে। কিন্তু সেটার জন্য চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি তাদের কথা মতো টাকা এনে দিই। এর মধ্যে তারা আমাকে জানায় নিউজিল্যান্ডে কিছু ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আছে। সেখানে গেলে একবছর পরেই নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব। যাওয়ার খরচ বারো লাখ টাকা। এজেন্ট আমাকে জানায়, ভিসা হবে দিল্লী থেকে। দিল্লী যাওয়া, আসা, থাকা, খাওয়া সব খরচ এজেন্টের। ভিসা হাতে পাওয়ার সময় আট লাখ টাকা দিতে হবে। আর চার লাখ টাকার একটা চেক দিব। আমি ফ্লাই করার পর বাকি চার লাখ টাকা তারা নিবে। এর মধ্যে ঐ দালাল আরেকজন দালালকে কন্ট্রাক্ট করে ভিসার জন্য। অর্থাৎ, আমরা যে দালালের শরণাপন্ন হয়েছি তার ভিসা দেওয়ার ক্ষমতা ছিলনা। সে শরণাপন্ন হয় অন্য দালালের। এরপর ওরা আমাদেরকে ভিসার জন্য ভারত নিয়ে যায়। সেখানে আমরা একমাস থাকি। সব খরচ এজেন্টের। কিন্তু তারা আমাদের বিভিন্ন ডকুমেন্ট রেখে দেয়। দালাল আমাদেরকে জানায় আপনারা চলে যান। পাসপোর্ট পাঠিয়ে দিবেন৷ আমরা সব জমা দিয়ে দিব।

এরপর আমরা তাদের কথা মতো পাসপোর্ট পাঠাই। পাসপোর্ট পাঠানোর পর আমাদেরকে জানানো হয় আমাদের ভিসা হয়ে গেছে। তখন আমরা তাদেরকে আট লাখ টাকা দিই। আমাদেরকে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে জানানো হয়, ঐ দিন আমাদের ফ্লাইট। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে৷ এটা আমার পরিবারের জন্য খুশীর খবর। আমরা অনেক স্বপ্ন নিয়ে পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় আসি বিমানে উঠার জন্য।

এরমধ্যে আমাদের অগোচরে দুই দালালের মধ্যে বড় কোন সমস্যা হয়। ফলে ইন্ডিয়ায় যে দালাল ভিসা করেছে সেই দালাল অন্য দালালকে আমাদের পাসপোর্ট বুঝিয়ে দেয় না। আমি তখন ইন্ডিয়া যে দালাল নিয়ে গিয়েছিল তাকে ফোন দিই। বলি, কাল সকালে আমার ফ্লাইট। আমাকে আপনি পাসপোর্ট না দিলে আমি কীভাবে যাব? সেই দালাল আমাকে বলে, ভাই ওদের সাথে আমার সমস্যা হয়েছে। ওরা আমাকে সব টাকা বুঝিয়ে দেয়নি৷ তাহলে আমি কীভাবে পাসপোর্ট দেব? যাক, আমার ঐদিন যাওয়া হয়না৷ দুই দালালের নিজেদের সমস্যার জন্য আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। আমি ফিরে যাই বাড়ীতে। যে দালাল আমি কন্ট্রাক্ট করেছিলাম, সে আমাকে বলে আপনি গ্রামে যাওয়ার দরকার নেই। ঢাকার হোটেলে থেকে যান। খরচাপাতি যা লাগে আমি দেব। কিন্তু আমি গ্রামেই ফিরে গেলাম। মন খারাপ হয়ে গেল।

এক সপ্তাহ পর আমার কাছে আবার ফোন যায়। আমাকে বলা হয় অমুক দিন আপনার ফ্লাইট। আপনি আসেন। আমি আবারো সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম। কিন্তু এবারো আমার যাওয়া হলো না। আমি বুঝতে পারলাম আমার আট লাখ টাকা জলে গেল।

একটা বিষয় আমি পরে আস্তে আস্তে অবগত হয়েছি। সেটা হলো, নিউজিল্যান্ডের যে ভিসা দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে আট লক্ষ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল সেই ভিসা ছিল পুরোটাই ভুঁয়া। সেটা কোন ভিসাই না। দালালদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বারোজনের কাছ থেকে আট লক্ষ টাকা করে নিয়ে নিবে। এরপর তার থেকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে এয়ারপোর্ট কন্ট্রোল করে আমাদেরকে পাঠিয়ে দিবে নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের সীমানার ভেতরে যাওয়ার পর আমরা বিপদে পড়ব তা নিশ্চিত। কিন্তু অপরাধী চক্র থেকে যাবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এখানে না বললেই নয়; দুই দালালের মধ্যে ঝামেলা হওয়ার একটা বড় কারণ ছিল। কারণটা হলো, ইন্ডিয়ায় যে দালাল নিয়েছিল সেই দালাল চেয়েছিল বারোজনকে একসাথে পাঠাতে। কিন্তু অন্য দালাল তার সাথে একমত ছিলনা। তার যুক্তি ছিল, প্রথমে একজন যাবে। সে ঠিকভাবে গিয়ে পৌঁছালে অন্য এগারোজনকে পাঠানো হবে।

তখন আমার চরম হতাশার সময়৷ মন ভীষণ খারাপ। প্রচুর টাকা হাতছাড়া হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অবশ্য আমি সাহস হারাইনি। লন্ডনে যে আপিল করেছিলাম তার খোঁজ নিতাম রোজ৷ নানা জায়গায় ঘুরতাম আর ভাবতাম কীভাবে যাওয়া যায়। আমার সাথে আরো দুটো ছেলে লন্ডন যাওয়ার জন্য আপীল করেছিল। তারা ভিসা পেয়ে গেছে। তখন একদিন আমি চট্টগ্রামের এক সেমিনারে ব্যারিস্টার মনোয়ার ভাইয়ের সাথে দেখা করি। তিনি বললেন, এজেন্ট যদি তোমার পক্ষে আপিল করে থাকে তাহলে একটা পেপার দিয়েছে। সেটা আমাকে দিতে বলো। কিন্তু এজেন্ট আমাকে পেপার দিতে পারে না। মানে তারা আপিল করে নাই। চল্লিশ হাজার টাকা খেয়ে ফেলেছে।

তারুণ্যলোক: তারপর?

সোহরাব আমিন: এরমধ্যে আমি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাবুল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি।তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন৷ বাবুল ভাই আমার ভিসা দেখে বললেন, এই পাসপোর্টে ভুঁয়া ভিসা ইস্যু করা আছে। এটা দিয়ে হবে না। আপনি আরেকটি পাসপোর্ট করান। তিনি একজনকে ফোনে বলে দিলেন আমার পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই লোককে বাবুল ভাই বলে দিলেন দুই ঘন্টার মধ্যে আমাকে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার জন্য। দুই ঘন্টা লাগে নি৷ একঘন্টার মধ্যেই আমি পাসপোর্ট হাতে পেলাম।

বাবুল ভাই এরপর সেই এজেন্ট ( ট্রিনিটি একাডেমী) কে বলে আমাকে লন্ডন পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। ট্রিনিটি একাডেমী হচ্ছে সেই একাডেমী যারা আমাকে নিউজিল্যান্ড পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়েছিল। বাবুল ভাই ওদের বলে, তোমরা সোহরাব – এর কাছ থেকে টাকা নিয়েছ। কিন্তু কোন উপকার করতে পারনি। এখন ওকে লন্ডন যাওয়ার ব্যবস্থা কর। ও কোন টাকা দিবে না।

এরপর আমি ভিসার জন্য আবেদন করি। ওরাই আমাকে সবকিছু ঠিক করে দেয়। ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে শুরু করে সবকিছু বাবুল ভাইয়ের তদারকিতে হয়। ভিসা হয়ে যায়। ভিসা হয়ে যাওয়ার পর আমাকে টিকেট করে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়।

তারুণ্যলোক: লন্ডনে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম কেমন সমস্যা অনুভব করতেন?

সোহরাব আমিন: লন্ডন যাওয়ার পর আমি প্রথম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই কলেজে গিয়ে। আমাকে এখান থেকে বলা হয়েছিল, আমার পুরো একবছরের টিউশিন ফি ওরা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি কলেজে যাওয়ার পর কলেজ থেকে আমাকে বলা হলো আমার নামে কোন টাকা কলেজে জমা হয়নি। কোন টাকা বাংলাদেশি এজেন্ট পাঠায়নি। কলেজ আমাকে জানায়, এক সপ্তাহের মধ্যে আমি টাকা পরিশোধ না করলে আমার ভিসা বাতিলের জন্য সুপারিশ করবে।

তখন আমি এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। এজেন্ট ফোন রিসিভ করে না। আমি আবার বাবুল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তখন তার মধ্যস্থতায় এজেন্ট ফিফটি পার্সেন্ট অর্থাৎ তিন হাজার পাউন্ড এখান থেকে পাঠায়। আরো ফিফটি পার্সেন্ট আমাকে পরিশোধ করতে হবে এবং তা ছ’মাসের মধ্যে। কারণ ছ’মাসে সেশন।

তারুণ্যলোক: লন্ডনে আপনি কী ধরনের চাকরী করতেন? গড় আয় কেমন ছিল? কর্মঘণ্টা কতোক্ষণ ছিল?

সোহরাব আমিন: আমি যখন লন্ডন যাই (২০০৯ সাল) তখন চাকরী পাওয়া কঠিন ছিল। এশিয়ান ছেলেদের জন্য একটা বড় সুবিধা ছিল ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ নেওয়া। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ নেওয়ার সুবিধা ছিল, থাকা খাওয়া ফ্রি, হাফ ডে অফ। বেতনও খারাপ ছিল না। সপ্তাহে ১৬০ পাউন্ড। লন্ডনে অনেকগুলো জব সেন্টার আছে বাঙালিদের। তারা জব বিক্রি করে। এরকম একটা জব সেন্টার থেকে আমি ২০ পাউন্ড দিয়ে আমার জবটা কিনে নিই। কিন্তু এখান থেকে আমার ক্লাস করতে আসা খুব কঠিন ছিল। ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল অনেক বেশী। পরে ঐ জব সেন্টার আমার থেকে আরো ২০ পাউন্ড নিয়ে আমাকে আরেকটি জব দেয়। এখানে সকালে ছয় ঘণ্টা বিকালে চার ঘন্টা ডিউটি। একদিন ফুল ডে আরেকদিন হাফ ডে অফ। তখন আমার মাসিক আয় ছিল প্রায় সাড়ে সাতশ আটশ পাউন্ড।

তবে আমার টাকা জমানোর সুযোগ ছিল না। সাতশ পাউন্ড আয় করলে পাঁচশ পাউন্ড কলেজে দিয়ে দিতে হতো। এর মধ্যে আমি সবকিছু আস্তে আস্তে চিনতে শুরু করি৷ তখন একসাথে দুটো জব শুরু করি। একটা জাপানীস রেন্টুরেন্টে অন্যটা সুপার শপে। এগুলো ছিল ঘন্টা হিসেবে চাকরী৷ প্রতি ঘন্টায় ছয় ইউরো। তখন আমি প্রচুর কাজ করতাম। দৈনিক ষোল ঘন্টাও করতাম কখনো কখনো। কাজ করলেই টাকা। তবে বেশীরভাগ টাকাই দিয়ে দিতে হতো কলেজকে।

তারুণ্যলোক: লন্ডন দূতাবাসে কেমন সাহায্য পেতেন?

সোহরাব আমিন: লন্ডনের অন্যান্য দূতাবাসগুলোর সাথে বাংলাদেশী দূতাবাসের পার্থক্য আছে। অন্যান্য দূতাবাসগুলো বসে থাকে তাদের দেশের মানুষকে সাহায্য করবে তার জন্য। আর আমাদের দূতাবাস অপেক্ষা করে কীভাবে নিজ দেশের মানুষকে আটকে দেওয়া যায়। লন্ডনে বাংলাদেশী দূতাবাস বাংলাদেশীদের মানুষই মনে করে না। এখানে একটা ব্যাপার হচ্ছে সব সরকারের আমলেই সরকারের কাছের লোকগুলোই লন্ডন দূতাবাসে কাজ করে। ফলে তারা কাউকে পাত্তাই দেয় না।

তবে লন্ডনে বসবাসরত বাঙালীরা একে অপরের প্রতি খুব আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ। এখানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী বংশদ্ভুত ব্রিটিশ এমপি আছেন। এটা কিন্তু বাংলাদেশীদের বা বাঙালীদের ঐক্যের প্রমাণ।

তারুণ্যলোক : লন্ডনে বসবাসরত বাঙালীর সংখ্যা কেমন? তারা সাধারণত কী ধরনের পেশায় জড়িত?

সোহরাব আমিন: লন্ডনে বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রচুর। আমি সঠিক পরিসংখ্যানটা বলতে পারবো না। তবে প্রচুর। সহজ করে বলি, লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশীর সংখ্যা এতো বেশী কোথাও গেলে ইংরেজী না বললেও চলবে। শুধু বাংলা দিয়েই চালিয়ে দেওয়া যায়। অর্থাৎ সব জায়গায় কোন না কোন ডিপার্টমেন্টে একজন হলেও বাঙালী আছে। বেশীরভাগ বাঙালীরা লন্ডনে রেস্টুরেন্টে কাজ করে। মোট বাঙালীদের মধ্যে এদের অবস্থান ফিফটি পার্সেন্ট। এছাড়া অন্য সব ডিপার্টমেন্টেই নানা পর্যায়ে বাঙালিদের অবস্থান ভাল।

তারুণ্যলোক: দেশে তো কখনো রান্নাঘরে কাজ করেননি। বিদেশের মাটিতে রেস্টুরেন্ট জবে সমস্যা হতো না?

সোহরাব আমিন: হঠাৎ করে নতুন পরিবেশে গিয়ে অনভ্যস্ত কাজ করা অবশ্যই কঠিন ছিল। আমি যখন প্রথম ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ নিই তখন আমাকে থালা বাসন পরিষ্কার করতে হতো। শুধু আমি না যারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে রেস্টুরেন্টে কাজ নেয় তাদেরকে এ কাজটাই করতে হয়। এর পরের ধাপ হলো পেঁয়াজ কাটা। রান্নাঘরের কাজ সবার শেষ ধাপ। শেফ হয়ে যাওয়ার পরে রান্নাঘরের কাজ দেওয়া হয়। যেমন এখন আমি আমার রেস্টুরেন্টে সিনিয়র শেফ।

তারুণ্যলোক: লন্ডনে বসবাসরত বাঙালীদের মধ্যে নাগরিকত্ব পেয়েছেন এমন বাঙালীর সংখ্যা কতো?

সোহরাব আমিন: আমি সঠিক সংখ্যাটা বলতে পারব না। তবে এখন লন্ডনে যারা বসবাস করছে তাদের অধিকাংশই লন্ডনের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে এমন। আগে নিয়ম ছিল যারা স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়েছে তারা দশ বছর ভালভাবে বসবাসের পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে। তখন অনেকে ধানাই পানাই করে এই কলেজ থেকে ঐ কলেজ এভাবে দশ বছর পার করতো। আমি ও আমার সাথে একই সময়ে যারা গিয়েছিল তারা এভাবে ছয় বছর পার করি। কিন্তু একটা পর্যায়ে আইন হলো, কোন অভিবাসী কলেজ পরিবর্তন করতে পারবে না। তার চেয়ে বড় কথা কেউ আট বছরের বেশী ছাত্রত্ব রাখতে পারবে না। আট বছরের মধ্যে অভিবাসীদের ছাত্রত্ব শেষ হতে হবে৷ আট বছরের পরেও যদি কোন অভিবাসী ছাত্রত্ব রাখতে চায় তাকে পুনরায় নিজ দেশে গিয়ে আবেদন করে আসতে হবে৷ ফলে আমি ও আমার একই সময়ে যারা গিয়েছিল তারা বিপাকে পড়ে যাই।

তারুণ্যলোক: আপনি স্টুডেন্ট ভিসায় লন্ডন গিয়েছেন। সেখানকার কলেজগুলোতে বাংলাদেশী ছাত্রদের পড়াশুনা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

সোহরাব আমিন: লন্ডনের একটা ব্যাপার হলো এখানে ভুঁয়া সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। আমরা যেসব কলেজে পড়েছি এগুলো হলো বাঙালীদের কলেজ। এদের পরীক্ষা পদ্ধতিটাই ভুঁয়া। এসব কলেজগুলোর অধিকাংশতেই পরীক্ষার আগেরদিন প্রশ্নপত্র দিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি উত্তরপত্রও লিখে দেওয়া হয়। অর্থাৎ পাস নিশ্চিত। ভর্তি হলে সার্টিফিকেট নিশ্চিত। এই সার্টিফিকেট দেখিয়ে অন্য আরেকটি কলেজে ভর্তি হওয়া যায়। এভাবেই চলে।

মজার একটা ব্যাপার হলো, লন্ডনে পড়াশুনা করে যেসব বাংলাদেশীরা দেশে ফিরে বিভিন্ন বড় বড় পদে কর্মরত হয় এদের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের পুরো ডিগ্রীটাই ভুঁয়া। লন্ডনে আমার রুমমেট ছিল, এরকম তিনজনের কথা বলি। তিনজনই এখন দেশে কর্মরত। একজন একটি বড় কর্পোরেট হাউজে জব করে। বর্তমানে প্রায় এক লাখ আশি হাজার টাকা বেতন পায়। যেহেতু আমার রুমমেট ছিল তাই আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি কখনো কলেজেই যায়নি। যখন তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছিল তখন সে যাওয়ার আগ মুহুর্তে একজনের কাছ থেকে এক হাজার পাউন্ড দিয়ে একটা সার্টিফিকেট কিনে। আরেকজনের কথা বলি। তিনি বাংলালিংকে টপ লেভেলে চাকরি করতো। এখন হামীম গ্রুপে চাকরী করে। তিনিও এখানকার একটি কলেজ থেকে সাতশ পাউন্ড দিয়ে একটি সার্টিফিকেট কিনেছিলেন। এরকম আরেকজনকে চিনি, তিনিও একই কাজ করছেন।

সত্যি কথা হলো, ধনী লোকদের কথা ভিন্ন। মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে যারা আসে এবং একসময় দেশে ফিরে গিয়ে বলে দেশের টানে দেশে ফিরে এলাম- এমন লোকদের মধ্যে অধিকাংশই ভুঁয়া সার্টিফিকেটধারী। লন্ডন থেকে তারা সার্টিফিকেট কিনে নিয়ে যান। যেহেতু বলার মতো অন্যকিছু থাকেনা তাই দেশপ্রেমের দোহাই দেন। আমি বিশ্বাস করি, লন্ডনে যারা ভালোভাবে পড়াশুনা করেছে তাদের জন্য লন্ডনে চাকরির অভাব হয় না।

তারুণ্যলোক: লন্ডনে বসবাসরত যেসব বাঙালী নাগরিকত্ব পেয়েছেন তারা সাধারণত কী ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন?

সোহরাব আমিন: লন্ডনে সিটিজেনশীপ পেলে সবকিছুই পাওয়া হয়ে যায়। যতো রকমের সুযোগ সুবিধা আছে সব পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সিটিজেনশীপ পাওয়া। লন্ডনে সিটিজেনশীপ পাওয়াটা এজন্যই দরকার, যারা সিটিজেনশীপ পাচ্ছে তারা তো চাকরী না করলেও চলে। অনেকেই এরকম আছে – যারা সিটিজেনশীপ পাওয়ার পর কোমরে ব্যথা, শরীর ব্যথা এসব বলে বসে থাকে। লন্ডনের সরকার তাদের পুরো পরিবার চালানোর জন্য টাকা দিচ্ছে। তার থাকা, খাওয়া, পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব সরকারের।

আমি অনেককে চিনি যারা এভাবে সরকারের সব সুবিধা নেয়। পাশাপাশি গোপনে ক্যাশ টাকার বেতনে চাকরী করে। আগে এই বেতনটা ব্যাংকে রাখা গেলেও এখন তাও পারা যায় না। লন্ডন সরকারের কাছে এটা অবৈধ টাকা। আমি লন্ডন যখন প্রথম আসি তখন কয়েকজন মিলে একটা ফ্ল্যাটে থাকতাম। সেই ফ্ল্যাটের মালিক বাংলাদেশী। সে ও তার পরিবার লন্ডন সরকারকে জানায় সে মানসিকভাবে পাগল। তখন তার পরিবার তার জন্য ও তার পরিবারের জন্য আলাদা দুটি ফ্ল্যাট দেয়। প্রতিমাসে তার জন্য এক হাজার পাউন্ড চিকিৎসা ভাতা বরাদ্দ করে৷ ওই লোক নিজে যে ফ্ল্যাটটি পেয়েছে সেটি আমাদের কাছে ভাড়া দিয়ে দেয়। এরপর সে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে ক্যাশটাকার বেতনে জয়েন করে। ফলে সে ত্রিমুখী আয় করতে পারে। আমাদের দেশে কারো যদি পঙ্গু, প্রতিবন্ধী বা অটিজম বাচ্চা থাকে আমরা খুব মন খারাপ করি। কিন্তু লন্ডনে কারো এরকম হলে আশেপাশের লোকেরা তাকে ভাগ্যবান ভাবে। বিশেষ করে লন্ডনে সিলেট অঞ্চলের যেসব প্রবাসী বসবাস করে তাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশী। কারো যদি দুটি অটিজম বা প্রতিবন্ধী বাচ্চা থাকে তাকে আশেপাশের লোকেরা খুব ঈর্ষা করে। কারণ দুটি বাচ্চা অসুস্থ মানে সরকার তাকে কমপক্ষে চার হাজার পাউন্ড দিচ্ছে। (চলবে)

Be the first to comment

Leave a comment

Your email address will not be published.


*